বাংলাদেশের বাস্তবতায় বায়ু দূষণ(ভিডিও)

বায়ু দূষনের এমন ভয়াবহতা পরিবেশকেও বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে, হুমকিতে ফেলছে উদ্ভিদ ও বাস্তুসংস্থানকে, ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘস্হায়ী প্রভাবেও।

Feature Image:unb

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বায়ু দূষণ

আপনি কি জানেন যে শহরটাকে আমরা প্রাণের শহর বলে জানি সেই প্রিয় ঢাকা শহর বসবাসের এক অযোগ্য শহর হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে? ২০১৮ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে বসবাস অযোগ্য ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।

ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠার পেছনে অন্যতম এক প্রধান কারণ বায়ু দূষণ। একটি স্হানে বায়ুর গুণগত মান কেমন, সেখানকার বাতাস শ্বাস নেয়ার জন্য কতটা স্বাস্থ্য উপযোগী এবং দূষণ কতটা গ্রাস করে নিয়েছে স্হানটির বায়ুকে সেটি বুঝতে বায়ুমান যন্ত্রের মাধ্যমে বায়ুর মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স নামের এই পদ্ধতির সাহায্যে কোনো একটি স্হানের বায়ুর রিয়েল টাইম মান পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে বায়ুমান পরিমাপ করার মূল কাজটি করে থাকে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর। দেশের ১১ টি জেলা ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ,  চট্টগ্রাম,  খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর, কুমিল্লা এবং নরসিংদীতে স্হাপিত বায়ুৃমান পরিমাপ যন্ত্রে ‘ক্লিন এয়ার এন্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট’ নামের প্রজেক্টের আওতায় প্রতিদিনই এই বায়ুমান পরিমাপ করা হয় ।

যদিও মাত্র কয়েকটি স্হানের তথ্য থেকে দেশের সামগ্রিক বায়ুমানের অবস্থা বোঝা সম্ভব নয় তবু বায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায় এই মান থেকেই। ঢাকায় এই বছরের অক্টোবরের প্রথম সাতদিনের গড় বায়ু মান ৮৯.৫।  এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৫ বায়ুমান পাওয়া গেছে দুইদিন।

সাধারণত  শূণ্য থেকে ৫০ এর মধ্যে এই মান থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তর সেটিকে Good বা ভালো হিসেবে আখ্যায়িত করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে  মান যখন ৫১ থেকে ১০০ থাকে সেটিকে মডারেট , ১০১ থেকে ১৫০ হলে সেটিকে কশন, ১৫১ থেকে ২০০ হলে সেটিকে আনহেলথি, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ভেরী আনহেলথি এবং সবশেষ ৩০১ থেকে ৫০০ হলে পরে সেটিকে এক্সট্রিম আনহেলথি বলা হয়ে থাকে। এই মান বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বায়ুর মান কখনোই ভালো ছিল না। এই ভালো না থাকার মিছিলে দেশের অন্যান্য শহরও আছে। এর প্রভাবে যে মূল্য দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে সেটি যে ভয়াবহই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বায়ু দূষণকে দায়ী করা হয়। সর্বোচ্চ এই ক্ষতির সাথে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বায়ূ দূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরেন্স বের্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এক গবেষণায় পেয়েছে , রাসায়নিক মিশ্রণ আছে, এমন দুষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক বা গলার সংক্রমণ বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেই সঙ্গে ফুসফুসের নানা জটিলতা, যেমন ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বায়ু দূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কি মনে হয়, বায়ু দূষণ শুধু কি মৃত্যু কিংবা অসুস্থতাতেই প্রভাব রাখছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট অবশ্য বায়ু দূষণের আরেক প্রভাবের কথা তুলে এনেছে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে।

তার আগে চলুন জানার চেষ্টা করি আমাদের গড় আয়ু কত।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর। এক বছর আগে একই সময়ে এই গড় আয়ু ছিল ৭২.৩ বছর।  গড় আয়ু বেড়ে গেছে বলে মনে মনে নিশ্চয়ই খুশি হচ্ছেন?

তাহলে চলুন ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সেই  প্রতিবেদনে কি বলা হয়েছে দেখে আসি। গেল বিশ বছরে বায়ু দূষণ ৪৪ শতাংশ হারে বাড়তে থাকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় পাঁচ বছর কমে যেতে পারে আশন্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।  ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের সাথে সেই চার দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশও। প্রতিবেদনটিতে ২৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

বায়ু দূষনের এমন ভয়াবহতা পরিবেশকেও বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে, হুমকিতে ফেলছে উদ্ভিদ ও বাস্তুসংস্থানকে, ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘস্হায়ী প্রভাবেও।

কেনও এত বায়ু দূষণ? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক এই সমস্যার কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসবে গণপরিবহনের কথা। ঢাকা শহরের কথাই উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই।  ঢাকার সড়কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের মধ্যে যেগুলো পুরোনো বা ফিটনেসবিহীন তাদের বিরাট একটি অংশ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। এসব মোটরযান থেকে ক্ষতিকর যে বস্তুকণা নির্গত হয় তার মধ্যে অন্যতম কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং ওজোন।  গণপরিবহনর পাশাপাশি রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি এবং কন্সট্রাকশনের জন্য রাস্তার পাশে রাখা ধুলোবালি, ইটের ভাটা, শিল্প কারখানার দূষিত বাতাস, আবর্জনা পোড়ানোকে বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। জেনে হয়ত অবাকই হবেন, গ্রামাঞ্চলে শহরের মত এত যানবাহনের আধিক্য নেই, নেই তেমন শহুরে ব্যস্ততা।  তবু বায়ু দূষণের প্রভাব আছে সেখানেও।  জাতিসংঘ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষের অকালে মৃত্যু হয় গৃহস্থালি বায়ু দূষণে, যার প্রধান উৎস মাটির চুলার ধোঁয়া।

এতসব ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে রাজত্ব করা বায়ু দূষণের লাগাম টেনে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই বছরের শুরুতে বাংলাদেশের আদালত বায়ু দূষণ রোধে নয়টি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার আদেশ দিয়েছেন। নির্দেশনাগুলো হলো,
১. ঢাকা শহরের মধ্যে যেসব ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহনে বালি বা মাটি পরিবহন করা হয়, সেগুলোয় কাভার্ড বা ঢাকনা যুক্ত করতে হবে।

২. যেসব জায়গায় নির্মাণ কাজ চলে সেসব স্থানে ঠিকাদারদের ঢাকনা দিয়ে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করতে হবে।

৩. ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর যে নির্দেশ ছিল, সে নির্দেশ অনুযায়ী যেসব জায়গায় এখনও পানি ছিটানো হচ্ছে না, সেসব এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ এবং কার্পেটিংয়ের যেসব কাজ চলছে, সেসব কাজ যেন আইন কানুন এবং চুক্তির শর্ত মেনে করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. যেসব গাড়ির কলো ধোঁয়া ছাড়ে সেগুলো জব্দ করতে বলা হয়েছে।

৬. সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনোমিক লাইফ নির্ধারণ করতে হবে এবং যেসব গাড়ি পুরোনো হয়ে গেছে সেগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৭. যেসব ইটভাটা লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনও বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

৮. পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইকিলিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৯. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে হবে এবং মার্কেট ও দোকান বন্ধের পরে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারী বা প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও যার যার জায়গা থেকে বায়ু দূষণের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে উঠা জরুরি৷ এজন্য বেশ কিছু পরামর্শ মেনে বায়ু দূষণ রোধে ব্যক্তিগত অবস্হান থেকেও সচেষ্ট হওয়া সম্ভব। খালি জায়গায় গাছ লাগাতে পারেন,  গাছ আপনাকে নির্মল বায়ু দেবে। বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারলে বায়ু দূষণ জনিত রোগ থেকেও বেঁচে থাকা সম্ভব।  করোনা ভাইরাসের মহামারীর সময়ে মাস্ক পড়ে বাইরে চলাচলের যে অভ্যাস গড়ে তুলেছেন সেই অভ্যাসকে স্হায়ী রূপ দিন। বাইরে গেলেই দূষিত বায়ু থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন। যেসব রাস্তায় খুঁড়াখুঁড়ি বা নির্মাণকাজ চলছে, চেষ্টা করুন সেসব রাস্তা বা এলাকা এড়িয়ে যেতে। বাসার ময়লা আবর্জনা না পুড়িয়ে নির্দিষ্ট স্হান বা ডাস্টবিনে রাখুন। যথাসম্ভব গণপরিবহন এড়িয়ে বাইসাইকেল ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। বায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে নিজে সচেতন হয়ে দূষণ বিরোধী উদ্যোগে অংশ নিতে অন্যদের উৎসাহিত করুন। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আমি আপনি আমরা সবাই যার যার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসলে বায়ূ দূষণ রোধ করা অসম্ভব কিছু না। পরবর্তী প্রজন্মকে বাসযোগ্য এক নির্মল বায়ুর দেশে পৃথিবীর আলো দেখাতে বায়ু দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এক হওয়ার সময় এখনই৷

___

This is a Bengali Video Article on Air Pollution in Bangladesh.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...