হানিমুনে মৃত্যু- দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত খুন? (ভিডিও)

গেইব এবং টিনা ওয়াটসনের বিয়ে হয়েছে সপ্তাহখানেক হল। নববিবাহিত এই দম্পতি হানিমুনে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রথম সপ্তাহ সিডনিতে কাটানোর পর...

হানিমুনে মৃত্যু- দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত খুন? (ভিডিও) 

 

গেইব এবং টিনা ওয়াটসনের বিয়ে হয়েছে সপ্তাহখানেক হল। নববিবাহিত এই দম্পতি হানিমুনে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রথম সপ্তাহ সিডনিতে কাটানোর পর দ্বিতীয় সপ্তাহে তারা চলে যায় টাউনসভিলে। উদ্দেশ্য- স্কুবা ডাইভিং।

টাউনসভিলে গিয়ে তারা একটা জাহাজে চেপে রওনা দিলো স্কুবা ডাইভিং এর উদ্দেশ্যে। তাদের সাথে আরো ২৫ জন ডাইভার ছিল। যেখানে যাচ্ছে সেখানে সমুদ্রের নিচে বেশ কয়েকটা প্রবাল প্রাচীর আছে, আরো আছে একটা ভাঙা জাহাজ। সেসব দেখতেই যাচ্ছে তারা। 

 

গেইব একজন অভিজ্ঞ স্কুবা ডাইভার। এখন পর্যন্ত মোট ৫৫ বার ডাইভ দিয়েছে সে। তার তুলনায় টিনা এখনো শিক্ষানবিশ। তার মোট ডাইভের সংখ্যা ১০ এর ও কম। তবে গেইব উদ্ধারকারী ডাইভার হিসেবে প্রশিক্ষিত এবং সনদপ্রাপ্ত। তাই সে সাথে থাকাতে টিনাও অনেকটা চিন্তামুক্ত ছিল। যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটেই যায় গেইব তাকে বাঁচাতে পারবে। 

 

এই দম্পতি বেশ গভীরে ডাইভ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। তাই তাদের সাথে একজন গাইড দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় গেইব। সে জানায় যেহেতু সে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী ডাইভার তাই তাদের আলাদাভাবে কোন গাইডের দরকার নেই। 

 

ডাইভারদের কাছে যে ছোট আকৃতির ডাইভ কম্পিউটার থাকে সেটা সাধারণত ডাইভের সময়, গভীরতা, অক্সিজেনের মাত্রা ইত্যাদি পরিমাপ করে ডাইভারদের নিরাপদে ফিরে আসতে সহায়তা করে। ডাইভ দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই গেইব জানায় তার কম্পিউটার একটু ঝামেলা করছে, তাই তারা আবার ফিরে আসে। নৌকায় ফিরে এসে সেটা ঠিকঠাক করে আবার ডাইভ দেয় তারা। তবে এবারে টিনা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। একজন নতুন ডাইভার হিসেবে যেটা খুবই স্বাভাবিক। 

হানিমুনে-মৃত্যু
স্বামী গেভ

 

অক্টোবর ২৩, ২০০৩। সেদিনের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর ছিল। সমুদ্রও ছিল বেশ শান্ত। যদিও ডাইভটা তুলনামূলক কঠিন ছিল এর গভীরতার জন্য, তবে নৌকায় ডাইভারদের সহযোগিতা করার জন্য বেশ কিছু মানুষ অবস্থান করছিলেন। গেইব তাদের অনুরোধ করল টিনার সাথে বাড়তি কিছু ওজন যোগ করার জন্য। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল টিনার শরীরের যে ওজন এই ওজন নিয়ে সে সেই ভাঙা জাহাজটার কাছে পৌঁছতে পারবে না। এই বাড়তি ওজন কিন্তু মোটেও কাউকে ডুবিয়ে ফেলে না। বরং এটা আপনাকে সমুদ্র, লেক বা নদীর তলদেশে পৌঁছাতে সাহায্য করে মাত্র। 

 

গেইব জানিয়েছিল পানির তলদেশে মাত্র কয়েক মিনিট থাকার পরেই টিনা বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আচরণ করা শুরু করে। গেইবের কাছে মনে হচ্ছিল টিনা তাকে সংকেত দিচ্ছে কিছু একটা গড়বড়ের। গেইব আরো জানায় একটা সময় টিনা বেশ আতংকিত হয়ে পড়ে এবং হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করার একটা পর্যায়ে টিনার হাতের আঘাতে তার অক্সিজেন মাস্ক সরে যায়। তখন সেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং টিনাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের মাস্ক ঠিক করায় ব্যস্ত হয়ে যায়। যখন টিনার দিকে তার চোখ যায় তখন সে দেখে টিনা ডুবে যাচ্ছে। গেইব তখন উপরে উঠে আসে এবং নৌকায় থাকা অন্যদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। 

 

পানির নিচে ওয়েইড নামে আরেক ডাইভার ছিল। ওয়েইড সেই ট্রিপের প্রশিক্ষক এবং নির্দেশক হিসেবে দায়িত্বরত ছিল। সে লক্ষ্য করে টিনা সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। তাই সে দ্রুত টিনার কাছে পৌঁছে যায় এবং তাকে নিয়ে পানির উপরে উঠে আসে। অন্য আরেকটা নৌকায় টিনাকে তোলা হয়। সেখানকার ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও টিনাকে বাঁচাতে পারে না। গেইব পুরো সময়টায় একবারো সেই নৌকায় যায় না। যখন সে জানতে পারে টিনা মারা গেছে কেবল তখনই সে সেই নৌকায় যায়। 

হানিমুনে-মৃত্যু
হানিমুনে মৃত্যু

 

 

গেইব আর টিনার পরিচয় ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ার সময়। টিনা তখন অন্য আরেকটি সম্পর্কে ছিল, তার বাগদানও সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাই গেইব যখন তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয় তখন স্বাভাবিকভাবেই ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু গেইব কিন্তু হাল ছেড়ে দেয় না। সে বারবার টিনাকে প্রস্তাব দিতেই থাকে। এদিকে একসময় টিনার সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাই সে গেইবের প্রেমের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয় শেষমেশ। গেইবকে ভালোবাসতেও খুব বেশি সময় লাগে নি তার। আর তাই গেইবের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান স্কুবা ডাইভিং কে রপ্ত করার চেষ্টা করে সে। সেটা গেইবকে খুশি করার জন্যই। যদিও টিনার এই নতুন অভ্যাসে তার পরিবার খুব একটা খুশি ছিল না, কারণ ছোটবেলা থেকেই তার হৃদপিন্ডে বেশ কিছু সমস্যা দেখা গিয়েছিল এবং হুটহাট অজ্ঞান হয়ে যাওয়ারও বাতিক ছিল। আসলে গেইব আর টিনার সম্পর্কটা পুরোটাই একপাক্ষিক ছিল। সবকিছু চলত গেইবের ইচ্ছা এবং পছন্দ অনুযায়ীই। তবে অসংখ্য উত্থান পতন থাকলেও এই দম্পতি বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। শিঘ্রই তাদের বিয়ে হয়ে যায়।

 

মানুষ হিসেবে টিনাকে সবাই পছন্দ করত। সবসময় হাসিখুশি, বন্ধুসুলভ আর উচ্ছল স্বভাবের ছিল এই মেয়েটা। মানুষ হিসেবে এক কথায় অসাধারণ। তাই তার মৃত্যুতে যেন শোকের ছায়া নেমে এলো পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব মহলে। এই অকালে চলে যাওয়াটা কেউই মেনে নিতে পারছিল না। টিনার মৃত্যু কিছুটা সন্দেহ জাগায় অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের মধ্যেও। কারণ টিনার মৃতদেহের ফুসফুসে খুব সামান্যই পানি জমা ছিল। কেউ যদি ডুবে মারা যায় তাহলে তার ফুসফুসে আরো অনেক বেশি পরিমাণে পানি থাকার কথা। এছাড়াও টিনার স্বামী গেইবের দেওয়া দুইটা জবানবন্দীর মধ্যে কোন সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছিল না তারা। এছাড়াও টিনার উদ্ধারকারী ব্যক্তি ওয়েইড জানায় সে যখন টিনাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল তখন টিনার শরীরে প্রায় ২০ পাউন্ডের মতন বাড়তি ওজন যোগ করা হয়েছিল। যেখানে সেই জাহাজের ধ্বংসস্তুপের কাছে যেতে টিনার প্রয়োজন ছিল মাত্র আট পাউন্ডের মতন বাড়তি ওজন। এছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায় পানির নিচে গেইব টিনাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেছিল। তখন টিনাকে বেশ ছটফট করতে দেখা যায়। এই জাপটে ধরার কথাও গেইব তার স্বীকারোক্তির কথা বলে নি। 

 

টিনার মৃত্যুর পর, এমনকি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও গেইবকে বেশ অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায়। যেই অস্বাভাবিক আচরণ চোখ এড়ায় না কারোই। শেষকৃত্যের পরপরই গেইব টিনার লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাছে গিয়ে ইন্সুরেন্সের টাকা দাবী করে। কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানি তাকে জানায় স্কুবা ডাইভিং এর সময়কার দূর্ঘটনার দায়িত্ব তাদের কোম্পানি নিবে না। এছাড়াও টিনার উত্তরাধিকারী হিসেবে গেইবের নাম কোথাও নেই। 

 

টিনার বাবার সবসময় একটা সন্দেহ থেকে যায় মনে। তার মনে হতে থাকে কোন একটা কিছু ঠিক নেই। টিনার মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই গেইব টিনাকে বলেছিল তার লাইফ ইন্সুরেন্স দ্বিগুণ এবং সেই ইন্সুরেন্সে তাকে একক উত্তরাধীকার করতে। যেটা পরে তার বাবা হতে দেন নি। তবে এই ব্যাপারটা বেশ খটকা লাগে টিনার বাবার কাছে। তাই সে নিজেই মেয়ের মৃত্যুর তদন্ত করতে চলে যায় অস্ট্রেলিয়া। সেখানে গিয়ে সে তার উদ্ধারকারী এবং সহযাত্রীদের সাথে কথা বলে। 

 

পুলিশও গেইবের গল্পে বেশ কিছু অসংলগ্নতা খুঁজে পায়। গেইব পুলিশকে টিনার যে অবস্থানের কথা জানিয়েছিল টিনা সেখানে ছিল না। এছাড়াও তার ভাষ্যমতে তাদের আশেপাশে আরো অনেক ডাইভার ছিল। যেটাও একটা মিথ্যা কথা। তারা অন্য ডাইভারদের থেকে বেশ দূরে অবস্থান করছিল। গেইব বলেছিল যে সে ছুটে পানির উপরে চলে যায় সাহায্যের জন্য, কিন্তু গেইবের ডাইভিং কম্পিউটার পরীক্ষা করে জানা যায় পানির নিচ থেকে উপরে পৌঁছানোর জন্য সে যথেষ্ট সময় নিয়েছে। এমনকি প্রয়োজনের তুলনায়ও অনেক বেশি। টিনার সাথে থাকা যন্ত্রপাতিতেও কোন সমস্যা ছিল না। এছাড়াও টিনার ফুসফুসে পানির পরিমাণ দেখে পুলিশ ধারণা করে টিনা ডুবে যাওয়ার আগে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস, গেইব যখন টিনাকে জাপটে ধরেছিল সেই মুহূর্তে তার অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিছুক্ষণ পরে আবার চালু করা হয়। সেই সময়টায় টিনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং ডুবে যায়। এছাড়াও গেইব ট্রেনিংপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী ডাইভার হওয়া সত্ত্বেও সে কেন টিনাকে নিজে উদ্ধার না করে অন্যদের সাহায্য চাইতে গেল সেটাও একটা প্রশ্নই থেকে যায়। 

 

এরমধ্যে গেইব কিম নামের আরেক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ায় এবং তারা খুব দ্রুতই বিয়ে করে ফেলে। তবে ২০০৯ সালের মে মাসে গেইবকে তার বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া যেতে হয়। সে যেতে রাজি হয়, তবে তার জন্য একটা চুক্তি করতে হয়। চুক্তিটায় বলা ছিল যে গেইবকে খুনের দায় থেক মুক্তি দিতে হবে, বরং তাকে অনিচ্ছাকৃত হত্যার সাজা দিতে হবে। সেই চুক্তিতেই রাজি হয়ে যায় কোর্ট। খুনের সব প্রমাণ থাকার পরও অস্ট্রেলিয়ার আদালত তাকে অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয়।

 

আরো পড়ুন : চির তারুণ্যের রহস্যোদ্ধার: বয়স কমানোর উপায় বাতলে দিচ্ছে?

 

এই সাজায় খুশি হতে পারে না আমেরিকান পুলিশ। তারা অস্ট্রেলিয়ার কাছে আবেদন জানায় গেইবকে আমেরিকায় ফিরিয়ে এনে বিচার করতে। কিন্তু আলাবামায় তখনো মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন ছিল। তাই অস্ট্রেলিয়া রাজি হচ্ছিল না তাকে ফেরত দিতে। শেষমেশ অ্যালাবামা এই শর্তে রাজি হয় যে অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া কোন প্রমাণাদি অ্যালাবামার কোর্টে ব্যবহার করা যাবে না। গেইব আমেরিকায় ফেরত আসে, তার বিচার শুরু হয়। তাকে খুন এবং কৌশলে অপহরণ, এই দুই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ না থাকায় বিচারকরা বাধ্য হয় গেইবকে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দিতে। এভাবেই ছাড়া পেয়ে যায় একজন সম্ভাব্য ঠান্ডা মাথার খুনি।


Source: Husband admits killing wife in scuba death on Great Barrier Reef

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...