সোফিয়া মস্কালেঙ্কো: একজন চেরনোবিল শিশু

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল “চেরনোবিল নিউক্লিয়ার প্ল্যানেটের” একটি রিয়েক্টরে  ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে ঘটা নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা গুলোর  মাঝে সব থেকে  বেশি বড় ও মারাত্মক ঘটনা এটি।

সোফিয়া মস্কালেঙ্কো: একজন চেরনোবিল শিশু

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের “চেরনোবিল নিউক্লিয়ার প্ল্যানেটের” (ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট) ৪ নাম্বার রিয়েক্টরে  ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চল জুড়ে।এটিই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে ঘটা নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা গুলোর  মাঝে সব থেকে  বেশি বড় ও মারাত্মক। সম্প্রতি ২০১৯ সালে এইচবিও চেরোনোবিলের উপর একটি সংক্ষিপ্ত ডকুমেন্টরি সিরিজ তৈরি করেছে যাতে উঠে এসেছে সেই সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্র ব্যবস্থার গাফলতি, উচ্চ পর্যায়ে তথ্য গোপন ইত্যাদি নানা ধরনের অসংগতি। কেমন ছিল সাধারণ জনগণের চোখে সে সময়টা?

 

বিখ্যাত ভক্স ম্যাগাজিনে ২০১৯ সালে সোফিয়া মস্কালেঙ্কো তুলে ধরেন তার সেই সময়কার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ২০০৪ সালে ইউক্রেন ত্যাগ করেন এবং  ইউ এস এর পেন্সেল্ভেনিয়ায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন।

সোফিয়া-চেরনোবিল
চেরনোবিল থেকে ৬০ মাইল দূরের শহর কিয়েভে বাস করতেন সোফিয়া মস্কালেঙ্কো; image source: Bascom

১৯৮৬ সালে সোফিয়ার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তিনি এবং তার মা বাস করতেন চেরনোবিল থেকে ৬০ মাইল দূরের শহর কিয়েভে। তার ভাষ্য মতে ২৬ এপ্রিলের সকাল ছিল রৌদ্রজ্জ্বল। সোফিয়া দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই  স্থানীয় প্রতিবেশী বাচ্চাদের সাথে খেলে কাটান। পরবর্তী কয়েকদিনেও তার কিংবা সেখানকার অধিবাসী কারোই ধারনাও হয় নি মাত্র ৬০ মাইল দূরে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে।কিন্তু ইতোমধ্যে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল চেরনোবিল এবং এর আশ পাশের বাতাসে। সরকারী গাড়িতে করে সেখান থেকে মানুষদের সরিয়ে আনা হচ্ছিল কিয়েভে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিয়েভবাসী ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

সোফিয়া-চেরনোবিল
তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল চেরনোবিল এবং এর আশ পাশের বাতাসে image source: Rotor and wing

সোফিয়ার পাশের বাসায় থাকতেন ওলেনা। কাজ করতেন গবেষক হিসেবে “কিয়েভ  ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে”। একদিন বিনা নোটিশেই তিনি সোফিয়াদের বাসায় ঝড়ের বেগে এসে সোফিয়ার মাকে নিয়ে এক রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।তিনি তাদের চেরোনোবিলের দুর্ঘটনা এবং এর কারনে বাতাসে  ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তার উচ্চ মাত্রা সম্পর্কে সতর্ক করেন।সেই সাথে এও বলেন বর্তমান পরিস্থিতিতে সোফিয়ার উচিত হবে স্কুলে না যাওয়া এবং দরজা জানালা বন্ধ করে বাসায় থাকা।

সোফিয়া এবং তার মায়ের পক্ষে ওলেনার কথা অবিশ্বাস্য ঠেকল। তাদের এটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল যেখানে সোভিয়েত সরকার থেকেই কোন ধরনের ঘোষণা কিংবা সতর্কবাণী আসে নি সেখানে একজন সামান্য গবেষক হয়ে ওলেনার পক্ষে কিভাবে এসব তথ্য জানা সম্ভব?তাছাড়া যে জিনিস দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না সে জিনিস কিভাবে এত মানুষের জীবন নিতে পারে?

সোফিয়া-চেরনোবিল
বাবা মা’র সাথে সোফিয়া; image source: vox

সোফিয়ার মা পরবর্তীতে আরও তিন পরিবারের সাথে ঘটনাটি আলোচনা করেন এবং প্রত্যেকের মতামত দেন নিশ্চয়ই ওলেনা বাড়িয়ে বলেছে। এমন কোন দুর্ঘটনা হলে সোভিয়েত সরকার অবশ্যই কিয়েভবাসীদের সতর্ক করতো।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিয়েভে শহরের চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছিল। শহরের রাস্তার ফুটপাথ ঘেঁষে বিশাল আকারের ট্রাক পানি ছিটিয়ে এবং যান্ত্রিক বিশাল ব্রাশ ঘুরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে শুরু করেছিল। এই ধরনের ট্রাকের দেখা শুধুমাত্র বিশেষ দিন গুলোতেই পাওয়া যেত।রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা পাকিয়ে গুঞ্জন উঠতে শুরু হয়েছিল।“ চেরনোবিল”, “বিস্ফোরণ” এই ধরনের টুকরো টুকরো কথা ভেসে বেড়াতে লাগলো।

কিন্তু সোফিয়ার স্কুলে সবই ছিল স্বাভাবিক। স্কুল শিক্ষকদের বরাবরের মতই শান্ত এবং স্বাভাবিক আচরণ দেখে সোফিয়া আরও একবার আশ্বস্ত হলও যে নিশ্চয়ই সব ঠিক হয়ে যাবে। স্কুলের বাইরের পরিস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক।বাচ্চারা মাঠে খেলছে, বয়স্করা বাচ্চাদের নিয়ে হাটতে বের হয়েছে। এত গুলো মানুষ তো আর ভুল হতে পারে না। তারপরেও কি রকম এক অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ দেখা যাচ্ছিল অনেকের চোখে।

কয়েকদিনের মাঝেই সোভিয়েত সরকার থেকে ঘোষণা করা হলও যে চেরোনোবিলের “অগ্নিকান্ড” নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাড়ির আঙ্গিনায়,বাস স্টেশনে এমনকি মুদি দোকানেও গুজব বাড়তে লাগলো।চেরোনোবিলের অগ্নিকান্ডে যারা প্রথম সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছিল তারা সবাই মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি এটাও শোনা যাচ্ছিল যে হাজার হাজার মানুষকে তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে।পারতপক্ষে সোফিয়ার নিজের কয়েকটি বই ছাড়া তেমন কিছু ছিল না তারপরেও পরিচিত বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে-এটা যেনো তার কল্পনাতেও ছিল না।

সোফিয়া-চেরনোবিল
১৯৮৬ সালে সোফিয়া;image source: Vox

সোফিয়ার এক বন্ধুর বাবা ছিলেন পুলিশে।বন্ধু থেকেই তারা জানলো যে চেরোনোবিলগামী সকল সামরিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক ভাবে নিরাপত্তা পোষাক পরিধান করতে হচ্ছে।পাশাপাশি চেরনোবিলের একটি অঞ্চল বা সীমানা থেকে বের হয়ে আসার সময়েও আরও অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।কিন্তু সব তথ্যই ছিল আবছা। পরিস্থিতি আরও খারাপের  দিকে এগুতে শুরু করে। ২৬ এপ্রিলের পরের কিছু দিনে মাত্র ২-৩ জন বাচ্চা স্কুলে অনুপস্থিত থাকতো।পরবর্তীতে অনুপস্থিতির সংখ্যা বাড়তে থাকে দ্রুত। মে মাসের অত্যধিক গরমেও বেশির ভাগ বাড়ি গুলোর জানালা বন্ধ থাকতো।এমনকি জানালার ফ্রেম গুলোও সাদা গজ দিয়ে ঢেকে রাখতো সবাই। দিনে বা রাতে রাস্তা পরিষ্কার করা ট্রাকের আনাগোনাও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে।

আরও পড়ুন : এক্সোন ভালদেজঃ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের সবচেয়ে বড় পরিবেশ বিপর্যয়

সোফিয়ার পাশের বাড়ির ইরিন একদিন কালোবাজার থেকে গিগার কাউন্টার কিনে আনেন।সোফিয়া এক রাতে গিগার কাউন্টারটি বাসায় আনেন এবং ঘরের দুধ,ডিম থেকে শুরু করে আসবাবপত্র সব কিছুর তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা করেন। এবং সবকিছুতেই তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল অত্যধিক বেশি।কিন্ত তারপরেও সোফিয়া এবং তার মা ধরেই নিয়েছিলে যে নিশ্চয়ই গিগার কাউন্টারটি নষ্ট।উপসংহারে পৌঁছানোর পরেও সোফিয়ার মনে অস্বস্থি আর উদ্বেগ বাড়তেই  থাকে।

তারপর এলো সেই দিন। ইতোমধ্যে তাদের কলোনির সামনে পার্ক করে রাখা গাড়ির সংখ্যা কমতে থাকলো। বেশিরভাগ মানুষই গাড়ি নিয়ে কিয়েভ থেকে যতদূরে সম্ভব চলে যাচ্ছিল।সোফিয়ার বাবা অন্য জায়গায় আরেক বিয়ে করায় সোফিয়াদের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী ছিল না। মড়ার উপর খরার ঘা হিসেবে এলো ট্রেনের টিকিটের দুর্মূল্য। এক একটি টিকেট প্রায় ২০০ রুবেল দামে বিক্রয় হচ্ছিল যা ছিল প্রায় অনেকেরই মাসিক আয়ের সমান।

অবশেষে সরকার থেকে স্কুলের বাচ্চাদের বাধ্যতামূলক অপসারণের ঘোষণা এলো। সোফিয়ার মা তাঁকে বোঝায় যে কাজের জন্য তিনি সোফিয়ার সাথে যেতে পারবেন না। মা’র এক সহকর্মী তাঁকে স্কুলে নিয়ে যান যেখানে বাচ্চাদের রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাস অপেক্ষা করছিল।সোফিয়া সহ অন্যদের ট্রেনে করে ক্রিমিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ক্রিমিয়া ছিল কিয়েভ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।একটি নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে বাচ্চাদের যাওয়ার আদেশ ছিল না। প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল সু-স্পষ্ট নীতিমালা।প্রতিদিন সকালে কাঠামো-বদ্ধ হয়ে সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত মার্চ করতে হতো। এরপর বুক সমান পানি পর্যন্ত হেটে যাওয়ার অনুমতি ছিল। কিন্ত অবশ্যই সাঁতার কাটা যাবে না।

এমন একঘেয়েমি এবং অনিশ্চয়তায় সোফিয়ায় অস্থির হয়ে উঠে।জুলাই মাসে সরকার ঘোষণা করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোন বাচ্চা কিয়েভে ফিরতে পারবে না। অনেক বাচ্চার বাবা মা ক্রিমিয়া এসে তাদের বাচ্চাকে নিয়ে যান।মার মতে সোফিয়াকে ক্রিমিয়া থেকে নিয়ে আসা অনেক ব্যয় সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই সোফিয়াকে সেখানেই থেকে যেতে হয় বাকি সবার সাথে।

এরই মাঝে সোফিয়ার শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তার কারনে  তার ডার্মেটিটিস দেখা দেয়।তখনকার পরিস্থিতি, বাবা মার উদাসীনতা এবং সরকারের অজস্র তথ্য লুকানো মিথ্যে সোফিয়ার মনকে ভীষণ নাড়া দেয়।

প্রাক্তন সোভিয়েতে বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম শিক্ষা এবং সমাজ ব্যবস্থায় বড় করা হত। তাদের শিখানো হত বড়রা সব ব্যাপারে ঠিক এবং সরকার জানে যে সরকার কি করছে। কিন্তু ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল দুর্ঘটনায় নির্লিপ্ত সরকার এবং অভিব্যক্তি-হীন অভিবাদকদের মনোভাব সোফিয়ার জগত এ পরিবর্তন ঘটায়।

ভক্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সোফিয়া মস্কালেঙ্কোর লিখায় সোভিয়েত সরকারের প্রতি ক্রোধ এবং সেই সময়ে সঠিক নেতৃত্বের অভাব ফুটে উঠেছে।তাঁর মতে সেই সময়ে এমন কাউকে প্রয়োজন ছিল যিনি সরকারের মিথ্যে এবং দ্বিমুখীতার দিকে সরাসরি আঙ্গুল তুলবেন।

১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় এবং প্রেসিডেন্ট গর্ভাচেভ পদত্যাগ করেন।সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পেছনে চেরোনোবিলের দুর্ঘটনাকেও অনেকে অনেকাংশে দায়ী করেন। তবে এ কথা সত্য চেরোনোবিলের কারনে সরকারের অনেক দুর্বলতা জনগণ এবং বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

This article is about Sophia Moskalenko who was a child during Chernobyl Nuclear Accident.

1.Vox 

2.Brut 

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...