সম্রাট অশোক : কলিঙ্গ যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল যাঁকে

মৌর্য সাম্রাজ্যে সম্রাট অশোক নিষ্ঠুর ও অজনপ্রিয়তার প্রতীক ছিলেন। সেই সময় তিনি নিষ্ঠুর অশোক বা চান্দাশোকা উপাধি পেয়েছিলেন।

©Joseph Art gallery blogspot

সম্রাট অশোক : কলিঙ্গ যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল যাঁকে

 

পূর্ব ভারতীয় শাসকদের মধ্যে সম্রাট অশোক ছিলেন এমন একজন শাসক যিনি উপমহাদেশের বৃহত্তর অংশে তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মৌর্য সাম্রাজ্যই অনেককাল এই উপমহাদেশ শাসন করেছে। সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সাম্রাজ্যের বুদ্ধিমান ও প্রতাপশালী শাসক ছিলেন।

 

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তাঁর রাজ্য শাসনের বুদ্ধি,প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক কৌশলের দ্বারা রাজ্যের বিস্তৃতি করেছেন। তাঁর শাসনামলে তাঁর মন্ত্রী চাণক্য তাঁর বুদ্ধি , দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক কৌশল দ্বারা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কে তাঁর সাম্রাজ্য বাড়াতে পথ-প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন।

 

চাণক্য এই সাম্রাজ্যের তিন পুরুষের উপদেষ্টা ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সম্রাট বিন্দুসারের শাসনামলে তাঁর সাথে সম্রাটের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তাঁর দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ,জ্ঞান , বিদ্যা ও বুদ্ধির জন্য তিনি সেই সময় জগৎ বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে দেয়া পরামর্শ ও উক্তি এখনো শ্রেষ্ঠ উক্তি ও পরামর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

সম্রাট-অশোক
সম্রাট অশোক ©Joseph Art gallery

 

চন্দ্রগুপ্ত একাধিক বিবাহ করেন,আর তারই ফলশ্রুতিতে তাঁর মৃত্যুর পর একাধিক পুত্রের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্রাট হওয়ার প্রতিযোগিতায় বিন্দুসার জয়ী হন ও রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিন্দুসারের বিমাতা হেলেন প্রতিনিয়ত তাকে সিংহাসনচ্যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন ,যদিও তিনি সাফল্য লাভ করেননি। তার পুত্র জাস্টিন এর মৃত্যুর পর তিনি মুষড়ে পড়েন ।

 

অশোকের পিতা বিন্দুসারও একাধিক বিয়ে করেন। অশোকের মাতার নাম ধর্মা। অশোকের জন্ম রহস্যাবৃত। ধর্মা বিন্দুসারের পত্নী ছিলেন নাকি প্রেয়সী ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। একাধিক পত্নীর ঘরে অনেক পুত্র সন্তান ছিল বিন্দুসারের। বিন্দুসারের মৃত্যুর পর রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর পুত্রদের মধ্যে দীর্ঘ চার বছর যুদ্ধ হয়। অশোক যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য গ্রিক ভাড়াটিয়া সেনাদের সহায়তায় রাজ পরিবারের সকল পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করেছিলেন। একমাত্র সহোদর তিসা ছাড়া আর বাকি সব ভাইকে হত্যা করেন তিনি। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯-৬৮ অব্দে অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যের সম্রাট হন।

 

 

মৌর্য সাম্রাজ্যে সম্রাট অশোক নিষ্ঠুর ও অজনপ্রিয়তার প্রতীক ছিলেন। সেই সময় তিনি নিষ্ঠুর অশোক বা চান্দাশোকা উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি পশ্চিমে বেলুচিস্তান থেকে বাংলাদেশ ও উত্তরে পামির মালভূমি থেকে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর কিছু অংশ ছাড়া পুরো দক্ষিণ ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন।

 

অশোকের শাসনামলে পুন্ড্রবর্ধন (বর্তমানে বাংলাদেশের বগুড়া) মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল। এই বিভাগকে সম্ভবত অশোক এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।

 

অশোক তাঁর শাসনের প্রথম পর্বে উপমহাদেশের প্রায় অধিকাংশে তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। অশোক পাটলিপুত্র (বর্তমানে পাটনা বা এর আশেপাশের জায়গা )হতে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করতেন।

 

তিনি আশেপাশের প্রায় সব রাজ্যই দখল করে তাঁর সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত করতে থাকেন। সম্রাট অশোক ছিলেন একজন নির্যাতন প্রিয় বর্বর সম্রাট। তাঁর শাসনামলে নির্যাতন করার জন্য আলাদা প্রাসাদ ছিলো। অশোকের নির্দেশনায় নারকীয় নির্যাতন হতো সেই প্রাসাদে। হিন্দু পুরানে পাপীদের নরকে যেভাবে অত্যাচার করা হবে বলে বর্ণনা করা হয়েছে, অশোকের সেই প্রাসাদেও সেভাবেই মানুষদের শাস্তি দেয়া হতো।

সম্রাট-অশোক
মৌর্য সাম্রাজ্যে  যুদ্ধের সময়কালীন© India the destiny

 

তবে মৌর্য বংশে পূর্বপুরুষরা যা পারেননি, অশোক তাঁর পরিণত বয়সে সেই অসাধ্য সাধন করলেন। কলিঙ্গ রাজ্য জয় করলেন তিনি। আর এই যুদ্ধে যে রক্তক্ষয় হয়েছিল তা বিশ্বের ইতিহাসে আর কোনো যুদ্ধে হয়নি বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।

 

কলিঙ্গ যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ , রক্তপাত, মৃত্যুর মিছিল ও এর ভয়াবহতা দেখে তাঁর মনে এক মানবিক পরিবর্তন ঘটে,তিনি অনুশোচনায় দগ্ধ হন। তিনি উপলব্ধি করেন যে যুদ্ধ করে রাজ্য জয় করতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাতে হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের পরও তিনি বেশ কয়েক বছর আরো কিছু গণহত্যার ঘটনা ঘটান। তাঁর ভাই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তিসা আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর সম্রাট অশোক নারকীয় হত্যাকান্ড বন্ধ করেন। এরপর তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি ও ন্যায় নিষ্ঠ শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

 

কলিঙ্গ যুদ্ধই তাঁকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে কল্যাণ ও শান্তির ক্ষেত্রে যুদ্ধ কতটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এরপর তিনি উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছ থেকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেন। তিনি তাঁর মনের শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রেম ও অহিংসার বাণী বিশ্ব জগতে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন।

 

তবে কোন বৌদ্ধ গ্রন্থেও কলিঙ্গের যুদ্ধের সাথে সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। এমনকি অশোকের ধর্মান্তরের ঘটনা কলিঙ্গ যুদ্ধের আগেই ঘটেছে ,এই বিষয়ে তাঁর স্তুতিকার চার্লস আলেন ও এই বিষয়ে এক মত পোষণ করেন।

 

ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন ,উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে অশোক রাজ সভার ব্রাহ্মণ সভাসদগনের সমর্থন পাননি এবং এ বিষয়টিই তাঁকে বিকল্প হিসেবে বৌদ্ধ দর্শনের দিকে ঠেলে দেয়।

 

অশোকের পূর্বপুরুষরা জৈন ও আজিভিকাদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। মৌর্যরা রাজদরবারে বৈদিক রীতি মেনে চললেও ব্যক্তিগত জীবনে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

 

পুরান সাহিত্যের কয়েকটি অসম্পূর্ণ তথ্যের উপরই অশোক সম্পর্কে আমাদের ধারণা সীমাবদ্ধ ছিল। পুরান সাহিত্যে অশোককে মৌর্য রাজবংশের একজন নগণ্য শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সপ অশোকের কয়েকটি প্রস্তরলিপির পাঠোদ্ধার করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পূরাণে অশোককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে অশোক তার চাইতে কয়েকগুন বেশি বড় মাপের সম্রাট ছিলেন। প্রিন্সেপই প্রথম প্রকাশ করেন যে অশোক নিজে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেছেন এবং তা প্রচার করছেন।

 

অশোকের ধর্মের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল অহিংসা। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক যুদ্ধ বিজয়ের পরিবর্তে ধর্ম বিজয়ের নীতি গ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসলেই ধর্মালোচনা করতেন। তিনি বিভিন্ন জনহিতকরমূলক কাজ শুরু করেন।

 

সেই সাথে সাথে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও শুরু করেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতেই বৌদ্ধ মঠ প্রতিষ্টা করেন। তিনি কিছুদূর পর পর শিলাপ্রস্থর ,প্রস্তরখন্ড, ও স্তম্ভ স্থাপন করে তাতে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন বানী খোদাই করে রাখেন যেন এগুলো পড়ে মানুষ তাদের জীবনে এর চর্চা করতে পারেন। এবং এই শিলাপ্রস্তর ,প্রস্তরখন্ড ও স্তম্ভে লিখা ধর্মের বাণীর দ্বারা বৌদ্ধধর্মের প্রচার ঘটে।

 

আরো পড়ুন : শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাট: জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকববের অজানা গল্প

 

সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ সংঘ পুনর্গঠনের কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করলেও অন্য ধর্মকে নিচু করে দেখতেন না। তিনি তাঁর একাধিক লিপিতে মানবজাতির কল্যাণ ও সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। তাঁর রাজ্যে ধর্ম প্রচারের সাথে সাথে মানব কল্যাণের জন্য বৃক্ষরোপণ, কূপ খনন ও বিশ্রামাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

 

বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি দেশবিদেশে কর্মচারী পাঠিয়েছিলেন। তিনি বুদ্ধের আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পন করেন।

 

সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর খুব দ্রুত মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়।


This is a Bengali article on Ashoka.

References-

1.Ashoka

2.Ashoka the Great – Ancient History Encyclopedia

3.Ashoka—facts and information – National Geographic

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...