শখের টং: অনলাইন থেকে যে সফল উদ্যোগ দোকান নামের বাস্তবতায়

অনলাইনের সফলতা পেরিয়ে অফলাইনে ব্যবসাকে নিয়ে যেতে পেরেছে কয়জন? কুমিল্লায় সেটিই করে দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু তরুণ।

শখের টং: অনলাইন থেকে যে সফল উদ্যোগ দোকান নামের বাস্তবতায়

বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটার চল জনপ্রিয় হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। করোনার মহামারীর দিনগুলোয় চাকরি কিংবা আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনলাইন ব্যবসা অনেকেরই বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিয়েছে৷ তাই এমন উদ্যোগগুলোর সফলতাও আকাশ ছুঁয়েছে গেল বেশ কয়েক মাসে৷

বিবিসি বাংলা’র এক প্রতিবেদন  বলছে,  বাংলাদেশের ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনে নিবন্ধিত সদস্য রয়েছে ১৩০০। তবে সংগঠনটির হিসাবে, অনিবন্ধিত ও ফেসবুক মিলিয়ে লক্ষাধিক ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

কিন্তু অনলাইনের সফলতা পেরিয়ে অফলাইনে ব্যবসাকে নিয়ে যেতে পেরেছে কয়জন? কুমিল্লায় সেটিই করে দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু তরুণ। চলুন সেই সফল উদ্যোগের গল্প জানাই আপনাদের।

হাত খরচের ভাবনাই যখন স্বপ্ন দেখিয়েছিল

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে সকলেই চায় ইনকামের পথ খুলতে। টিউশন নামের সাধারণ সমাধানের ভীড়ে কেউ কেউ চায় ভিন্ন কিছুতে নিজেদের মনোযোগী করতে, চায় ব্যবসায়িক চিন্তাধারায় অভিজ্ঞতার ঝুলিটা ভারি করতে। সেই চাওয়ার প্রতিফলন ঘটানোর দারুণ এক উপায় হয়ে এসেছে অনলাইন ব্যবসা। বাংলাদেশে এই ধারণাটি খুব পুরনো না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আয়ের পথ হিসেবে বেশ আলোচিত এক নাম অনলাইন ব্যবসা। কথা হচ্ছিল উদ্যোক্তা মোঃ সাইফুল হক সরকারের সাথে। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে ২০১৯ সালে অনলাইনে শুরু করেছিলেন জুতা বিক্রির ব্যবসা। এরপর অন্যান্য পণ্য এনেও বিক্রিতে সফলতা পান তারা। গেল মাসে তারা দোকান দিয়েছেন কুমিল্লায়। অনলাইন ব্যবসা শুরুর ভাবনা কিভাবে আসলো এমন প্রশ্নে গগলস’কে তিনি বলেছেন,

“বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমরা সবাই চাই নিজে কিছু করে যেনো নিজের হাত খরচের মতো ছোটো খাটো খরচগুলা নিজেরাই সামলাতে পারি।এই চিন্তা ঐ চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।কেউ কেউ আমরা এগুলা ভেবে হতাশ হয়ে যাই এবং একটা পর্যায়ে এই হতাশাটা অনেক বেশি বেড়ে যায়। আমাদের এই অনলাইন বিজনেসটার শুরুটাও অনেকটা এরকমভাবেই হয়েছে।”

‘শখের টং’য়ের যাত্রা কিভাবে?

সময়টা ২০১৯ সালের মার্চ মাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলছে নিয়মিত৷ সাইফুল বলছিলেন, সে সময় হুট করেই একদিন মাথায় আসলো অনলাইন ব্যবসার কথা। “আমাদের প্ল্যানিংটা (পরিকল্পনা) হয় ঢাকা মিরপুর-১ এ বন্ধু হিমেলের (রাফসান বিন আহমদ হিমেল, সহ-উদ্যোক্তা) বাসায় বসে।” এক রাতে দুই বন্ধু অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে ধারণা পাওয়ার পর আলোচনা করতে থাকেন কোন পণ্য দিয়ে এই উদ্যোগটি শুরু করা যায়।

এরপর আরও চার বন্ধুর সাথে তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। সকলের সম্মতিতে পরের মাসেই (২৪শে এপ্রিল) শখের টং এর যাত্রা শুরু হয়।

জুতা দিয়েই শুরু কেনও? 

বর্তমান সময়ে অনলাইন ব্যবসা হয়ে ওঠেছে পোশাক কেন্দ্রিক। চাহিদা থাকায় উদ্যোক্তারাও ঝুঁকছেন নানান ধরণের পোশাক বিক্রয়ে। কিন্তু শখের টং কেনও জুতা দিয়ে শুরু করলো পণ্য বিক্রয়? সাইফুল বলছেন, “শুরুর দিকে আমরা পণ্য নির্বাচনে দ্বিধান্বিত ছিলাম। কারণ যেটি নিয়েই কাজ শুরু করবো ভাবছিলাম সেটিই দেখলাম অনলাইনে আছে।” সাইফুল বলছিলেন,  তারা কিছুটা ভিন্নতা চাচ্ছিলেন। এজন্য তারা ঝু্ঁকেছেন জুতায়।

“তখনকার রিসার্চ অনুযায়ী আমাদের কাছে সেরা চয়েজ হিসেবে মনে হয়েছিল জুতা।এখন যদিও অনলাইনে অনেক সু শপ দেখা যায় তখন হাতে গোণা কয়েকটা শপ ছিল যারা ভালো সার্ভিস দিচ্ছিল।আমরা এজন্য জুতাটাকেই প্রায়োরিটি দিয়েছিলাম। “

শখের টংয়ের উদ্যোক্তারা বলছেন, জুতা নিয়ে কাজ করলেও তাদের সুদুরপ্রসারী একটি পরিকল্পনা ছিল। এজন্য এই উদ্যোগের নামে জুতা রাখেন নি তারা। অনলাইনে জুতার পর পরবর্তীতে শখের টং শাড়ি, শার্ট, ট্রিমার, হুডি, সুয়েটশার্ট, ব্লেন্ডার এসব পণ্যও বিক্রি শুরু করে। করোনাকালে মাস্কও বিক্রি করেছে তারা।

অনলাইনে বিক্রির অভিজ্ঞতা কেমন?

অনলাইনে বেচাকেনায় সাধারণত গ্রাহকদের অভিযোগের পাল্লাটাই ভারী থাকে। সেই ধারণায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারলো শখের টং? আরেক সহ-উদ্যোক্তা নেয়ামুল ইসলাম বলছেন, ” কাস্টমার রিভিউ যদি ধরি সেটা আমাদের ফেসবুক গ্রুপ কিংবা পেইজে, তারা আমাদের উপর সন্তুষ্ট বলা যায়।” এই উদ্যোক্তা জানালেন,  পণ্য কেনার পর গ্রাহক কোনো সমস্যা পেলে তাদের জন্য দ্রুত সেবার ব্যবস্হা রেখেছেন তারা।  এজন্য অভিযোগের পাল্লাটা হালকাই বলে দাবী তার৷

গ্রাহকদের দিক বিবেচনায় কেমন অভিজ্ঞতা সেটা জানতে চাইলে শতকরা হিসেবে আশি ভাগ ভালো অভিজ্ঞতার কথাই বলছেন নেয়ামুল।  বাকি বিশভাগ বাজে অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, “অর্ডার কনফার্ম করে রিসিভ না করা,ফোন না ধরা এসব সমস্যা ছিল।”

বিদেশী ক্রেতায় মজার অভিজ্ঞতা

দেশী ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল শখের টং। তবে বিদেশীদের কাছেও পণ্য বিক্রয়ের অভিজ্ঞতা পেয়েছে শখের টংয়ের উদ্যোক্তারা৷  মজার সেই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সাইফুল। ” তিনি আমাদের থেকে এক জোড়া জুতা অর্ডার করেন।অর্ডার প্রসেস টা ছিল মজার।আমাদের ফেসবুক পেইজে কেউ মেসেজ করলে আমরা সবাইকে বাংলায় উত্তর গুলো দিয়ে থাকি।উনার মেসেজ পেয়েও একই ভাবে আমরা বাংলায় উত্তর দিচ্ছিলাম। উনি বাংলা কিছু না বুঝেও আমাদের উপর কীভাবে যেনো ভরসা করে অর্ডারটি কনফার্ম করেন।” পণ্য ডেলিভারি দিতে গিয়ে বেশ অবাকই হন উদ্যোক্তারা, যখন দেখেন ক্রেতা বিদেশী!

সেই বিদেশী ক্রেতা। ©Shokher Tong

অনলাইনের দোকান যখন অফলাইনে

“দোকান ভাড়ার ব্যাপারটা আসলে হুট করে বলা যায়।কারণ আমাদের এখনই এমন কোনো পরিকল্পনা ছিলনা।” বলছিলেন সাইফুল।

করোনায় সকলের মতোই ব্যবসায় ভাটা পড়ে শখের টংয়েরও। বেশ কয়েক মাস ধরেই বিক্রি একেবারেই কমে যাওয়ায় দোকান নেয়ার ভাবনার দ্রুত বাস্তবায়নে আগ্রহী হন উদ্যোক্তারা৷ গেল ২০ নভেম্বর কুমিল্লার একটি শপিং মলে প্রথম আউটলেট চালু হয়েছে শখের টংয়ের।

সাইফুল জানালেন, এই সময়টা তাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিংই ছিল। কারণ এত বড় একটা পদক্ষেপ  নেয়ার আগে অনেক গুছানো পরিকল্পনা লাগে যেটা তাদের আসলে ছিল না। তবু সাধ্যের মধ্যে সম্ভাব্য সব কিছুই করতে চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্টরা৷

শখের টংয়ের আউটলেটে এখন জুতার পাশাপাশি শার্ট, হুডি, সুয়েটশার্ট বিক্রি করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে উদ্যোক্তারা নতুন আরো কিছু পণ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন।

জুতা থেকে শুরু করে নানান পণ্যই এখন মিলছে দোকানটিতে। ©Shokher Tong

পড়াশোনা এবং ব্যবসা – একইসাথে সামলানো কতটা চ্যালেঞ্জের?

একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে অনলাইন ব্যবসা। এখন তো অনলাইন থেকে অফলাইনেই চলে এসেছে এই উদ্যোগের কার্যক্রম। সামলানোটা কতটা কঠিন জানতে চেয়েছিলাম সাইফুলের কাছে। তিনি অবশ্য পড়াশোনার পাশাপাশি এই ব্যাপারটি সংশ্লিষ্টরা উপভোগ করছেন বলেই জানালেন। “কোনোদিন এটাকে আমাদের বাড়তি চাপ বলে মনে হয়নি। তাই ব্যাপারটা সামলানোতেও আমাদের খুব একটা সমস্যা হয়নি।” বলছিলেন তিনি।

সমন্বয় করা হতো কীভাবে সে প্রসঙ্গে সাইফুল বলছেন, “আমরা যখন যে অবসর থাকতাম সে তখন সময়টা ব্যবসায় দিতাম। পড়াশোনার পাশাপাশি দোকানে সময় দিচ্ছি আমরা সময় ভাগ করে নিয়ে। যেহেতু এখন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং অনলাইনে ক্লাস চলছে তাই আমরা নিজেরাই সময় ভাগাভাগি করে নিয়ে দোকান পরিচালনা করছি।”

বাধা ছিল?

শখের টংয়ের টংয়ের উদ্যোগের পেছনে ছিলেন ছয়জন। গত জুলাইয়ে হটাত করে তাদের এক সদস্য এই উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ান। এটিকেই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠাকালীন অন্য সদস্যরা।

শখের টংয়ের শুরুর দিকের ছয় উদ্যোক্তা।  ©Shokher Tong

সাইফুল বলছেন, এটা ছাড়াও বিভিন্ন বাধা বিভিন্ন সময়ে এসেছে এবং তারা সেগুলো তাদের মতো করেই সামলাতে পেরেছেন।

পেছনের মানুষেরা

শখের টংয়ে শুরু থেকে ছয়জন উদ্যোক্তা ছিলেন। এখনও অবশ্য ছয়জনই আছেন। তবে গেল জুলাইয়ে এক সদস্য সরে দাঁড়ানোয় নতুন করে আরেকজন সদস্য যুক্ত হয়েছেন সংশ্লিষ্টদের সাথে। ছেড়ে যাওয়া সদস্য মাজহারুল হক রাজধানীর বেসরকারি আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বর্তমান আরও দুই সদস্য মতিউর রহমান জাহিদ ও নেয়ামুল ইসলাম। বাকিদের মধ্যে মোঃসাইফুল হক সরকার ও  রেজাউল করিম পড়ছেন রাজধানীর আরেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালে। এছাড়া আরেক সদস্য রাফসান বিন আহমদ হিমেল পড়ছেন বেসরকারি বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ নতুন সদস্য ইকবাল হাসান পড়াশোনা করছেন টঙ্গী কলেজে।

বর্তমান এই ছয় উদ্যোক্তাই এগিয়ে নিচ্ছেন শখের টংকে। ©Shokher Tong

ভবিষ্যতের ভাবনা

” শখের টং যখন শুরু করি তখন থেকেই আমাদের দীর্ঘ সময়ের একটা পরিকল্পনা মাথায় ছিল। মজার ছলে হলেও আমরা সবাই সবাইকে বলতাম একদিন আমাদের টং এর ৬টা শো-রুম হবে ঢাকা সিটির সেরা ৬ টা লোকেশনে। ” বলছিলেন নেয়ামুল ইসলাম।

ঢাকায় না হলেও কুমিল্লায় সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আরও বড় আশা দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের। এখন শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথা জানিয়ে সাইফুল বলছেন,  ” বর্তমান যুগে ই-কমার্সের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, সে জায়গায় থেকে এখন পিছু পা হবার মতো কোনো সুযোগ আমরা দেখিনা। আমরা তাই ভবিষ্যতে তাকিয়ে নিত্য নতুন পরিকল্পনার বাস্তবায়নে এগোচ্ছি।”
এই পথচলায় তিনি এবং তার সহকর্মীরা তাই দোয়া,ভালোবাসা এবং পরামর্শ চেয়েছেন সকলের কাছে।


This is a Bengali Article about an business initiative named Shoker Tong.

Feature Image: Shokher Tong

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...