লাসা: তিব্বতের সেই নিষিদ্ধ নগরীর গল্প

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়জয়কার যতটা বয়ে যেতে শুরু করেছে, লাসা ঠিক ততটাই নাটকীয়ভাবে সীমিত দুনিয়ায় আবদ্ধ। এ নগরীতে প্রবেশ করতে পারতো না কোনো সাংবাদিকও।

লাসা: তিব্বতের সেই নিষিদ্ধ নগরীর গল্প

 

নিষিদ্ধ নগরী বা শহর বলতে আমরা সবাই লাসাকেই চিনি। কেউ বলে থাকেন রহস্যময়, আবার কেউ বলেন নিষিদ্ধ নগরী। নিষিদ্ধ বা রহস্য যায় হোক না কেন এই জায়গাটি সম্পর্কে এখনও বেশ ধুঁয়াশায় আছেন অনেকেই। কেউবা শুধু নাসাকেই নয় পুরো তিব্বতকেই রহস্যময় জায়গা বলে থাকেন। কথাটি ভুল নয় একেবারেই, নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত আর নিষিদ্ধ নগরী বলতে তিব্বতের রাজধানী লাসাকে বোঝানো হয়ে থাকে । কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, লাসাকে কেন নিষিদ্ধ শহর বলা হয়। কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে কুয়াশায় আচ্ছাদিত এই জায়গাটিতে? সেই রহস্যভেদ করতেই আজকের এই আর্টিকেল। 

লাসা
রহস্যময় তিব্বত; ©dainikbonggo

 

বছরে আট মাস বরফে ঢেকে থাকা তিব্বত পৃথিবীর উচ্চতম স্থান। যার গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০০ ফুট উঁচুতে। তিব্বত মূলত আলাদা কোনো দেশ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এটি চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাদেশিক অঞ্চল এটি। এর জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে কম। কারণ ৭৫ লাখ তিব্বতীর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখই বাস করে তিব্বতের বাইরে। যদিও অনেক তিব্বতি একে চীনের অংশ মানতে রাজি নয়। আর এ কারণেই ১৯৬৯ সালে তিব্বতিরা দালাইলামার নেতৃত্বে চীনের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে তুলে যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

 

লাসা কেন পেল নিষিদ্ধ নগরীর তকমা ? 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়জয়কার যতটা বয়ে যেতে শুরু করেছে, লাসা ঠিক ততটাই নাটকীয়ভাবে সীমিত দুনিয়ায় আবদ্ধ। এ নগরীতে প্রবেশ করতে পারতো না কোনো সাংবাদিকও। নেই সচারাচর কোনো বহিরাগত বা বিদেশির প্রবেশের অনুমতি, চাইলেও কেউ আকাশপথ বা স্থলপথেও প্রবেশ করতে পারে না লাসায়৷ যেতে হলে যেতে হবে একদম হেঁটে। তবে সেক্ষেত্রে থাকতে হবে বিশেষ অনুমতি, লাগবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। 

 

লাসা তিব্বতের রাজধানী।  এই শহরটিকে নিষিদ্ধ শহরও বলা হয়। এই শহরটি লাসা নদীর নিকটবর্তী তিব্বতি হিমালয়ের ১১,৯৭৫ ফুটে অবস্থিত। লাসা খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দী থেকে তিব্বতে একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসাবে খুব সুপরিচিত।

লাসা
মানচিত্রে লাসা নগরী; image source: beijingholiday

 

এটি ১৯৪২ সালে তিব্বতের রাজধানী হয়। ১৯৫১ সালে যখন চীনা কমিউনিস্টরা লাসা অঞ্চলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তখনও লাসাই তিব্বতের রাজধানী ছিল। ১৯৬৫ সালে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এই শহরটিকে নিষিদ্ধ স্থান হিসাবে কেন বিচ্যুত করা হয় তার মূল কারণটি ধর্মীয় কারণে। 

 

এলাকাটিকে নিষিদ্ধ নগরী হিসেবে পরিচিতি অন্যতম কারণ এর পাহাড়ি দুর্গম, উঁচু ও বৈরী আবহাওয়া। তিব্বতের রাজধানী লাসা নিজেই একটা বিশাল মালভূমির মতো। তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ পুরোটাই হিমালয় পর্বতমালায় ঘেরা, উত্তরে তারিম বেসিনের কুনলুন পর্বতমালা, উত্তরপূর্বে রয়েছে কাইদাম বেসিনের কিলিয়ান পর্বতমালা। কুনলুন পর্বতমালা এর উত্তরে আবার তাকলামাকান মরুভূমি এবং কিলিয়ান পর্বতমালার অনেকটা উত্তরে আবার গোবি মরুভূমি। প্রকৃতি চোখ ধাঁধিয়ে দিলেও সেখানে পৌঁছানো খুব কঠিন। এমনই দুর্গম ও রহস্যময় এক জায়গা এটি। তাদের জীবনধারা রীতিমতো ভয়ঙ্কর।

 

তিব্বতিদের জীবন যাপন আর সামাজিক রীতিনীতিও অনেকাংশেই ধর্ম নির্ভর। তাদের এই সকল ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতিনীতিও অনেকটা রহস্যময়। বিশেষ করে তিব্বতিদের দালাইলামা নির্বাচন পদ্ধতি একেবারেই অদ্ভুত রকমের। 

 

১৩৯১ সালে আবির্ভাব ঘটে প্রথম দালাই লামার। তিব্বতিদের বিশ্বাস, যখনই কেউ দালাই লামার পদে অভিষিক্ত হন, তখনই ভগবান বুদ্ধের আত্মা তাঁর মধ্যে আবির্ভূত হয়। কিন্তু দালাই লামার মৃত্যুর পর নতুন দালাই লামা নির্বাচন কররটাও বেশ আকর্ষণীয়। তিব্বতিরা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পরও আত্মা জাগতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করে। তাই মৃত্যর সাথে সাথে সৎকার না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মরদেহটি তাদের বাড়িতে রেখে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মা জাগতিক পরিমণ্ডল ত্যাগ না করে। কোনো লামার মৃত্যু হলে সরোবরের তীরে লামারা ধ্যান করতে বসেন।

 

তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দেখতে পান সেই সরোবরে স্বচ্ছ পানির ওপর ভেসে উঠছে একটি গুহার প্রতিবিম্ব, যার পাশে রয়েছে একটি ছোট বাড়ি। যেখানে প্রধান লামা তাঁর সেই অলৌকিক ক্ষমতায় এঁকে দেবেন নতুন দালাই লামার ছবি। তারপর তাঁরা প্রতিটি তিব্বতের ঘরে ঘরে গিয়ে সেই ছবির হুবহু শিশুটি খুঁজে বের করে নতুন দালাই লামা নির্বাচন করেন।

বর্তমান দালাই লামা; image source: theweek.in

তিব্বতিরা বিশ্বাস করে, মানুষের মৃত্যুর পর দেহের ভেতর থেকে প্রেতাত্মারা মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। প্রেতাত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ও প্রেতাত্মাদের খুশি রাখতে তিব্বতিরা বিভিন্ন পূজা অর্চনা করে থাকে। তিব্বতিদের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আচার হচ্ছে সৎকার কাজ। তাদের মৃতদেহ কাউকে ছুঁতে দেওয়া হয় না। ঘরের কোনায় মৃতদেহটি বসিয়ে চাদর অথবা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। মৃতদেহের ঠিক পাশেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পাঁচটি প্রদীপ। তারপর পুরোহিত বদ্ধ ঘরে একা প্রবেশ করে মন্ত্র পড়ে শরীর থেকে আত্মাকে বের করার চেষ্টা করেন। প্রথমে মৃতদেহের মাথা থেকে তিন-চার গোছা চুল টেনে ওপরে তোলা হয়।

 

তারপর পাথরের ছুরি দিয়ে মৃতদেহের কপালের দাগ দিয়ে খানিকটা কেটে প্রেতাত্মা বের করার রাস্তা করে দেওয়া হয়। প্রেতাত্মা বের হয়ে গেলে একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে সেই দাগ ধরে ধরে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। তারপর পশুপাখি দিয়ে খাওয়ানো হয়।

 

তিব্বতিদের সংস্কৃতিতে এমনই সব অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর ধর্মীয় রীতিনীতি যা তাদেরকে দিয়েছে আলাদা বিশেষত্ব। 

 

তিব্বতের বেশিরভাগ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ হাজার ফুটেরও ওপরে অবস্থিত। এই উচ্চতার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস চালানো মোটেই সম্ভব নয়। বহিরাগত কেউ সেখানে গিয়ে টিকতে পারে না। বলা হয়ে থাকে এই উচ্চতায় বসবাস করা সম্ভব নয় বলেই লাসার দিকে পা বাড়ায়নি কেউ।

 

কী আছে লাসায়? 

এখানকার বেশ কয়েকটি বিহার এবং মন্দির পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্র হিসাবে দাঁড়িয়েছিল। এই শহরটি বৌদ্ধ ধর্ম কেন্দ্রের জন্য একটি দুর্দান্ত জায়গা। তিব্বত রাজা তাঁর শাসনামলে এই শহরটিকে একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় কেন্দ্র হিসাবে পরিণত করে। তিনি ধর্মীয় কাজে খুব পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ কারণেই এই শহরটিকে একটি মূল্যবান ধর্মীয় স্থান হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। শহরের প্রাচীন মন্দিরগুলো হচ্ছে গেটসুগ-ল্যাগ-খং এবং ক্লু-খং।  এই দুটি মন্দিরকে শহরের সর্বাধিক বিশিষ্ট মন্দির বলা হয়। 

 

ইয়ারলুং জাংবো নামে পরিচিত ব্রহ্মপুত্র উপনদী নদীর তীরে অবস্থিত লাসা শহরটি দেখে মনে হবে যেন মঠ এবং মন্দিরগুলোর সাথে ঝাঁকিয়ে পড়ছে। এটি খুব বর্ণিল এবং আকর্ষণীয়। বিশেষত, পোটালার প্রাসাদটি লাসার অবশ্যই দেখার-স্থান। এটি দালাই লামার শীতকালীন প্রাসাদ।

লাসা
পোটালার প্রাসাদ, দালাই লামার শীতকালীন প্রাসাদ; © dainikaazadi

 

শোনা যায়, এই প্রাসাদের চূড়া সোনার তৈরি। এই বিশালাকার প্রাসাদটি প্রথম জনসমক্ষে আসে ১৯০৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় এর ছবি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই ছবি প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত বাইরের কেউ প্রাসাদটির ছবি দেখতে পায়নি। এছাড়াও শহর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির যেগুলোর ভেতর প্রজ্বলিত রয়েছে সোনার তৈরি প্রদীপ। এমনকি সেখানে চার হাজার ভরি ওজনের একটি প্রদীপও রয়েছে।

 

আরো পড়ুন : অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ হলেও মাদাগাস্কার ও গ্রিনল্যান্ড কেন দ্বীপ?

 

এটি সমস্ত বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল যদি না আপনার প্রয়োজনীয় নথি না থাকে। এমনকি আজও প্রায়শই লাসাতে প্রায় প্রতিটি ছাদ চীনা সৈন্য দ্বারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদেশী হিসাবে আপনার প্রবেশ করতে বিশেষ কাগজপত্রের প্রয়োজন। লাসা এখনও একটি নিষিদ্ধ শহর, যদি না আপনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন।

 

এই সমস্ত কিছু দিয়ে আপনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন  কেন লাসাকে নিষিদ্ধ শহর বলা হয়। শহরকে নিষেধ করার প্রধান কারণই হচ্ছে ধর্মীয় আধিপত্য। পুরো শহরটি বহু বিহার এবং মন্দির দ্বারা সমবেত  এবং এই শহরটি অনেক ধর্মীয় প্রধানের বাসস্থান হয়ে উঠেছে। এই সমস্ত বিষয় স্থানটিকে একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসাবে তৈরি করেছে এবং লোকজনের প্রবেশ সীমিত করা হয়। যা লাসাকে এনে দিয়েছে নিষিদ্ধ নগরীর তকমা।


This is a Bengali article about ‘Lasa, the forbidden city ‘.

References:

Why Tibet’s Lhasa is called Forbidden City?

Dalay Lama chosen

Feature Image: দৈনিক আজাদি

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...