রুম সালতানাত: যাযাবর দল থেকে রুম শাসন

রুম সুলতানাত, মধ্যযুগে আনাতোলিয়ায় অবস্থিত একটি তুর্কি-ফারসি সুন্নি মুসলিম সাম্রাজ্য। গ্রেট সেলজুকদের একটি বিশেষ অংশ যারা রুমে রাজত্ব করেছে তারাই রুম সালতানাত বা সেলজুকীয় রুম নামে পরিচিত।

রুম সালতানাত: যাযাবর দল থেকে রুম শাসন

 

রুম সালতানাত, মধ্যযুগে আনাতোলিয়ায় অবস্থিত একটি তুর্কি-ফারসি সুন্নি মুসলিম সাম্রাজ্য। গ্রেট সেলজুকদের একটি বিশেষ অংশ যারা রুমে রাজত্ব করেছে তারাই রুম সালতানাত বা সেলজুকীয় রুম নামে পরিচিত।

 

সেলজুকরা মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত ওঘুজ গোত্রের। তারা একাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত আনাতোলিয়া বা রুমে সাম্রাজ্য বিস্তার করে শাসন করেছিল। বর্তমানে যে অঞ্চলটি তুরস্ক নামে পরিচিত, সেসময় এই অঞ্চলটি রুম বা আনাতোলিয়া নামেই পরিচিত ছিল।

রুম-সালতানাত
মানচিত্রে রুম শাসন; Image source: pinterest

 

গ্রেট সেলজুকদের উত্তরসূরি রুমের সেলজুকীয়  রাজবংশ পার্সো-ইসলামিক ঐতিহ্য দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। রুমের সেলজুকরা তুর্কি বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও, ফারসিকে প্রশাসনিক ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার পাশাপাশি পারস্য শিল্প, স্থাপত্য ও সাহিত্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিল। সেইসাথে সুলতানিতে বাইজেন্টাইন প্রভাবটিও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ গ্রীক আভিজাত্য সেলজুক আভিজাত্যের একটি অংশ ছিল এবং এই অঞ্চলে স্থানীয় গ্রীক জনসংখ্যাও ছিল যথেষ্ট।

 

১০৭৭ থেকে ১৩০৭ সাল পর্যন্ত রুমে সেলজুকীয়দের অস্তিত্ব ছিল। প্রথমে তাদের রাজধানী ছিল ইজনিক ও পরে কোনিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। তবে রুম সালতানাত বার বার স্থানান্তরিত  হতো বিধায় কায়সারী এবং শিভাসের মতো শহরগুলোও কখনও কখনও রাজধানী শহর হিসাবে ব্যবহৃত হতো।

 

চূড়ান্ত পর্যায়ে, রুম সালতানাত ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের আন্টালিয়া এবং অ্যালানিয়া উপকূল রেখা থেকে কৃষ্ণ সাগরের সিনোপ অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। পূর্বদিকে এই সালতানাত অন্যান্য তুর্কি রাজ্যগুলোকে একীভূত করে নেয় এবং তা পশ্চিমে দেনিজলি পর্যন্ত পৌঁছায়। 

রুম-সালতানাত
সেলজুকের ভাস্কর্য Image source: thecalvartjournal

 

দশম শতাব্দীর দিকে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব রাশিয়া থেকে তুর্কি জনগণের অভিবাসনের সময় একদল যাযাবরের একটি দল সিরি দরিয়া নদীর তলদেশে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের নেতার নাম ছিল সেলজুক। পরবর্তীতে এই যাযাবর গোত্রটি সুন্নি রূপে ইসলামের আবির্ভূত হয়। তারা গজনির মাহমুদের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

 

একসময় তারা নিজেরা গজনি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারে মন দেয় এবং তাদের নেতা সেলজুকের নামেই পুরো সাম্রাজ্য পরিচিতি পায়। সেলজুকের দুই নাতি চাঘরি বেগ এবং তুঘরিল বেগ তাদের নিজের রাজ্য জয়ের জন্য পারস্য সমর্থন জুগিয়েছিল। ১০৬৩ সালে সেলজুকের মৃত্যুর সময় চাগরি খোরাসান এলাকা দখলে নেয় এবং তুঘরিল নেয় পশ্চিম ইরান এবং মেসোপটেমীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছিলো।

ইস্তানবুল মিলিটারি মিউজিয়ামে রক্ষিত মানজিকার্ট যুদ্ধ-পরবর্তী একটি চিত্র; Image source: Wikimedia Commons

 

সেলজুকরা রাজ্য বিস্তার করতে করতে রোমানদের বর্ডারে এসে পৌঁছায়। সেলজুক সুলতান আলপ আর্সালান ১০৭১ সালে বিখ্যাত মানজিকার্টের যুদ্ধে বাইজান্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন এবং বাইজান্টাইন সম্রাট চতুর্থ রোমানোস ডাইয়োজেনাসকে বন্দী করা হয় যা বায়জান্টাইনের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা।

 

যুগান্তকারী এই যুদ্ধের মাধ্যমে তুর্কিদের জন্য আনাতোলিয়ার দরজা চিরদিনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। সুলতান সম্রাটের সাথে ভাল ব্যাবহার করে তাকে মুক্তি দেন এবং প্রায় পুরো আনাতোলিয়া রোমানদের কাছ থেকে দখল করে সেলজুক সালতানাতের অংশ করে নেন। 

 

সেলজুক সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ লাগে। সামাজ্য কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যায়। রোমানদের কাছ থেকে সেই ১০৭১ সালে দখল নেয়া আনাতোলিয়ায় এক সেলজুক প্রিন্স প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন এক সালতানাত। এরপর এই সালতানাতের নাম হয় রুম সালতানাত  বা সেলজুকীয় রুম। 

 

একটি মতানুসারে সুলতান আলপ আরসলান তার জনৈক দূর সম্পর্কে পিতৃব্য ভ্রাতা সুলাইমানকে এই নববিজিত অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। 

 

মানজিকার্টের যুদ্ধের পরে ১০৭০-এর দশকে সেলজুক কমান্ড্যান্ট সুলায়মান বিন কুতুলামিশ পশ্চিম আনাতোলিয়ায় ক্ষমতায় এসেছিলেন; যিনি মালিক শাহের দূর সম্পর্কের চাচাত ভাই। ১০৭৫ সালে তিনি বাইজেন্টাইনের ইজনিক এবং নিকোমেডিয়ার শহরগুলো জয় করে নেন। দুই বছর পরে তিনি নিজেকে একটি স্বাধীন সেলজুক রাজ্যের সুলতান ঘোষণা করেন এবং ইজনিকে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

 

বিশেষত দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণ সাগর উপকূলে বাইজেন্টাইন মূল বন্দর থেকে রুম সালতানাতের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল। সেলজুকরা আনাতোলিয়ায় বাণিজ্যের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ক্যারাভেনসরাই নির্মাণ করে বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছিল, যা ইরান এবং মধ্য এশিয়া থেকে বন্দরে পণ্য প্রবাহকে সহজতর করেছিল। বিশেষত এসময় জেনোয়ার সাথে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

 

মানজিকার্টের যুদ্ধের পর সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ায় সেলজুকরা পূর্ব আনাতোলিয়ায় অবস্থিত ডেনিশ মেন্ডেল, মেনগেসেক, সালটুকিডস এবং আরতুকিডসের মতো তুরস্কের রাজ্যগুলো সহজেই অধিগ্রহণ করতে সক্ষম করেছিল।

 

এভাবে রুম সালতানাত একটি সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হতে থাকে যা দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ১২৩৭ সাল অবধি বিস্তৃত। এসময়ে রুম সালতানাত তার সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করে। তখন এটি মধ্য প্রাচ্যের অন্যতম ধনী এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে ওঠে।

শিল্পীর তুলীতে কুস দাগের যুদ্ধ; image source: pinterest

 

কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে সেলজুক সুলতানগণ ইরানের ইল-খানিদ এবং মঙ্গোল শাসনের অধীনে নামমাত্র পুতুল শাসক হিসাবে রাজ্য চালাতে বাধ্য হয়। সেলজুকরা সফলভাবে ক্রুসেডারদের মোকাবেলা করতে সক্ষম হলেও মঙ্গোল আক্রমণের সামনে ভেঙে পড়ে।

 

কুস দাগের যুদ্ধের পর সেলজুকরা মঙ্গোলদের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। প্রশাসনের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ সালতানাত ভেঙে পড়তে থাকে এবং চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

আরো পড়ুন : টিউটোবার্গ জঙ্গলের যুদ্ধ: আর্মিনিয়াসের হাত ধরে জার্মানদের স্বাধীনতা লাভের গল্প

 

শেষ দশকগুলোতে বেইলিক নামক কিছু ক্ষুদ্র রাজ্যের উত্থান হয় এবং সালতানাত জুড়ে তারা প্রভাবশালী হয়ে উঠে। এর মধ্যে উসমান পরিবার অন্যতম যারা পরবর্তীতে উসমানীয় সাম্রাজ্য গঠন করে আধিপত্য অর্জন করেছিল।


This is a Bengali article about ‘the history of Rum Sultanate’.

Feature Image: pinterest

Referrence:

Sultanate of Rum

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...