কেমন আছেন রিতা মিতা ?

নে আছে মানসিক ভারসাম্যহীন দুই বোন মিতা রিতা র কথা? মায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন মানসিক ভারসাম্যহীন এই দুই বোন। দীর্ঘ নয় বছর ধরে তারা রহস্যময় জীবনযাপন করছেন।

 

রিতা ও মিতার বাবা শরফুদ্দিন খান সার্ভে অব বাংলাদেশের ম্যানেজার ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি মারা যান। ১৯৯৪ সালে বড় বোন কামরুন নাহার হেনার বিয়ের পর বৃদ্ধা মা কে নিয়ে মিরপুরে ৬ নং সেকশনের সি ব্লকের ৯ নং সড়কে প্রথম বাড়িতে থাকতেন তারা।

 

রিতা বিয়ে করতে চাইলেও তার মায়ের অনুমতি পাননি,তিনি হয়তো মেয়ের মানসিক অসুস্থতা আন্দাজ করতে পারছিলেন। বড় বোনের বিয়ের ৬ মাস পর থেকেই তারা তাদের বড় বোনকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করে,এমনকি তাকে বাবার বাড়িতে ঢুকতে দিতনা,মায়ের সাথেও দেখা করতে দিত না। এমনকি বড় বোনের অপারেশনের জন্য রক্তের দরকার হলে তারা রক্ত দিতেও অস্বীকৃতি জানায়,এভাবেই বড় বোনের সাথে দিন দিন তাদের দূরত্ব বাড়ে।

রিতা-মিতা
মিতা রিতা©Bangladesh protidin

 

নুরুন নাহার মিতা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার,তিনি বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে সেখানেই কেমিক্যাল সেকশনে চাকরি করেন। কিন্তু সুপারভাইজার তার ক্ষতি করতে চাইছে, এই মনোভাব পোষণের পর তিনি দেড় বছর পর চাকরি ছেড়ে দেন।

 

আর আইনুন নাহার রিতা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাশ করেন।

 

৯ম  বি.সি.এস ও পাশ করেন তিনি। পেশায় ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু ঢাকার বাইরে গ্রামে পোস্টিং হওয়ায় সেখানে না গিয়ে ঢাকায় থেকে যান। ফলে বেতন ও পাচ্ছিলেন না। বাড়ির ভিতরে চেম্বার করে তিনি সেখানে রোগী দেখতেন। এফ.সি.পি.এস পাশ করাও সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই তিনি হতাশায় ভুগতে থাকেন।

 

ছোট বোন মিতা মারাত্মক সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। আর ছোট বোনের সাথে থাকতে থাকতে রিতা ‘শেয়ার ডেলিউশন এ আক্রান্ত। ১৯৯৪ সালে রিতা স্বপ্নে গায়েবি আওয়াজ পান বলে মিতাকে জানান। মিতা আগে থেকেই সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। তিনি এ কথায় রিতাকে বুঝান যে এই আভাস আল্লাহ পাঠিয়েছেন। ওনার উপাসনা করতে হবে।

 

এরপর মিতা ২৪ ঘন্টা সাধনায় মগ্ন থাকতেন। রিতা অন্ধের মতো ছোট বোনকে অনুসরণ করতো। তারা প্রার্থনার অংশ হিসেবে হিন্দি প্রেমের গান গেয়ে ধৰ্মীয় সাধনা করতে থাকেন। মিতা রিতাকে বলে তারা গানের দল বানাবেন এবং সারা পৃথিবীতে সে দল ছড়িয়ে পড়ে ধৰ্ম প্রচার করবে। বাংলাদেশ মিতার তালুক,আর দেশের বাইরেও মিতার অনেক ধন সম্পদ আছে। এইসব মিতার দাবি আর রিতা এগুলো অন্ধের মত বিশ্বাস করে।

 

এমন অনেক ভ্রান্ত ধারণায় পার করে ওরা বছরের পর বছর।এগুলো পরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কমিউনিটি এন্ড সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. তাজুল ইসলামের এক প্রতিবেদনে জানা যায়। রিতা মিতা জানায় সবাই তাদের ক্ষতি করতে চায়,এই ভ্রান্ত ধারণা তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়।

 

কোনো দরকার ছাড়া তারা বাসা থেকে বের হতেন না। রিতা মাঝে মধ্যে বাসার কাছাকাছি দোকান থেকে জিনিস নিয়ে আসতো। তা দিয়েই তাদের কয়েকদিন চলে যেত। তারা ঘরে আলোর জন্য হারিকেন ব্যবহার করতেন। বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার করতেন না। তাদের বাড়ির আঙিনায় জমে থাকে ময়লা আবর্জনার স্তূপ।

রিতা-মিতা
মিতা রিতা ©prothomalo

 

এরমধ্যে তাদের মা বিনা চিকিৎসায় ২০০৩ সালে মারা যায়। দু বোন কাউকে না জানিয়ে মায়ের লাশ অনেকদিন ঘরে রেখে দেন। মধ্যরাতে মাকে ঘরে কবর দেয়ার জন্য হারিকেন নিয়ে ঘরের বাইরে গেলে প্রতিবেশীরা দেখে ফেলে। বড় বোন হেনা পরে এগুলো পেপারে পড়ে জানতে পারেন। আর পেপারে দেয়া সংবাদে বাড়ির ঠিকানা থেকে বড় বোন মায়ের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হন।

 

পরে পুলিশ এসে বাসার বাইরে তাদের মায়ের কবর দেন। তারা পুলিশকে জানান যে বড় বোন হেনা তাদের সম্পত্তি দখল করতে চান। তিনি তাদের ভালো চান না। তারা বড় বোনের সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

 

এরপর তারা আবার তাদের একাকী জীবনে ফিরে যান। ঠিকমত খাবার ওষুধ কিছুই খান না। তারা যে বাড়িটাতে থাকতেন সেই বাড়িটি সব ধরনের নাগরিক সুবিধাহীন ভগ্ন, মানুষ বসবাসের অনুপযোগী একটা বাড়ি ছিল বলে মানুষের কাছে তা ভুতুড়ে বাড়ি বলে পরিচিত ছিল।

 

এরপর ২০০৫ সালে এডভোকেট এলিনা পুলিশ নিয়ে কঙ্কালসার দুই বোনকে উদ্ধার করে সেন্ট্রাল হসপিটালে ভর্তি করে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এর সাথে সাথে মানসিক বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামালের অধীনে তাদের চিকিৎসা চলে।
রিতাকে বিএসএমএম এ পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে চাকরি দেয়া হয়। কিন্তু নিয়মিত অফিস না করায় চাকরিটা চলে যায়।

 

তারা নিয়মিত ওষুধ খেতেন না। ২০০৭ সালে তাদেরকে আবার বিএসএমএমইউ যে কয়েক মাস চিকিৎসাধীন রাখা হয়,তারপর তাদের বড় বোন জাফরাবাদে একটি ভাড়া বাসায় তাদের এনে রাখেন। এখানেও তারা নিয়মিত ওষুধ খেতেননা। কারো সাথে মিশতেননা। দুইজন একসঙ্গে বসে গান গাইতেন।

 

এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে তাদের ভর্তি করা হয়। কিছুদিন চিকিৎসার পর হেনা তাদের তার বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু তাতে কোনো হেরফের হয়না।তারা তাদের মতোই চলতে থাকেন নিজেদের খেয়াল খুশি মত।

 

২০১৩ সালে তারা গোপনে বড় বোনের বাসা থেকে পালিয়ে যান। তারা পালিয়ে বগুড়া চলে যান। সেখানে আকবরিয়া হোটেলে দীর্ঘদিন বসবাস করেন। তারা হোটেলের তিনতলার ২১ নং কক্ষে থাকতেন এবং হোটেলের ভাড়া বাবদ প্রায় ৭০,০০০ টাকা পরিশোধ করেন।

 

হোটেলের ব্যবস্থাপক লিটুনুর রহমান জানান তারা তেমন বাইরে বের হতেন না,কারো সঙ্গে মিশতেন না। কিন্তু একসপ্তাহ ধরে হোটেলের ভাড়া পরিশোধ না করায় তাদের খোঁজ খবর করা হলে তারা রুমের দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অসংলগ্ন কথা বলেন। তারপর তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

মিরপুরে তাদের বাড়ি

 

কিন্তু পুলিশ এসে ডাকাডাকি করেও দরজা খোলাতে ব্যর্থ হয়ে পরে তারা ইউএনও ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতিকে জানান। মহিলা আইনজীবীর জ্যেষ্ঠ সদস্য শাহজাদী লায়লা ওদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হন যে এরাই ঢাকা মিরপুরের দুবোন রিতা ও মিতা।

 

এরপর অনেক কষ্ট ও চেষ্টার পর দুইজনকে হোটেল থেকে উদ্ধার করে শহরতলীর বারপুর সামাজিক প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেই সময় তারা খুবই ক্লান্ত ও অসুস্থ ছিলেন।

 

আরো পড়ুন : জড় বস্তুর সাথে প্রেম : মানসিক সমস্যাই কারণ?

এডভোকেট এলিনা ও বড় বোন হেনা এরপর তাদের ঢাকায় তার বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু কিছুদিন পর তারা একদম খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেন। কোনভাবেই খাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে বড় বোন তাদেরকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এ ভর্তি করান।


This is a Bengali article on Rita Mita.

Reference-

1.রিতা-মিতা আবারও হাসপাতালে

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...