রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: কতটা পরিবেশবান্ধব? (ভিডিও)

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: কতটা পরিবেশবান্ধব?

বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার রামপালে নির্মিত হতে চলেছে  ১৩২০ মেগাওয়াট সম্পন্ন দেশের বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র- রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাতীয় তাপ বিদ্যুৎ কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একটি যৌথ অংশীদারিত্ব।

 

সুন্দরবনের থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে পশুর নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত হবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি। অধিগ্রহণ করা হয়েছে প্রকল্পের জন্য  ১৮৩৪ একর জমি। ২০১০ সালে জমি অধিগ্রহণ করে বালু ভরাটের মাধ্যমে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এটিই হতে চলেছে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।

রামপাল-বিদ্যুৎ-কেন্দ্র
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প; image source: dainikorthinithi

গত ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল বাগেরহাটের জেলার রামপালের সাপমারীতে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে যৌথউদ্যোগে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ব ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর যৌথ উদ্যোগে ভারত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির মাধ্যমে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা হয়।

 

বিটিআরসি এবং এনটিপিসি ৫০:৫০ অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে প্রকল্পের বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে। এনটিপিসি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ ও ভারত সমানভাবে এই প্রকল্পের মূলধনের ৩০ শতাংশ শেয়ার করবে। বাকি মূলধন, যা ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য হতে পারে, তা এনটিপিসি থেকে সাহায্যের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র মতে, যৌথ উদ্যোগ কোম্পানীটি একটি ১৫ বছর কর ছাড়ের সুবিধা ভোগ করবে।

রামপাল-বিদ্যুৎ-কেন্দ্র
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিপি) বলেছে ২০২১ সালের শেষ দিকেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র উপাদনে যাবে; image source: muktamancha

মুজিব শতবর্ষে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে চলেছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ। বর্তমানে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৭ হাজারেরও অধিক শ্রমিক কর্মরত আছে। বর্তমানে প্রকল্পটির অবকাঠামোগত কাজের শতকরা ৫৫ ভাগ এবং আর্থিক অগ্রগতির শতকরা ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুই ইউনিট বিশিষ্ট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের প্রথম ইউনিট ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২২ এর প্রথম দিকে উৎপাদনে যাবে।

 

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি। যেখানে একটি সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা পোড়ানোর দক্ষতা ২৮%, সেখানে আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্লান্টের দক্ষতা ৪২-৪৩%। অর্থাৎ একই পরিমাণ কয়লা পুড়িয়ে দেড়গুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

 

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রধান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু গ্যাসের মজুদ দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আর গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। দেশে মূল্য এবং প্রাপ্যতার দিক থেকে বিচার করলে কয়লাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, চীনের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের মোট বিদ্যুতের ৪০ থেকে ৯৮ শতাংশ উৎপাদন করে কয়লা দিয়ে। এদিকে বাংলাদেশে কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ মাত্র  ১.৩৩ শতাংশ। সেই দিক বিবেচনা করে সরকার পশুর নদীর তীর ঘেঁষে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

 

কেন্দ্রটির নির্মাণস্থল সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তসীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের স্থাপনা করা যায় না। তবে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও সুশীল সমাজের একাংশ প্রকল্পটিকে সুন্দরবন ধ্বংসকারী অভিহিত করে এর বিরোধিতা করছে।

রামপাল-বিদ্যুৎ-কেন্দ্র
এ বছরেই উৎপাদনে যাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র; Image source: voltagelav

ইউনেস্কোও এর বিরোধিতা করে দীর্ঘ ৩০ পৃষ্ঠার এক রিপোর্টে সুন্দরবনের চার ধরণের ক্ষতির আশংকার কথা তুলে ধরেছে। 

  • রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে কয়লা পুড়িয়ে। এই কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন কয়লা লাগবে প্রায় ১২,৯২০শ মেট্রিক টন। এই কয়লা পোড়ানোর পর সেখান থেকে থেকে নির্গত কয়লার ছাইকে সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়েছে ইউনেস্কোর এই প্রকল্পে।
  • বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য এবং পানিকে দ্বিতীয় হুমকি গণ্য করছে ইউনেস্কো।
  • এই প্রকল্পকে ঘিরে সুন্দরবন এলাকায় যেভাবে জাহাজ চলাচল বাড়বে এবং ড্রেজিং করার দরকার হবে, সেটিও সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
  • আর সবশেষে বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে ঐ অঞ্চলের সার্বিাক শিল্পায়ন এবং উন্নয়ন কর্মাকান্ডও সুন্দরবনের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করে ইউনেস্কো।


আরো পড়ুন রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র: দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ভিডিও)

 

আর সরকার বলছে, পরিবেশবিজ্ঞানী, গবেষক ও এ-সংক্রান্ত উচ্চতর প্রকৌশল জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়েই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তা ছাড়া এই প্রকল্পে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সুপার ক্রিটিক্যাল ব্যবহৃত হবে। 

 

সাব-ক্রিটিক্যালের তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে প্রায় ৪০% কার্বন, সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস নিঃসরণ কম হয়। থিওরেটিক্যালি আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল প্লান্টে যে কোন প্রকারের দূষণের মাত্রা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়াও একটি সাব-ক্রিটিক্যাল প্লান্টের সার্বিক দক্ষতা  সাধারণত ২০-২৫%, সুপার- ক্রিটিক্যাল প্লান্টের দক্ষতা ৩০ -৩৫ % এবং আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির একটি প্লান্টের ৪০% এরও বেশি দক্ষতা রয়েছে। একটি সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির প্লান্টে যে পরিমান কয়লা ব্যবহার হবে একটি সাব- ক্রিটিক্যাল প্লান্টে তার চেয়ে দ্বিগুন পরিমানে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর যত বেশি কয়লা পুড়বে তত বেশি দূূষণ হবে, তাই আমাদের দেখতে হবে কোথায় কম কয়লায় বেশী শক্তি পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

 

সার্বক্ষণিক পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুসহ প্রকল্প এলাকায় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২ লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হবে। তাই সুন্দরবনের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা অমূলক।

 

ইউনেস্কো প্রথম থেকেই এই প্ল্যান্ট নির্মাণের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে, যখন তারা দেখে যে এই প্ল্যান্টের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাদি অনেক উচুমানের। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির যে আপত্তি ছিল তা তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।


This is a Bengali article about ‘Rampal Power Plant’.

Referrences:

BPDB: Rampal plant will start power generation by end of 2021

Environmentalists stand against Rampal power plant

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...