রাধাবিনোদ পাল: যে বাঙালি বিচারপতি ছিলেন জাপানের দুর্দিনের বন্ধু

যেখানে একজন বঙ্গসন্তানের কথা স্বয়ং বাঙালিরাই ভুলতে বসেছেন, সেখানে ভিনদেশিরা কেন মনে রেখেছেন রাধাবিনোদ পালকে?

রাধাবিনোদ পাল : যে বাঙালি বিচারপতি ছিলেন জাপানের দুর্দিনের বন্ধু

 

জাপানের রাজধানী টোকিওতে চলতে চলতে যদি কখনও কোনো স্মৃতিস্তম্ভে এক বঙ্গসন্তানের নাম চোখে পড়ে, তাহলে আচমকা চমকে যাবেন না যেন। স্মৃতিস্তম্ভের স্থিরচিত্রে কালো রঙের গাউন পড়া ব্যক্তি একজন বাঙালি বিচারপতি ও শিক্ষাবিদ, নাম ড. রাধাবিনোদ পাল। 

 

রাধাবিনোদ পাল, নামটি হয়তো অনেক বঙ্গ সন্তানের কাছেই অপরিচিত। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টোকিও ট্রায়াল’ নামের নেটফ্লিক্সের মিনি-সিরিজের বদৌলতে ‘রাধাবিনোদ পাল’ নামটি চোখের অন্তরালে চলে যায় যায় করেও যায় নি। আমরা বাঙালিরা আজ তাঁর নাম ও কর্ম প্রায় ভুলতে বসলেও, জাপানিরা কিন্তু তাঁকে মোটেই ভুলে যান নি, বরং তিনি গত হওয়ার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জাপানিরা এই বঙ্গসন্তানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। 

 

যেখানে একজন বঙ্গসন্তানের কথা স্বয়ং বাঙালিরাই ভুলতে বসেছেন, সেখানে ভিনদেশিরা কেন মনে রেখেছেন রাধাবিনোদ পালকে? তিনি কে, কি তাঁর পরিচয়, কোন কারণে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

রাধাবিনোদ-পাল
ড. রাধাবিনোদ পাল; © Wikipedia

 

হত দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা

রাধাবিনোদ পালের জন্ম ১৮৭৬ সালে, বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) কুষ্টিয়া জেলার সলিমপুর গ্রামে। তাঁর জন্মস্থান এখন জজপাড়া নামে পরিচিত। তাঁর পিতা বিপিন বিহারি পাল, সেই বাল্যকালেই গত হয়েছেন। রাধাবিনোদ পালের শৈশবকাল ও বাল্যকাল কেটেছে সলিমপুরের আলো-বাতাসে। 

 

হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান রাধাবিনোদ পাল শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে রেখেছেন মেধার ছাপ। কুষ্টিয়ার ছাতিয়ান গ্রামের গোলাম রহমান পণ্ডিতের কাছে তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য চলে যান কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখান থেকে ১৯০৮ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর পাস করেন। 

 

এরপর ফিরে এলেন বাংলাদেশে। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গণিত বিষয়ে শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। রাধাবিনোদ পাল চেয়েছিলেন আইন বিশারদ হতে। তাই শিক্ষকতার সাথে তাল মিলিয়ে ময়মনসিংহ কোর্টে ওকালতির চর্চাও করে গেছে নিয়মিত। এভাবে কাটিয়েছেন কর্মজীবনের একটি দীর্ঘসময়। 

 

১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। এই পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করে নিয়েছিলেন। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। 

 

শুধু যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিক থেকে, তা কিন্তু নয়, তাঁর ন্যায় বিচারের সুখ্যাতি ও নাম-ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। তখন ভারতীয় উপমহাদেশে চলছিল ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে বরাবরই তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। এর মাঝেই ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি (১৯৪১-১৯৪৪) হিসেবে যোগদান করেন। দুই বছর (১৯৪৪-১৯৪৬) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেছিলেন এই বঙ্গসন্তান।

রাধাবিনোদ-পাল
টোকিও ট্রায়ালের জুরিদের সাথে সর্ববামে রাধাবিনোদ পাল; ©: Wikimedia Commons

টোকিও ট্রায়াল এবং একজন রাধাবিনোদ পাল

যে কোনো যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষের কাছে বিজয় যেমন খুশির বার্তা বয়ে আনে, তেমনি পরাজিত পক্ষের জন্য বয়ে আনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মিত্রবাহিনীর প্রধান ডগলাস ম্যাক দূরপ্রাচ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। এই ট্রাইব্যুনালের আওতায় জাপানের যে সকল নেতা সমরবাদের উত্থানের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। রাধাবিনোদ পালের কাছে ডাক আসে এই ট্রাইব্যুনালে একজন জুরি হিসেবে অংশগ্রহণের। 

 

টোকিও যাওয়ার পূর্বে রাধাবিনোদ পাল ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে অন্যতম। রাধাবিনোদ পাল চেয়েছিলেন সলিমপুরে নিজের নীড়ে ফিরতে। কিন্তু নিয়তিতে লেখা ছিল অন্য কিছুই। ইতোমধ্যে তিনি জানতে পারলেন, দূরপ্রাচ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল তাকে বিচারক হিসেবে চাইছে, সেখানে ১১ জন বিচারকের ১ জন হয়ে যাবেন তিনি। 

 

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে তার অবস্থানের দৃঢ়তা জেনেও, মিত্রপক্ষ কেন তাকে বিচারক হিসেবে বেছে নিয়েছিল— তা আজও স্পষ্ট নয়। তবে ধারণা করা হয়, এর প্রধান কারণ ছিল দুইটি। প্রথমত, অনুন্নত এশিয়া মহাদেশের একজন বিচারক রেখে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবী সহজীকরণ। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারকেরা আন্দাজ করতে পারেন নি যে, রাধাবিনোদ পাল সজ্ঞানে তাদের মতামতের বিরোধিতা করতে পারেন। 

 

বিচারকার্য শেষ হতে হতে ১৯৪৮ সাল চলে এলো। 

বর্ষপঞ্জির পাতায় দিনটি ছিল ১২ নভেম্বর, ১৯৪৮। টোকিওর উপকন্ঠে কোনো এক বিশাল বাগানবাড়ির এক হল ঘরে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো সহ মোট পঞ্চান্ন জন যুদ্ধাপরাধী। যাদের মধ্যে ২৮ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে ক্লাস-এ (শান্তিবিরোধী অপরাধ) যুদ্ধাপরাধী। কোনক্রমে অপরাধ প্রমাণিত হলে, যার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

রাধাবিনোদ-পাল
টোকিও ট্রায়ালে জাপানের ক্লাস-এ যুদ্ধাপরাধী; ©: Wikimedia Commons

 

সারা বিশ্ব থেকে এসেছেন ১১ জন দক্ষ ও বিচক্ষণ বিচারপতি। বাঘা বাঘা ১১ জন জুরি পর্যায়ক্রমে ঘোষণা করছেন, ‘গিলটি, গিলটি, গিলটি, গিলটি’। হঠাৎ কেউ একজন অকুতোভয় কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘নট গিলটি’। 

 

সারা হল ঘর জুড়ে নেমে এলো এক ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। সকলের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কে এই জুরি মহোদয়? এই জুরি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশ হতে আগত একমাত্র বাঙালি বিচারক রাধাবিনোদ পাল। ভারতীয় উপমহাদেশ ততদিনে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত। রাধাবিনোদ পালও ঔপনিবেশিক শাসকের দাসত্ব হতে মুক্ত, স্বাধীন বাঙালি

রাধাবিনোদ-পাল
টোকিও ট্রাইব্যুনালে রাধাবিনোদ পালের ব্যবহৃত চেয়ার ; © prothomalo.com

দরিদ্র একটি উপনিবেশের বাসিন্দা হয়তো কোনপ্রকার আপত্তিজ্ঞাপন ছাড়াই বাকিদের রায়ের অনুরূপ রায় দেবে— এমনটি ভেবে ভুল করা নীতিনির্ধারকদের কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছিল না, কীভাবে একজন বাঙালি জুরি অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে আগত জুরিদের উক্তির বিরুদ্ধে আপত্তিজ্ঞাপন করতে পারেন! কেউ কেউ তো ভেবেই বসেছিলেন, বাঙালি জুরির এই নিরপেক্ষতা শক্তিশালী দেশের সাথে ঈর্ষা কিংবা মিত্রশক্তির প্রতি বিদ্বেষ ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না! 

 

সেই নিরীহ ভেবে ভুল করা বাঙালির তেজস্বী অভিব্যক্তি অন্যদের বুঝতে খুব বেশি দেরি হয় নি। তিনি তাঁর অকাট্য যুক্তি দিয়ে বাকিদের বোঝান, অক্ষশক্তির মতো মিত্রশক্তিও আন্তর্জাতিক আইনের সংযম এবং নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করেছে। মিত্রশক্তি লিটল বয় এবং ফ্যাট ম্যান নামের দুটি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে  নাগাসাকি এবং হিরোশিমাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। একইসাথে কেড়ে নিয়েছে কয়েক সহস্র নিরপরাধ মানুষের প্রাণ। 

 

তিনি উল্লেখ করেন, জাপান যা করেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়, কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল যথেষ্ট প্রমাণ যোগাড় করতে পারে নি। সাথে আরও উল্লেখ করেন, জাপান যখন যুদ্ধে জড়িয়েছে তখন আন্তর্জাতিক নীতিমালায় এমন কোনো আইনেরও উল্লেখ ছিল না, যা ভঙ্গ করলে অপরাধীদের ক্লাস-এ বা ক্লাস-সি তে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আর যদি এমন কোনো আইনের অস্তিত্বই না থাকে, তাহলে জাপান কী করে সেই আইন ভাঙল?

রাধাবিনোদ-পাল
বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নিজ হাতে লেখা কবি চণ্ডিদাসের একটি  বাণী— “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”; © prothomalo

 

প্রায় ১,২৩৫ পাতা জুড়ে বাঙালি জুরির দেওয়া সেই রায়ের অকাট্য যুক্তি শুনে অধিকাংশ জুরি জাপানের অপরাধীদের ক্লাস-এ থেকে ক্লাস-বি’তে নামিয়ে আনেন সত্যি, তবে মিত্রশক্তির সাথে নিজেদের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে তাদের নিজেদের রায়ে জাপানি অফিসারদের শাস্তি চাইতে ভুলে যান নি। রাধাবিনোদ পালের এই রায়ে অপরাধীদের অনেকেই বেচেঁ যান নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে। আর জাপান রক্ষা পায় অপূরণীয় ক্ষতি পূরণের হাত থেকে। 

 

এই ট্রাইব্যুনালে জাপানের ৭ জন নেতা মৃত্যুদণ্ড, ১৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২ জন যথাক্রমে ২০ ও ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। 

আরো পড়ুন : বাঘা যতীন: বাঘের মত লড়ে বৃটিশদের কাছে প্রাণ দিয়েছিল যে বিপ্লবী

টোকিও থেকে ফিরে রাধাবিনোদ পাল চেয়েছিলেন অবসরে চলে যেতে, তবে দেশে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পারেন নি। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে জাতিসংঘের আইন বিষয়ক কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। কর্মজীবনে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদে নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন, রচনা করেছেন আইন সম্পর্কিত বহু বই।  

 

জাপান সাম্রাজ্যের আমন্ত্রণে রাধাবিনোদ পাল জাপানে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। ১৯৬৬ সালে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ বেসামরিক জাতীয় মর্যাদা ‘কোক কো কুন সাও’ বা ‘প্রথম শ্রেণীর পবিত্র রত্ন’ তে ভূষিত করেন। এর পরের বছর ১৯৬৭ সালে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একা লড়ে যাওয়া এই সাহসী বিচারপতির জীবনাবসান ঘটে।

রাধাবিনোদ-পাল
হিরোশিমাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত একটি শান্তি সম্মেলনে বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল; ©prothomalo

আজ তার মৃত্যুর ৫৪ বছর পরেও, জাপানের জনগন এই অকুতোভয় বিচারকের অবদানের কথা ভুলে যায় নি। জাপানের দুটি শহর টোকিও ও কিয়াটোর ব্যস্ততম দুটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে রাধাবিনোদ পালের নামে।

টোকিওতে তাঁর নামে জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ এবং জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণাগার নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁর নাম স্থান পেয়েছে জাপানের পাঠ্যক্রমে। জাপানের ইতিহাসে মানবতার প্রশ্নে আপোষহীন বাংলার এই সূর্যসন্তানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু একজন বাংলাদেশি হিসেবে তাঁকে মনে রাখার সামান্য দায়িত্ব আমরা কতটুকু পালন করতে পেরেছি? মিনি-সিরিজ ‘টোকিও ট্রায়াল’-এর বদৌলতে নামটির সাথে পরিচিত হলেও, বাংলার এই সন্তান অধিকাংশ বাঙালির কাছে অবহেলায়ই থেকে গেছেন। 


This Bengali article is about Bengali judge Radhabinod Pal and his justice. 

 

Reference:

 

 

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...