মুমিনুল হক : সাইকেল চালিয়ে উচ্চতা বাড়ানো থেকে টেস্ট স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠা

কক্সবাজারের সেই ছেলেটি আজ বাংলাদেশ দলের সর্বোচ্চ সংখ্যক সেঞ্চুরির মালিক

মুমিনুল হক : সাইকেল চালিয়ে উচ্চতা বাড়ানো থেকে টেস্ট স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠা

 

২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার গল টেস্টে প্রথমবার দেশের হয়ে টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন তিনি। তার অভিষেকের পর থেকে বাংলাদেশ দলের অন্য কোনো খেলোয়াড় টেস্টে তার চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি। ৪২ টেস্টে* তার গড় রান ৪১.১৯, যা বাংলাদেশী ওপেনার তামিম ইকবালের চেয়েও বেশী। আরও একটি রেকর্ড আছে তার ঝুলিতে। বাংলাদেশ দলের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশিবার সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। তিনি হলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হক ।

তার পুরো নাম মুমিনুল হক সৌরভ। মা-বাবা তাকে ডাকেন সৌরভ নামেই। জন্ম ১৯৯১ সালে সাগরপাড়ের জেলা কক্সবাজারে। ক্লাস সিক্সে থাকাকালীন সময় থেকেই মোটামুটি ক্রিকেট খেলা হত মুমিনুলের। কিন্তু খেলতে হতো লুকিয়ে। কারণ মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। এজন্য চাইতেন ছেলে পড়ালেখার দিকে বেশি মনোযোগ দিক। খেলতে গিয়ে কখনো ধরা পড়লে তার মা তার ব্যাট পুড়িয়ে দিতেন। এইজন্য কিছুটা যুদ্ধ করেই ক্রিকেট খেলতে হতো তাকে।

মুমিনুল হক
ছোটবেলায় বাবা নাজমুল হকের সমর্থন পাওয়ায় এতদূর এসেছেন মুমিনুল হক © cricket.upcomingwiki

 

বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানের ক্রিকেটে আসাটাও খুব সহজ ছিলো না। যে মাঠে মমিনুল খেলতেন, সেখানে বিকেএসপি থেকে নিয়মিত কোচ আসতেন একাডেমির জন্য খেলোয়াড় বাছাই করতে। একদিন খেলার সময়ে বিকেএসপি কোচ নাজিম উদ্দিনের নজরে পড়েন ছোটখাট গড়নের মুমিনুল। খেলা দেখে কোচ নাজিম মুমিনুলকে সাথে নিয়ে তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে যান। তাদের বুঝিয়ে মুমিনুলকে ট্রায়ালের জন্য নিয়ে যান কোচ। কিন্তু উচ্চতা কম ছিল বলে প্রথমে জায়গা হয়নি ক্রিকেট একাডেমিতে।

উচ্চতা কম থাকলে মনের মধ্যে জেদ বা ইচ্ছাশক্তি কোনোটাই কম ছিল না মুমিনুলের।

এক বছর সাইকেল চালিয়ে নিজের উচ্চতা কিছুটা বাড়ানোর পর বিকেএসপিতে ঢুকার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

 

ক্লাস সিক্স পর্যন্ত নিজের এলাকায় পড়াশোনা করে ২০০৪ সালে ভর্তি হন সাভারে অবস্থিত বিকেএসপিতে। ক্রিকেটে আসার পেছনে অবদানের কথা বলতে গেলে বলতে হবে বাবা নাজমুল হক এবং বিকেএসপির কোচ নাজিম উদ্দিনের কথা। তবে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন মুমিনুলের বন্ধু ফরহাদ। ফরহাদই তাকে নিয়ে আসতেন এই মাঠে, যেখানে বিকেএসপির কোচ আসতেন ক্রিকেটার বাছাইয়ের কাজে।

মুমিনুল হক
একসময় ক্রিকেট খেলতে বাঁধা দিলেও এখন নিশ্চয়ই গর্ববোধ করেন মমিনুলের মা ©cricket.upcomingwiki

 

সেই বিকেএসপি থেকে যাত্রা শুরু। বাংলাদেশের বৃহত্তম এই ক্রীড়া একাডেমী থেকে ক্রিকেট বিষয়ে ২০১১ সালে স্নাতক পাশ করেন। বিকেএসপির পর তার গন্তব্যস্থল হয় বয়সভিত্তিক দল।

 

ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম থেকেই বামহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে সুনাম অর্জন করেন মুমিনুল হক। অভিষেক হয় ২০০৮-০৯ মৌসুমে। ঢাকা বিভাগীয় দলের হয়ে তিনি খেলতে নামেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের বিপক্ষে। সেটাই ছিলো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মুমিনুলের প্রথম ম্যাচ। তবে সেই মৌসুমের পর থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলেই আছেন মুমিনুল। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেয়ার পর মুমিনুল ডাক পান বাংলাদেশ ক্রিকেট এর বয়সভিত্তিক দলে। ২০১০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ অর্জন করেন মুমিনুল।

 

২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায় বাংলাদেশ এ দল। প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত করেন মুমিনুল। ১৫০ রান করেন বাংলাদেশ এ দলের হয়ে। তার করা দেড়শো এবং নাসির হোসেনের করা ১৩৪ রানে ড্র হয় সেই আনঅফিশিয়াল টেস্ট ম্যাচটি।

মুমিনুল হক
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে মুমিনুল ©cricketcountry

 

২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ৩০ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলার মধ্য দিয়ে ওডিআই অভিষেক হয় মুমিনুলের। তবে সেই ম্যাচে মাঠে নামা হয়নি তার।

 

পরের বছর মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল টেস্টে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের হয়ে প্রথম বারের মতো ম্যাচ খেলতে নামেন মুমিনুল। সাদা পোশাকে প্রথমবার নেমে টেস্টে করেন ৫৫ রান। সেই সিরিজে তার সংগ্রহ করা মোট রান ছিল ১৫৬, গড়ে ৫২। এই পারফর্মেন্স দিয়ে মমিনুল সবাইকে বুঝিয়ে দেন যে বাংলাদেশ দল টেস্ট খেলার মতো একজনকে পেল অবশেষে।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল টেস্টে অভিষেক হয় মুমিনুলের  ©cricketcountry

 

২০১২ সালে টি২০ তে অভিষেক হলেও টি২০ তে তেমন একটা নিয়মিত হতে পারেননি। দেশের হয়ে টি২০ তে সর্বশেষ গায়ে জার্সি চড়িয়েছেন ২০১৪ সালের এপ্রিলে। ম্যাচ খেলেছেন ছয়টি। যার মধ্যে চার ইনিংসে তার সংগ্রহ মাত্র ৬০ রান।

 

২০১৫ সালে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের পর থেকেই মুমিনুল সরে আসতে থাকেন ওডিআই থেকে। ২০১৫ এর পর আবার ২০১৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ডাক পেয়েও তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি। ৪ বলে করেছিলেন ৫ রান।

রঙিন জার্সি গায়ে তেমন একটা আলো ছড়াতে পারেননি মুমিনুল ©cricketsoccer

 

ওডিআই এবং টি২০ দলে তেমন একটা ডাক না পাওয়া মুমিনুলের সুনাম হতে থাকে টেস্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে। ধীরে ধীরে মুমিনুল হয়ে উঠেন টেস্ট ব্যাটসম্যান। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলে গেলেও বাংলাদেশ দল আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ তেমন একটা না খেলায় মুমিনুলকেও জাতীয় দলে তেমন একটা দেখা যায় না। তবে মুমিনুলের যত কীর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা এই টেস্ট ফরম্যাটেই।

 

টেস্ট ক্রিকেটে মুমিনুলের অর্জন বেশ ঈর্ষণীয়। তার টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিলো অনেকটা স্বপ্নের মতো। ক্যারিয়ারের প্রথম ১০ ইনিংসে একবারও দুই অংকে না পৌঁছে পিচ ছাড়েননি মুমিনুল। বাংলাদেশের ব্রাডম্যান বলে ডাকা হতো এই ২৯ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানকে। ক্যারিয়ারের একটা সময় ২৪ ইনিংসে তার ব্যাটিং গড় ছিলো ৬৩.৯০। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে কমপক্ষে ২০ ম্যাচ খেলা ক্রিকেটার হিসেবে তার উপরে ছিলেন কেবল ব্রাডম্যান। এখন অবশ্য সেই গড় চল্লিশের ঘরে নেমে এসেছে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে বাংলাদেশ দলের দ্রুততম ১০০০ রান করা খেলোয়াড় হবার রেকর্ড মুমিনুলের ©cricketcountry

 

টেস্ট ক্রিকেটে তার অর্জন আরও রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে টেস্টে দ্রুততম ১০০০ রান করা্র রেকর্ড একমাত্র এই মুমিনুলের। ২০১৪ সালে খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিনে এই মাইলফলক ছোঁয়ার রেকর্ড করেন মুমিনুল। এই ম্যাচের পারফর্মেন্সের মাধ্যমে মুমিনুল হক টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা আট ব্যাটিং গড়ধারী ব্যাটসম্যানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।

 

টেস্ট ক্রিকেটে টানা ১২ ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করার রেকর্ড দুইজনের। দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স এবং ইংল্যান্ডের জো রুট। তাদের পরেই টানা ১১ ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করার তালিকায় রয়েছেন চারজন ব্যাটসম্যান। এই চারজনের একজন হলেন মুমিনুল হক। এবি ডি ভিলিয়ার্সের রেকর্ডও হয়তো ছুঁয়ে ফেলতেন মুমিনুল। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে আর পঞ্চাশের ঘরে যেতে পারেননি মুমিনুল।

২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কার সাথে টেস্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন মুমিনুল © gettyimages

 

টেস্টে মুমিনুলের প্রিয় প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। এশিয়ান এই দলের বিপক্ষে মুমিনুলের রয়েছে মোট তিনটি সেঞ্চুরি। মুমিনুলের ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরিটি এসেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ২০১৪ সালের ঘটনা সেটা। ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন তিনি। প্রথম ইনিংসে করেন ১৭৬, পরের ইনিংসে আর অতদূর যেতে পারেননি। ১০৫ রান করেই মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাকে।

 

নিউজিল্যান্ডের সাথে মুমিনুলের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তার দ্বিতীয় প্রিয় প্রতিপক্ষও বলা চলে কিউইদের। তার ক্যারিয়ারের দুটি সেঞ্চুরি ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে ম্যাচেই করা। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে দুই ইনিংসে ১৮৮ গড় নিয়ে রান করেছিলেন ৩৭৬। তার স্ট্রাইক রেট ছিল ৬২.৭৭। তার ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৮১ রানও এসেছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।

 

টেস্ট ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ ম্যাচে এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান মুমিনুল। চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই সেঞ্চুরি ছিল একটা গল্পের শুরু। নতুন এক মাইলফলক ছোঁয়ার গল্প। ২০১৩ সালে অভিষেক হওয়া এই ব্যাটসম্যান সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেন কিছুদিন আগে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে, যেখানে নিজের আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন। আরও একবার রানের সংখ্যা তিনের ঘরে নিয়ে যান মুমিনুল। এটি ছিলো তার ক্যারিয়ারের দশম সেঞ্চুরি।

এই সেঞ্চুরির মধ্যে দিয়ে তামিম ইকবালকে পিছনে ফেলে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যকবার সেঞ্চুরি করেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক কক্সবাজারের সেই সৌরভ। 

 

আরো পড়ুন : সাকিব আল হাসানের সেরা ১০টি ইনিংস (ভিডিও)

 

শেষ টেস্টটা অতটা ভালো যায়নি। তবে তার ক্যারিয়ারও তো শেষ হয়ে যায়নি। দারুণ সব ব্যাক্তিগত রেকর্ডধারী এই ব্যাটসম্যান হয়তো দেশকেও এনে দিবেন বড় কোনো অর্জন। 


This is a Bengali Article about Bangladesh Cricketer Mominul Haque.

Reference:

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...