মৃত্যুর পর মানবদেহে পচন ধরে কীভাবে?

‘প্রতিটি মানষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’ ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনের এই আয়াতটি মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু কোরআনেই নয়, প্রতিটি ধর্মের প্রতিটি গ্রন্থে মৃত্যু সম্পর্কিত আয়াত ও উক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। অনেকে মৃত্যু বা এই সম্পর্কিত কথায় বিচলিত হয়ে যায়, আবার অনেকে জীবনের অন্যান্য বাস্তবতার মত মৃত্যুকেও বেশ স্বাভাবিক ভাবে নেয়। মৃত্যু যেমন প্রতিটি মানুষের জন্য অনিবার্য, ঠিক তেমনই মৃত্যুর পর মানবদেহে পচন ধরার ব্যাপারটিও খুব স্বাভাবিক। 

 

বলা হয় ক্ষেত্র বিশেষে মানুষ মরে গেলে শরীর সম্পুর্ন ভাবে পঁচে যেতে তিন সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে তাপমাত্রা, মৃত্যুর কারণ, লাশ রাখার বা দাফনের পরিবেশ, শরীরের ধরন, গঠন, পোকামাকড়ের উপস্থিতি ইত্যাদি আরও কিছু ব্যাপার মিলিয়ে স্বাভাবিক ভাবে এক বছর সময় লাগে একটি শরীর কঙ্কালে পরিনত হতে।

 

তা ছাড়া হাড়, চুল, নখের ক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি হতে পারে কেননা আমাদের চুল এবং নখে থাকা কেরাটিন নামের প্রোটিন শরীরের এই অঙ্গগুলোকে অনেক দিন পর্যন্ত অক্ষত রাখে অন্যান্য সফট টিস্যুর তুলনায়। 

মানবদেহে-পচন
আমাদের চুল এবং নখে থাকা কেরাটিন নামের প্রোটিন শরীরের এই অঙ্গগুলোকে অনেক দিন পর্যন্ত অক্ষত রাখে অন্যান্য সফট টিস্যুর তুলনায়. ©Montclair Nails

 

মৃত্যুর পর শরীরের এই পচন নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল এবং আগ্রহের শেষ নেই। অবাক করা কথা হলো মানব দেহের এই পচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন এবং প্রতিনিয়ত নতুন কিছু উদ্ভাবন করে চলেছেন।

 

এই গবেষণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঞ্চলে গড়ে উঠেছে হিউম্যান ফার্ম বা মানুষের শরীরের ফার্ম। যেখানে শুধু মাত্র মানব দেহের অবস্থান হয় মৃত্যুর পর৷ যে সকল লোকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বা মৃত্যুর কারণ জানা যাচ্ছে না তাদের দেহের স্থান হয় এই হিউম্যান ফার্মে। আবার এমনও হয় যে অনেকে স্বেচ্ছায় তাদের জীবন দশায় তাদের দেহ দান করে যান এই হিউম্যান ফার্মে, যা দিয়ে দেহের পচন এবং মৃত্যুর পর মানব দেহের আচরণ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করা হবে৷ 

 

খুন বা এই জাতীয় মৃত্যুতে ঘটনার শিকার ব্যক্তি কতদিন আগে বা কতক্ষণ আগে মৃত্যু বরণ করেছে তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক সময় দেহের অতিরিক্ত পচনের কারণে বা ঝলসে যাওয়া মৃতদেহ থেকে মৃত্যুর সঠিক সময় বের করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব হতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই মৃত্যুর পর মানব দেহের আচরণ সঠিক ভাবে জানা গবেষক এবং করোনারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়
টেক্সাসের এই হিউম্যান ফার্মে অন্তত পঞ্চাশটি মৃতদেহ একটি বড় খোলা মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে যা জন্তু জানোয়ারদের থেকে সুরক্ষিত রাখতে খাঁচা দিয়ে আটকানো। Image Source : VOX

 

টেক্সাসের এই হিউম্যান ফার্মে অন্তত পঞ্চাশটি মৃতদেহ একটি বড় খোলা মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে যা জন্তু জানোয়ারদের থেকে সুরক্ষিত রাখতে খাঁচা দিয়ে আটকানো।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মৃত্যুর পর তৎক্ষনাৎ আমাদের শরীরে কী কী পরিবর্তনগুলো হওয়া শুরু হয় এবং এক একটি ধাপ কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে? 

 

মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমাদের শরীরে যত তরল পদার্থ উপস্থিত আছে সেগুলো লিক করা শুরু করে এবং জীবাণু সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থানে এসে বাসা বাঁধে এবং দেহ থেকে নিঃস্বরণ হওয়া সব তরল খেতে থাকে৷ এটি হলো মানব দেহের পচন ধরার প্রথম ধাপ। 

 

দ্বিতীয় ধাপে এই জীবাণুগুলো মানুষের শরীরে থাকা এই তরল এবং সলিড অংশগুলোকে গ্যাসে রুপান্তরিত করে যা শরীরকে ব্লোট বা ফাপিঁয়ে তোলে। এই ধাপে মানব শরীরে মার্বেলিং হওয়া শুরু হয় যা হয় মানুষে শরীরে থাকা সালফার এটমের কারণে। এই সালফার এটম রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিন মলিকিউলের সাথে মিলে রক্তের এবং চামড়ার রঙ পাল্টে কমলা বা হলুদ রঙ সৃষ্টি করে।  

 

আর এর মধ্যে এসে উপস্থিত হয় মাছি। মাছি মৃতদেহ রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে আসে এবং শরীরে ডিম পারে। মাছিগুলো বিশেষ করে শরীরের ছিদ্রগুলোতে তাদের ডিম রেখে যায়। যার ফলে মৃতদেহের মগজে, চোখের অংশে, মুখের ভিতর, নাকে সবচেয়ে বেশি পোকা হয় এবং এই পোকা বিশেষ করে শুরুতে এই স্থানগুলো খেয়ে শেষ করে। এই সময় অজস্র পোকা শরীরের বিভিন্ন অংশে হাঁটাহাঁটি করে এবং দেহের অংশবিশেষ খেয়ে শেষ করতে শুরু করে। এই গেলো মানবদেহ পচনের দ্বিতীয় ধাপ। 

মানবদেহে-পচন
মানবদেহে পচন

 

তৃতীয় ধাপে মানুষের শরীর একটি ভিন্ন রকম পরিস্থিতির দিকে যায়। এই ধাপে মূলত এতদিন পোকামাকড় ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে শরীরে যত গ্যাস উৎপাদন হয়েছিল তা আস্তে আস্তে বের হতে শুরু করে। আগে যখন মানুষের দেহের পচন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান ছিল না তখন মৃত ব্যক্তির কফিন খুব শক্ত করে আটকে তারপর মাটি চাপা দেওয়া হতো বা কিছু কিছু গোষ্ঠীর লোক কফিন আটকে মাটির উপর রেখে আসতো সব রকম শেষ ক্রিয়া সম্পন্ন করার পর। 

 

সেই সময় দেহ যখন পচনের তৃতীয় ধাপে পৌঁছাতো তখন কিছু কিছু মৃতদেহ যেগুলোতে অতিরিক্ত গ্যাস সৃষ্টি হতো এগুলোর কফিন বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতো যা লোকজন অতিপ্রাকৃত ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করতো। পরবর্তী সময় দেহের পচনের ব্যপারে জ্ঞান লাভের পর থেকে কফিনের মধ্যে বায়ু যাতায়াতের জন্য জায়গা ফাকা রাখতে শুরু করে যেমনটা আজও হয়ে আসছে।

 

তৃতীয় ধাপে মৃতদেহ এই গ্যাসের জন্য অতিমাত্রায় ফুলে উঠে এবং তার সাথে শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পচনের কারণে কালো, ঘন, দুর্গন্ধ যুক্ত তরল বের হয়ে আসে। শরীর থেকে বের হওয়া এই তরলগুলো অতিমাত্রায় পুষ্টি বহন করে, এতে এতটাই নাইট্রোজেন থাকে যে এটি মৃতদেহের আশেপাশে থাকা ঘাস এবং গাছপালা মেরে ফেলে। তবে এক বছরের মধ্যেই সেই স্থানের মাটি আরও অনেক বেশি উর্বর হয়ে উঠে যে মাটিতে  রোপণ করা গাছ অনেক তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। 

 

চতুর্থ ধাপে শুরু হয় দেহটির ছোট হয়ে আসা। উপরের উল্লেখিত তিনটি ধাপ তুলনামূলক বেশ তাড়াতাড়ি হলেও চতুর্থ ধাপে এসে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর হয়ে আসে। পোকা সম্পুর্ন দেহটি খেয়ে শেষ করে ফেলে, আর পরে থাকে শুধু চামড়ার একটি পাতলা অংশ যা দেখতে অন্য যে কোন পশুর শুকনো চামড়ার মতো। 

 

এই অবস্থাতে পরে থাকা দেহটিতে এখনও জড়িয়ে আছে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া যা পরে থাকা অবশিষ্ট আস্তে আস্তে ক্ষয় করবে। তবে মৃতদেহ যদি কফিন, মাটি চাপা, বা কোন আবৃত স্থানে না রাখা হয় সেই ক্ষেত্রে দেহ পচনে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক অল্প সময় লাগবে কেননা জন্তুজানোয়ার এবং শকুন মৃতদেহ খেয়ে দ্রুত শেষ করে ফেলবে কয়েক ঘন্টার মধ্যে আর ফেলে রাখবে শুধু হাড়গোড়। 

 

আরো পড়ুন : দেশে-দেশে মৃত্যুদন্ডের যত বিধান

 

আবৃত স্থানে রাখা দেহতে অবশিষ্ট চামড়া খেয়ে শেষ করতে ব্যাকটেরিয়া ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় নিতে পারে এবং পরবর্তীতে যা থাকবে তা হলো শুধুই হাড়গোড়। শুনতে যতই অদ্ভুত শোনাক না কেন আমাদের মধ্যে যে প্রতিটি মানুষ মারা গেছেন তাদের যদি দাহ করা না হয়ে থাকে তাদের শরীরও ঠিক এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই গেছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের বানিয়েছেন এভাবেই। যা মাটি দিয়ে তৈরী তা মাটিতেই মিলিয়ে যাবে আর মানুষের শরীরে থাকা সব পুষ্টি এবং উপাদান দিয়ে তৈরী হবে উর্বর মাটি, নতুন ফসল, জন্ম নিবে আরও একটি নতুন প্রাণ। 

 


This is a Bengali language article on Human Body Decomposition.

Reference : Human Body Decomposition.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...