যেভাবে জন্ম হলো আমাদের মাতৃভাষা বাংলার

১৯৫২ এ লড়াই করে আজ আমরা এই ভাষা তে কথা বলতে পারছি। পরিবর্তন এর মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষা সৃষ্টি তো হয়ে যায় কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা হিসেবে পেতে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে অনেক।

যেভাবে জন্ম হলো আমাদের মাতৃভাষা বাংলার

আমার মাতৃভাষা তিব্বতের গুহাচারী, মনসার দর্পচূর্ণকারী

আরাকানের রাজসভার মণিময় অলঙ্কার, বরেন্দ্রভূমির বাউলের উদাস আহ্বান,

মাইকেল – রবীন্দ্রনাথ – নজরুল ইসলাম আমার মাতৃভাষা। আমার মাতৃভাষা বাংলাভাষা। 

– মুনীর চৌধুরী

 

পৃথিবীতে প্রায় ৬৫০০ ভাষা রয়েছে। প্রতিটি ভাষার একটি সূচনালগ্ন রয়েছে। যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঐ ভাষার পথ চলা। ঠিক তেমনি আমাদের বাংলা ভাষাও একই ভাবে সৃষ্টি হয়েছে। আজ আমার এই লেখা তে তুলে ধরার চেষ্টা করবো বাংলা ভাষার ঐ জন্মকথা। আমরা অনেকেই জানি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ থেকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ঠিক কী কী পরিবর্তন এর মধ্যে দিয়ে আমরা বাংলা কে পেলাম তাই জানবো আজ।

পৃথিবীতে যতো ভাষার প্রচলন আছে সবগুলো ১২ টি ভাষাবংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ আপনি যে ভাষাতেই কথা বলেন না কেনো তা এই ১২ টি ভাষাবংশের কোনটি থেকেই সৃষ্টি।

এই ১২ টি ভাষাবংশ হলো – 

১) ইন্দো-ইউরোপীয় বা আর্য, ২) সেমীয়-হামীয়, ৩) বান্টু, ৪) ফিন্নো-উগ্রীয়, ৫) তুর্ক-মোঙ্গোল-মাঞ্চু, ৬) ককেশীয়, ৭) দ্রাবিড়, ৮) অস্ট্রিক, ৯) ভোট-চীনীয়, ১০) উওর-পূর্ব সীমান্তীয়, ১১) এস্কিমো, ১২) আমেরিকার আদিম ভাষাগুলি।

এই ভাষাবংশের মধ্যে ইন্দো-ইউরোপীয় কে সবথেকে গুরুত্বপূর্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, এই ভাষাবংশ থেকেই পরবর্তীতে  অনেক উন্নত ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে বিখ্যাত অনেক সাহিত্যকর্ম। 

বাংলা ভাষার জন্ম উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইন্দো-ইউরোপিয় বা মূল আর্য ভাষাবংশের দিকে।বাংলা ভাষার জন্ম ঐ ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষাবংশ  থেকেই। কিন্তু, এই ভাষাবংশ থেকে সরাসরি বাংলা ভাষার জন্ম হয়ে যায় নি। নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আমরা পেয়েছি আজকের এই বাংলা ভাষা কে।

ইন্দো-ইউরোপিয়রা মূলত বসবাস করতো দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশে। প্রায় ২৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে তারা সেই উরাল পর্বত থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

নানা দিকে বিস্তারের কারণে তাদের ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষাবংশ থেকে দশটি প্রাচীনা ভাষার সৃষ্টি হয়।

এই দশটি ভাষা হলো-

১) ইন্দো-ইরানীয়, ২) বাল্তো-স্লাবিক, ৩) আল্বানীয়, ৪) আর্মেনীয়, ৫) গ্রীক্, ৬) ইতালিক্ বা লাতিন, ৭) টিউটনিক বা জার্মানিক্ , ৮) কেলতিক্, ৯) তোখারীয় এবং ১০) হিওীয়।

 এদের মধ্যে শুধু ইন্দো-ইরানীয় ভাষাটিকে আর্য বলা হলেও ব্যাপক অর্থে পুরো সমগ্র ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষাবংশকেই আর্য ভাষাবংশ বলা হয়।

আর এই ইন্দো-ইরানীয় ভাষা থেকেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের বাংলা ভাষা। 

ইন্দো-ইরানীয় ভাষা থেকে দুটি উপশাখার সৃষ্টি হয়-

ইরানীয় আর্য এবং ভারতীয় আর্য। ইরানীয় উপশাখাটি চলে যায় পারস্যে এবং ভারতীয় উপশাখাটি প্রবেশ করে ভারতবর্ষে আনুমানিক ১৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে। তার পর থেকে শুরু হয় ভারতীয় আর্য ভাষার বিবর্তন।

যিশুখ্রিস্টপর জন্মের পূর্বের দেড়হাজার বছর এবং যিশুখ্রিস্টেরর জন্মের পরের দুইহাজার বছর পর্যন্ত ভারতীয় আর্যভাষার এই সাড়ে তিনহাজর বছরের ইতিহাসকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়-

 ১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য – আনুমানিক ১৫০০ খ্রী: পূ: থেকে ৬০০ খ্রী: পূ: পর্যন্ত। এই যুগে আর্যভাষার নাম দেওয়া যায় সংস্কৃত ভাষা।

 ২) মধ্য ভারতীয় আর্য – আনুমানিক ৬০০ খ্রী: পূ: থেকে ৯০০ খ্রী: পূ: পর্যন্ত। এ যুগে আর্য ভাষার নাম পালি-প্রাকৃত-অপভ্রংশ।

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন এবং প্রথম নিদর্শন | নোটখাতা
বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ। ছবি- piplika

 ৩) নব্য ভারতীয় আর্য – আনুমানিক ৯০০ খ্রী: পূ: থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত।

এই প্রাচীন ভারতীয় আর্যের দুটি রূপ ছিলো – সাহিত্যিক এবং কথ্য রূপ। কথ্য রূপটি আবার চারটি আঞ্চলিক উপভাষায়া ভাগ হয় – প্রাচ্য, উদীচ্য, মধ্যদেশীয় ও দক্ষিণাত্য।

এই চারটি আঞ্চলিক উপভাষা থেকে পরবর্তিতে ৫ টি মৌখিক প্রাকৃতিক ভাষার সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে প্রাচ্য থেকে তৈরি হয় প্রাচ্যা প্রাকৃত। 

তারপর, মৌখিক প্রাকৃত থেকে তৈরি হয় সাহিত্যিক প্রাকৃত। যার ফলে, প্রাচ্যা প্রাকৃত হয়ে যায় মাগধী প্রাকৃত।

সাহিত্যিক প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশের সৃষ্টি হয়। মাগধী প্রাকৃত হয়ে যায় মাগধী অপভ্রংশ অবহটঠ।

 সবশের্ষ অপভ্রংশ অবহটঠ থেকে একাধিক নব্য ভারতীয় আর্যভাষার সৃষ্টি হয়।যার ফলে আমরা মাগধী অপভ্রংশ অবহটঠ থেকে বাংলা ভাষাকে পাই।

 আমরা যদি এক নজরে বাংলা ভাষার জন্ম দেখতে  চাই তাহলে এভাবে দেখানো যায়-

 ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাবংশ => ইন্দো-ইরানীয় => প্রাচীন ভারতীয় আর্য => কথ্যরূপ => প্রাচ্য => প্রাচ্যা => মাগধী প্রাকৃত => মাগধী অপভ্রংশ অবহটঠ => বাংলা

 এটাই মূলত বাংলা ভাষার জন্মকথা।

মাতৃভাষা
বাংলা ভাষাভাষীর জনপদ। ছবি- wikipedia

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে তাহলে অন্য আঞ্চলিক উপভাষা গুলোর কী হলো? 

অন্য উপভাষা গুলো থোকেও পরবর্তীতে নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছিলো। সৃষ্টি হয়েছিলো অবধী্,  পাঞ্জাবী, হিন্দি ও মারাঠী ভাষা।

প্রাচ্য-মধ্যা থেকে প্রাচ্যা-মধ্যা প্রাকৃত, তারপর অর্ধমাগধী প্রাকৃত, তারপর অর্ধমাগধী অপভ্রংশ অবহটঠ, সবশেষ অবধী্ ভাষার সৃষ্টি হয়।

উদীচ্য থেকে উওর পশ্চিমা প্রাকৃত, তারপর পৈশাচী, তারপর পৈশাচী অপভ্রংশ অবহটঠ, সবশেষ পাঞ্জাবী ভাষার সৃষ্টি হয়। 

আরো দেখুন: হারিয়ে যাওয়া মসলিনের উত্থান যেভাবে 

মধ্যদেশীয় থেকে পশ্চিমা প্রাকৃত, তারপর শৌরসেনী, তারপর শৌরসেনী অপভ্রংশ অবহটঠ, সবশেষ হিন্দি ভাষার সৃষ্টি হয়।

দাক্ষিণাত্য থেকে দক্ষিণ পশ্চিমা প্রাকৃত, তারপর মহারাষ্ট্রীয় প্রাকৃত, তারপর মহারাষ্ট্রীয় অপভ্রংশ অবহটঠ, সবশেষ মারাঠী ভাষার সৃষ্টি হয়।

মাতৃভাষা
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন এবং প্রথম নিদর্শন | নোটখাতা

 

 তবে আজ আমি বা আপনি যে বাংলা ভাষাটা ব্যবহার করছি তাও দিনে দিনে পরিবর্তন হয়েছে অনেক এবং পরিবর্তন হয়েই চলেছে। প্রথম যখন বাংলা ভাষার জন্ম হয় এর অক্ষর গুলো এমন ছিলো না, এই ভাষা বলার ধরণটাও ছিলো ভিন্ন। যুগের পর যুগ কেটেছে। নানা পরিবর্তন হয়েছে। আর সব পরিবর্তন এর শেষ রূপ আজ আমরা যে বাংলা অক্ষর গুলো দেখছি, যেভাবে কথা বলছি ঐ টাই। বাংলা ভাষার হাজার বছরের এই বির্বতনের দ্বারা আজো বহমান আছে। 

 এই ভাষার জন্য আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে।  এই ভাষার জন্য আমাদের লড়াই করতে হয়েছে। এই ভাষার জন্য আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

মাতৃভাষা
ভাষা আন্দোলন।  ছবি- thestatesman

                             

১৯৫২ এ লড়াই করে আজ আমরা এই ভাষা তে কথা বলতে পারছি। পরিবর্তন এর মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষা সৃষ্টি তো হয়ে যায় কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা হিসেবে পেতে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে অনেক। ১৯৫২ তে এই বাংলা জন্য শহীদ হতে হয়েছে রফিক, সালাম, বরকতদের। তাদের আত্মত্যগের বিনিময়ে আজ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি। তারা এই লড়াই না করলে, নিজের জীবন কে ভাষার জন্য বিলিয়ে না দিলে হয়তো আজ আমরা এইদেশে এই বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করতে পারতাম না, বাংলা ভাষার ছন্দ, সৌন্দর্য তা অনুভব করতে পারতাম না।

আর এই বাংলার জন্যই আমরা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে পারি। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য আমরা যে রক্ত দিয়েছি তা পৃথিবীর আর কোনো জাতিকে দিতে হয় নি। ভাষার জন্য ও যে প্রাণ দিতে হয় এই দৃষ্টান্ত বিরল। যার করণে, সকল ভাষার থেকে বাংলা ভাষার রয়েছে আলাদা এক মর্যাদা। এই বাংলা ভাষার কারণে সকলে দেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

সকল দেশের মানুষ স্মরণ করে তাদের নিজ নিজ ভাষার গুরুত্ব। 

মাতৃভাষা
শহীদ মিনার। ছবি – Daily Mail 24

বাংলা ভাষা সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ভাষায় রচিত হয়েছে হাজার হাজার সাহিত্যকর্ম। সৃষ্টি হয়েছে শত শত কবি – সাহিত্যিক। বাংলার ঐ আদি নির্দশন চর্যাপদ থেকে শুরু হয়ে সাহিত্যকর্ম আজো বহমান আছে। তবে বদলে গেছে লেখার ধরণ। চর্যাপদের ভাষাটা এখম আমাদের কাছে অনেকটাই কঠিন মনে হয়, তবে ঐ যুগে ঐটাই ছিলো সহজাত ভাষা।

মনে হয় এতো বাংলা ভাষা নয়, কিন্তু ঐটাই বাংলা সাহিত্যের আদি নির্দশন। ঐ অক্ষর গুলো, ঐ লেখার ধরণ গুলো, ঐ ছন্দ গুলো এখন আর ব্যবহার হয় না তাই আমাদের এমন মনে হয়। চলতে থাক বাংলা ভাষার ব্যবহার, বাড়তে থাক বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা। 

আরো পড়ুন : জাতিসংঘে বাংলাদেশঃ বাংলা ভাষায় ভাষনের প্রচলনে বঙ্গবন্ধু

বলতে গেলে এই সব কিছু মিলিয়েই বাংলা ভাষার জন্ম কথা।  তবে যুগে যুগে এ ভাষার মধ্যেও মিশে গেছে অনেক ভিনদেশি ভাষা। যা এখন আমরা বাংলা ভাষা মনে করেই ব্যবহার করে যাচ্ছি। তা নিয়ে না হয় লিখবো অন্য কোনোদিন।


This is a Bengali article about the origin of Bengali language.

Feature Image : দৈনিক পূর্বকোণ

রেফারেন্স:

বই- সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা

লেখক – ড. রামেশ্বর 

চতুর্থ সংস্করণ।

পৃষ্ঠা – (৫৯১-৫৯৫)

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...