মাংসাশী উদ্ভিদ: পুষ্টি আস্বাদনে যারা হয়ে ওঠে প্রাণি-খেকো!

গাছ বা উদ্ভিদ বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল কিংবা ক্ষুদ্র দেখতে একটি অবয়বের কথা, যার উপরটার পুরোটা জুড়েই সবুজ। চিরহরিৎ এ প্রকৃতিকে যদি চোখ বুঁজে কল্পনা করতে হয় তবে সেখানে একটু আধটু করে গাছ উঁকি দেবেই। গাছ ছাড়া প্রকৃতি হয়?

গাছ বা উদ্ভিদ বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল কিংবা ক্ষুদ্র দেখতে একটি অবয়বের কথা, যার উপরটার পুরোটা জুড়েই সবুজ। চিরহরিৎ এ প্রকৃতিকে যদি চোখ বুঁজে কল্পনা করতে হয় তবে সেখানে একটু আধটু করে গাছ উঁকি দেবেই। গাছ ছাড়া প্রকৃতি হয়?

মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণিদের খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া উদ্ভিদের থেকে আলাদা। মানুষ তার সংগৃহীত খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের পর গ্রহণ করে। অন্যান্য প্রাণি কেবল শিকার করে আর গ্রহণ করে। উদ্ভিদ স্বস্থানে থেকেই মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি টেনে নেয়, বাড়তি হিসেবে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সূর্যের আলো আর পাতার মাধ্যমে তৈরি করে খাবার অর্থাৎ উদ্ভিদের খাদ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে সালোকসংশ্লেষণ। এ বিষয়ে আমরা কমবেশি সবাই শিশুকালে বিজ্ঞান বইতে পড়েছি।

 

কিন্তু হঠাৎ যদি কোন গাছকে দেখেন মশা, মাছি, পোকা, ব্যাং, ছোটো ইঁদুর খাচ্ছে তবে বিষয়টা কেমন লাগবে? কেমন লাগার এ অনুভূতিটুকু জিইয়ে রাখতেই আজকের লেখনে সে সব গাছের কথাই তুলে আনবো যারা আদতে গাছ হলেও বিজ্ঞান একে মাংসাশী উদ্ভিদ বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।

 

তো চলুন জানা যাক-

মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
মাংসাশী উদ্ভিদ ©thesciencemagazine

 

ভেনাস ফ্লাইট্র‍্যাপ!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার জলাভূমিতে দেখতে পাওয়া এ উদ্ভিদটির সৌন্দর্যে আপনি বিমোহিত হবেন।
মাংসাশী এ উদ্ভিদগুলোর জীবনকাল কিন্তু বেশ লম্বা। ২০ থেকে ৩০ বছর এরা অনায়াসে বেঁচে থাকে। মাংসাশী হলেও উদ্ভিদগুলোতে ফুল ধরে ঠিক মাঝ বরাবর দণ্ডাকৃতির কান্ডে। ফুলগুলোর রং সাদা। ভীষণ মায়া লাগানো এ সাদা ফুল থেকে আবার কালো দেখতে থোকায় থোকায় ফল বেরিয়ে আসে।
উদ্ভিদগুলোর গোড়ার কাছাকাছি প্রায় ১ ইঞ্চি উচ্চতা সমান কিছু সবুজ পাতা জন্ম নেয়। অদ্ভুদ দর্শনের এ পাতাগুলো দেখলে আপনার ঝিনুক কিংবা মুখের চোয়ালের কথাই মনে হবে। প্রতিটা পাতা ৩ থেকে ৬ ইঞ্চির মতো লম্বা হয় এবং এদের গায়ে মিশে থাকে সহস্র ছোটো ছোটো আদুরে লোম।

 

উদ্ভিদগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য আছে, নামে মাংসাশী হলেও এরা কিন্তু হাপুসহুপুস করে খায় না। উদ্ভিদটি এর পাতা দিয়ে পোকা আঁটকিয়ে সে পোকাকে ধীরে সুস্থে হজম করে আর এতে উদ্ভিদটির সময় লাগে ১০ দিন।
মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
একেকটি পোকা হজমে উদ্ভিদটির সময় লাগে ১০ দিন! ©science
ভেনাস ফ্লাইট্র‍্যাপ নামক এ মাংসাশী উদ্ভিদটির একেকটি পাতা একসাথে ৩ থেকে ৪ টি পোকাকে আঁটকে নিতে পারে এবং পুষ্টি আস্বাদনে প্রায় ১০ দিন সময় নেওয়ার কারণে এই পাতাগুলোর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি পাতা খাদ্য সংগ্রহে একবারই ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীতে এর কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে৷

 

তখন নতুন পাতার জন্ম হয় এবং সে পাতাগুলোও আগের পাতার মতো একই ভাবে পোকামাকড় ধরে।

পিচার প্ল্যান্ট বা কলসি উদ্ভিদ!

মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
“লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু” কথাটা খুব খেটে গেলো না?©dailybangladesh
নান্দনিক সৌন্দর্যের আরেক প্রতিচ্ছবি এই পিচার প্ল্যান্ট বা কলসি উদ্ভিদ। দেখতে ভীষণ নিরীহ হলেও উদ্ভিদটি আদতে পুরোটাই মাংসাশী। জগ কিংবা কলসির মতো পানি ধারণ করতে পারে এবং দেখতেও কিছুটা ঐরকম বলেই একে কলসি উদ্ভিদ নামে ডাকা হয়। কেউ বা আকৃতির কারণে একে জগও বলে থাকেন।
মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
কী মিললো তো জগের মতো? ©wikipedia
তবে এদের আকৃতির কারণে সুবিধা এই যে, জগ কিংবা কলসি গুলো ব্যবহৃত হয় ফাঁদ হিসেবে, শিকারের কাজে। ছোটো দেখতে কলসি গাছগুলো কীট-পতঙ্গ ধরে আর বড়ো দেখতে কলসি গাছগুলো ছোটো ব্যাং, ইঁদুর শিকার করে। শিকার বলতে লাফিয়ে পড়ে থাবা দেওয়া নয় বরং এই গাছগুলো থেকে বের হওয়া এক ধরণের মিষ্টি গন্ধের কারণে পোকামাকড় থেকে শুরু করে ইঁদুর, ব্যাং আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে আর আঁটকে যায় এর আঠালো এক ধরণের রসে।

 

কলসির সঙ্গে আঁটকে থাকে এক পাতা যা মূলত কাজ করে নলের। নলটির তলদেশ পেয়ালাকৃতির হলেও মাথায় থাকে মনোহরণকারী এক প্রবেশপথ। আর কলসির মাথায় সব সময় খুলে থাকে এক ঢাকনা। প্রবেশপথে আবার উৎপন্ন হয় মধু। আর কলসির ভেতর থাকে মধুর ভাণ্ডার। মূলত মধুর ঘ্রাণ আর লোভেই পোকারা নলের ভেতরে ঢুকে আর ভেতরের দেওয়াল এতটাই মসৃণ আর পিচ্ছিল যে উঠতে গেলেই পিছলিয়ে পড়ে যেতে হয়। অতঃপর অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু!

 

বিষয়টা অনেকটাই রূপকথার গল্পের সেই মৃত্যুপুরীর দরজার মতো যার বাইরের রূপটা মায়া লাগানো ঠিকই কিন্তু ভেতরে গেলেই…

ওয়াটার হুইল!

মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
মুগ্ধতা জন্মালো একটু? দারুণ নয়? ©sarracenia.com
দারুণ দেখতে উদ্ভিদটির দেখা পেতে আপনাকে একটু কষ্ট করে ঘুরে আসতে হবে ইউরোপ, ভারত, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানে। শিকড়হীন অথচ ছোটো দেখতে এ উদ্ভিদটি আদতে জলজ। পুকুর কিংবা জলাশয়ের উপর অনায়াসে একে ভাসতে দেখবেন।

 

আর এর পাতাগুলোর সৌন্দর্য আপনাকে ঘায়েল করবে মুহূর্তেই।  তবে সাবধান, আদতে এরা মাংসাশী উদ্ভিদ নামে পরিচিত। তাই ছুঁয়ে দেওয়ার আগে একটু ভেবে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বৈকি!
মাংসাশী-উদ্ভিদ-পুষ্টি
শিকার করার ধরণ দেখেছেন পাঠক? ©pinterest
ওয়াটার হুইল নামক জলজ এ উদ্ভিদটির পাতাগুলো পানির নিচে ভেনাস ফ্লাইট্র‍্যাপের মতো কাজ করলেও এর মূল কাজ আসলে ফাঁদ হিসেবে থাকা। ফাঁদে কোন পোকা আঁটকে গেলেই পাতার খণ্ডদ্বয় সেকেন্ডের হিসাবেও কম সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়ে পোকাটিকে আঁটকে দেয়।

 

পোকাটি পরিপাক হলেই পাতাগুলো আবার শিকার ধরার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। উদ্ভিদটির আকার ভীষণ ছোটো আর তাই এদের শিকারগুলোও বেশ ছোটো। বেশিরভাগই প্লাঙ্কটন,  ছোটো ছোটো জলজ প্রাণি, প্রাণিদের লার্ভাই এদের শিকারের তালিকায় থাকে।

ঝাঁঝিদাম!

গ্রামে গঞ্জে  অনেকে শিশুরা এ ফুল দিয়ে খেলে! ©wikipedia

 

এবারের যে মাংসাশী উদ্ভিদটিকে নিয়ে হাজির হয়েছি, আদতে এটি বাংলাদেশি। বাংলাদেশেও মাংসাশী উদ্ভিদ আছে এটা ভাবতে কি একটু অবাক লাগছে?

 

অবাক হলেও সত্যি যে নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন খালবিলে অবাধ জন্ম নেয় এই উদ্ভিদটি। বর্ষার শেষের দিকে যখন পানি কমতে থাকে তখন দে আনাগোনা বেড়ে যায়

 

আরো পড়ুন : মাংসাশী উদ্ভিদ থেকে সাবধান!

 

শিকড়হীন উদ্ভিদগুলো মূলত জলজ এবং এরা পানিতে ভেসে বেড়ায়। মাঝারি আকারের দেখতে এবং এরা বেঁচে থাকে অনেক বছর ধরে। কোন শিকড় নেই সত্যি তবে শিকড়ের বদলে এক ধরণের লে এদের দেহে থাকে। থলের প্রবেশপথেই খাড়া রোম থাকে এবং কো জলজ প্রাণির সংস্পর্শে এই মুখগুলো আপনাআপনি খুলে যায় এবং প্রাণিটিকে থলের ভেতর টেনে নিয়ে যায়।

 

 

তবে সবচেয়ে অবাক লাগা ব্যাপার হলো, এই মাংসাশী উদ্ভিদটিতে অসম্ভব সুন্দর দেখতে হালকা সুবাস যুক্ত এক ধরণের ফুল হয়। ফুলগুলো দেতে গাঢ় কমলাহলুদাভ


This Bangla article is about some carnivorous plant on earth.
Reference:
আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...