ভ্যাক্সিন: ২৫০ বছরের ঘটনাবহুল এক ইতিহাস

কীভাবে আসলো ভ্যাক্সিনের ধারণা? কতটা ভয়ংকর ছিল ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দিনগুলো?

ভ্যাক্সিন: ২৫০ বছরের ঘটনাবহুল এক ইতিহাস

 

পৃথিবীতে বর্তমানে নানা রোগের প্রতিরোধক হিসেবে দুই ডজনের বেশি রোগের ভ্যাক্সিন চালু রয়েছে। কিন্তু টিকার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি রোগ স্মল পক্স ও গবাদিপশুর বিশেষ রোগ রাইন্ডারপেস্ট’কে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। কীভাবে আসলো ভ্যাক্সিনের ধারণা? কতটা ভয়ংকর ছিল ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দিনগুলো? 

 

মহামারি। এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। শত শত বছর ধরে মহামারির নানান ধরণে কোটি কোটি মানুষ নির্মমভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়েছে। মহামারিকে সামাল দিতে চেষ্টার সবটুকু দিয়ে গবেষকদের রীতিমত যুদ্ধই করতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাকুল্যে দুটি রোগকে নির্মূল করা গেছে পৃথিবী থেকে। বিভিন্ন সময়ের মহামারি সামাল দিতে আবিষ্কার করা টিকার ইতিহাস মাত্র আড়াইশ বছরের। সেই টিকা নিয়েও আছে নানা চাল, নানা রাজনীতি। 

 

ভ্যাক্সিন
ভ্যাক্সিন

 

টিকা বা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের শুরুর অধ্যায়টা ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। বৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা অনুন্নত থাকার দিনগুলোয় মানুষ রোগকে ভয় পেয়ে এক প্রকার অসহায় জীবন যাপন করতো। সে সময় মহামারি নিয়ে মানুষের মনে নানা কুসংস্কার আর বিশ্বাস কাজ করত। অনেক অঞ্চলে রোগের জন্য দায়ী করা হতো নারীদের। মনে করা হতো নারীরা অপয়া। খারাপ আত্মা তাদের উপর ভর করে মড়ক ছড়িয়ে দেয়। এ বিশ্বাসের কারণে বহু নারীকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। কোথাও কোথাও বিশ্বাস করা হতো মহামারি দেব-দেবীদের অসন্তোষের ফল। তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য মড়ক চলাবস্থায়ও তাই দেব-দেবীদের পূজা-অর্চনা করতো মানুষ।

 

খ্রিস্টপূর্ব ৪২৯ অব্দে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডেস লক্ষ্য করেন, এথেন্স শহরে যেসব রোগী স্মলপক্স আক্রান্ত হবার পর বেঁচে যাচ্ছে তাদের পুনরায় আর এই রোগটি হচ্ছে না। পরবর্তীতে ১০ম শতাব্দীর শুরুতে চীনারা সর্বপ্রথম ভ্যাক্সিনেশন এর আদিরূপ ভ্যারিওলেশন আবিষ্কার করে। এই প্রক্রিয়ায় স্মলপক্স রোগে আক্রান্তদের দেহের পাঁচড়া হতে টিস্যু নিয়ে সুস্থ মানুষদেরকে এর সংস্পর্শে আনা হত। 

 

১৭৯৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার আধুনিক ভ্যাক্সিনেশন আবিষ্কার করেন, এজন্যে তাঁকে “ফাদার অব ইম্যুনিলোজি” বলা হয়।  

 

গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে জেনার দেখতে পেলেন, খামারিরা গো-বসন্তে আক্রান্ত হলে তাদের সামান্য ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তিনি দেখেন, এতে করে খামারি ও গোয়ালিনীরা আর মারণব্যধি স্মলপক্সে আক্রান্ত হচ্ছে না।

 

 ১৭৯৬ সালে তিনি এক তরুণ গোয়ালিনীর হাত হতে পুঁজ নিয়ে ৮ বছর বয়সী এক ছেলের বাহুতে আঁচড়ে দেন এবং ৬ সপ্তাহ পর ছেলেটির শরীরে স্মলপক্স জীবাণু প্রবেশ করান। সৌভাগ্যবশত বাচ্চাটির স্মলপক্স হয় নি।

 

জেনার আরো গবেষণা করতে থাকেন এবং বছর দুয়েক পর তিনি ঘোষণা করেন যে স্মলপক্স ভ্যাক্সিন বাচ্চা-ছেলে-বুড়ো সবার জন্য নিরাপদ। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে লুই পাস্তুর জলাতঙ্কের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন এবং ভ্যাক্সিন জগতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন।  

 

আচ্ছা, আপনারা কি ওয়াল্ডেমার হফকিনকে চেনেন? লুই পাস্তুরের গবেষণাগারে কাজের আগ্রহ নিয়ে তরুণ বয়সে এই বিজ্ঞানী ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে পাস্তুরের গবেষণাগারে কাজের সুযোগ পেলে কলেরার টিকা উদ্ভাবনের জন্য পূর্ণ মনোযোগ দেন। খরগোশের উপর কলেরার টিকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগ্রহ জাগানিয়া ফলাফল পেয়েছিলেন হফকিন। 

 

১৮৯২ সালে তিনি সাহস করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথমবার নিজের উপর কলেরার টিকার পরীক্ষা চালালেন। সামান্য পার্শ্বতিক্রিয়া ছাড়া বিস্ময়কর সাফল্যের দেখা পেলেন হফকিন। এবার একদল স্বেচ্ছাসেবকের দেহে পরীক্ষা চালালেন। কিন্তু টিকার কার্যকারিতার উপর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল আরো ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার। 

 

পরের বছরই তিনি পা রাখলেন কলকাতায়। এখানকার দারিদ্র্য আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কলেরার জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছিল। অসচেতনতা তো ছিলই। হফকিন তার সহকর্মীদের নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। হফকিনের টিকা উতরে গেল। কলেরা নিয়ন্ত্রণে আনার দুঃসাধ্য কাজটি সাধন হলো অবশেষে।  

 

১৮৯৬ সালে বুবোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে বোম্বে শহরে। আবার ডাক পড়ে হফকিনের। ৩৬ বছর বয়সের তরুণ এই বিজ্ঞানী সে সময় গ্র্যান্ট মেডিকেল কলেজের করিডোরে একটি অস্থায়ী ল্যাব বা গবেষণাগারে টিকা উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। লাগাতার তিন মাস অবিচল পরিশ্রমের পর মানবদেহে পরীক্ষা করার মতো টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়। 

 

সীমাহীন পরিশ্রমের কারণে তার তিন সহকর্মীর দুইজন ইতোমধ্যে টিকতে না পেরে মাঝপথে সটকে পড়েন। আরেকজনের শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। এবারও মানবদেহে টিকার উপযোগিতা পরীক্ষা করার জন্য নিজেকেই বেছে নিতে হয় তার। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জ্বর ও ব্যথায় কাহিল হয়ে পড়লেও হফকিনের পরীক্ষার ফলাফল আসে দুর্দান্ত। বোম্বের কয়েদিদের মাঝে এর প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে কলেরা ও প্লেগের টিকার আবিষ্কারক হিসেবে হফকিনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। 

 

সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা যখন বিভিন্ন রোগের কার্যকারণ আবিষ্কার করতে থাকেন তখন ভ্যাক্সিন তৈরীর পথও সুগম হয়ে যায়। জার্মান বিজ্ঞানী এমিল ভন বেহরিং ডিপথেরিয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরাম থেরাপি আবিষ্কারের জন্য ১৯০১ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। জাপানী চিকিৎসক শিবাসাবুরো কিতাসাতো ডিপথেরিয়া এবং ধনুষ্টংকারের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন।

 

১৯২০ সালের শেষদিকে ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার এবং যক্ষার ভ্যাক্সিন সহজলভ্য হয়ে যায়। পুরো পৃথিবীজুড়ে ভ্যাক্সিনেশন বা টিকাদান কর্মসূচী ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম পোলিও ভ্যক্সিনেশন কর্মসূচী জাদুকরী ফল দেয়। 

 

পরের বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্মলপক্স নির্মূলের জন্য বিশ্বব্যাপী ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচীর উদ্যোগ নেয়। যে স্মলপক্সে আক্রান্ত হয়ে আঠারো শতকে প্রতি বছর গড়ে শুধু ইউরোপ জুড়েই চার লাখ লোক মারা যেত, সেই ভয়ঙ্কর মহামারিটি নির্মূল হয়েছে বলে ১৯৮০ সালে ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা।

 

জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী হ্যারল্ড জার হাউজেন ১৯৭৬ সালে দেখেন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস নারীদের জরায়ুতে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। তার গবেষণার ফলে একটি ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন সম্ভব হয় যা ২০০৬ সালে বাজারে আসে। এই ভ্যাক্সিন লাখ লাখ নারীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে।

 

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান শহর থেকে ‘কোভিড-১৯’ বা ‘করোনা’ নামে যে মহামারিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে গেছে তাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে দেশে দেশে। জীবাণুর কাছে মানুষের জীবন-জীবিকা যখন হেরে যাচ্ছে তখনই বিশ্বের নানা প্রান্তের গবেষকরা দিনরাত এক করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করতে।  

 

আরো পড়ুন : করোনার উৎপত্তি: বাদুড়ের দায় কতটা?

 

করোনা প্রতিরোধের কার্যকর ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের পথ ধরে আবারো পৃথিবী সুস্থ হয়ে ওঠবে। মানুষ শ্বাস নেবে মুক্ত বাতাসে, এমনটাই প্রত্যাশা। 


Sources:

1. ksat

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...