ভরতনাট্যম: এক অনবদ্য নৃত্যের আদ্যোপান্ত

ভরতনাট্যম প্রধানত আটটি পর্যায়ে বিভক্ত: আলারিপ্পু, যতিস্বরম, শব্দম, বর্ণম, পদম, তিল্লানা, শ্লোকম এবং অভিনয়ম

ভরতনাট্যম: এক অনবদ্য নৃত্যের আদ্যোপান্ত

সাধারণত শারীরিক নড়াচড়ার প্রকাশভঙ্গীকে নৃত্য বা নাচ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে থাকে । এ প্রকাশভঙ্গী সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা মনোরঞ্জন ক্ষেত্রে দেখা যায়। ছন্দে ছন্দে অঙ্গভঙ্গির দ্বারা মঞ্চে চিত্রকল্প উপস্থাপনাকেই নৃত্য বা নাচ বলা হয়। নৃত্যকলার ইতিহাসে ভারতীয় নৃত্যকলা হচ্ছে প্রাচীন নৃত্যকলার অন্যতম।

নাচ ভারতে একটি প্রাচীন এবং উদযাপিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নাচ এবং গান ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলিতে বেশি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ভারতীয় নৃত্য কোথা থেকে শুরু? এর শিকড় কোথায়? ? ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রধান চারটি ধারার একটি হলো ‘ভরতনাট্যম’।

পূর্বে ভরতনাট্যম ‘কে সাদীরা আত্মম’ নামে আখ্যায়িত করা হতো। তখন এটি ছিল ভারতের তামিলনাড়ুর আদিবাসীদের বিখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্য। ভরতনাট্যম, সংগীত প্রকাশ এবং তালের সংমিশ্রণে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের মধ্যে প্রাচীনতম এবং বিশুদ্ধতম। ভরতনাট্য ভাব, রাগ ও তালের অপূৰ্ব সমন্বয় ঘটিছে। অনেকের মতে এই তিনটা শব্দের প্ৰথম বৰ্ণকে নিয়ে ভরতনাট্যম শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। এটি এমন নাচ যা নাটকের সমস্ত উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং দর্শকদের আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত করে।

©Swastika
পরিচিতি :
ভরতনাট্যম ভরতমুনির নামানুসারে প্রচলিত নৃত্য। ভাব, রস ও তালের সংমিশ্রণ দিয়ে এটি উপস্থাপন করা হয় । ভরতনাট্যম ভারতীয় নৃত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে সবচেয়ে লালিত্যযুক্ত ও লাবণ্যমন্ডিত নৃত্যধারা হিসেবে । এ নৃত্যে শিল্পীর নানা অভিব্যক্তি বিভিন্ন মুদ্রায় বিভিন্ন অর্থ বহন করে। লজ্জা ও উপেক্ষা, ভ্রূ-বিক্ষেপে ভয়, রাগ, কষ্ট, সন্দেহ ইত্যাদি মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি গুলো বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাড়াচাড়ার মাধ্যমে মনের সূক্ষ্ম অনুভূতি এতে প্রকাশ পায়। এক কথায় বলা যায় যে, ভরতনাট্যম অনেক গুলো শিল্পর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে তৈরি একটি নাচ । শুধু তাই নয়, এ নৃত্য শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক হলো এটি অনুষঙ্গ বা অন্তর্নিহিত ভাব ও আবেগকে দেয় বাহ্যিক রূপ যা অঙ্গ সঞ্চালন এর মাধ্যমে প্রতীকী রূপ পায়। । তাই গাম্ভীর্য ও মানব মনের বাস্তবতা ভরতনাট্যমকে বিকশিত করেছে। এতে সব কিছুই পরিমিত। এ নৃত্য ছন্দোময় কৌশল এবং আবেগপূর্ণ অনুভূতিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।
পর্যায় ও ধরণ : 
ভরতনাট্যম প্রধানত আটটি পর্যায়ে বিভক্ত: আলারিপ্পু, যতিস্বরম, শব্দম, বর্ণম, পদম, তিল্লানা, শ্লোকম এবং অভিনয়ম।
আল্লারিম্পু শব্দের অর্থ হলো প্রস্ফুটিত হওয়া বা ফুটে উঠা । ভরতনাট্যমের প্রথম এই ধাপ এটি। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশুদ্ধ নৃত্যের উপযোগী করে দেহভঙ্গিকে সঠিক সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই অংশে শিল্পী মাথার উপরে নমস্কারের ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে, ছন্দের সাথে দৃষ্টি ও গ্রীবার কাজ করেন। ধারণা করা হয় এর মাধ্যমে শিল্পী দেবতা, দর্শক ও সঙ্গীত শিল্পীদের কাছ হতে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
পরের পর্যায়টি হল যতিস্বরম। এই অংশ টি দ্বিতীয় স্থানে উপস্থাপন করা হয়। একে বলা হয় শোভাবর্ধক নৃত্য। এই অংশে পাঁচ থেকে সাতটি জটিল রাগাশ্রয়ী তালের সাথে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। তাল রক্ষা করা এই পর্যায়ের প্রধান অংশ। এই অংশে দৃষ্টি, গ্রীবা, হাত ও পায়ের সঞ্চালন প্রাধান্য পায়। কোনো বিশেষ ভাবকে এই অংশে প্রকাশ করা হয় না। এই অংশটিকে সুচারূপে সংযমের সাথে উপস্থাপন করা হয়।
পরের অংশটি শব্দম নামে পরিচিত । এই অংশে ভক্তিমূলক সঙ্গীতের ভক্তিরসকে নৃত্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় । সাধারণত এই অংশে ভক্তি প্রকাশ এর জন্য তেলেগু ভাষার ব্যবহার মুখ্য। এই অংশের ভক্তি সরাসরি যায় দেবতাকে। আগে এই অংশে রাজার মহত্ব বর্ণনা করা হতো। এই কারণে এই ভক্তিগীতিকে অনেক সময় যশোগীতি বলা হয়।
©Pinterest
বর্ণম, শব্দম এর পরে এই অংশ উপস্থাপন করা হয়। ‘বর্ণম’ কথাটির অর্থ রঞ্জিতকরণ বা রাঙিয়ে তুলা। এই অংশে নৃত্যের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের হৃদয়কে রাঙিয়ে তুলতে হয়। গীত, বাদ্য ও নৃত্য অভিনয়ের সমন্বয়ে এই অংশ বেশ জটিলভাবে উপস্থাপন করা হয়। বেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই অংশ উপস্থাপিত হয়। এই অংশটি জটিল এবং তা দ্রুত শেষ করা হয়। বর্ণমের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ হল এই পর্যায়ের মুখাভিনয়, মুদ্রাবিন্যাস ও দ্রুত পায়ের কাজ করা হয়।
পদম, বর্ণম-এর পরে এই অংশ উপস্থাপন করা হয়। পদম মূলত অভিনয়-প্রধান অংশ। এতে দেবদেবীর কাহিনীর বর্ণনা করা হয়েছে এমন গান গুলো নৃত্যের ছন্দে ছন্দে অভিনয় দ্বারা প্রদর্শন করা হয়।
তিলস্নানা: পদম-এর পরে এই অংশ উপস্থাপন করা হয়। ভরতনাট্যমের সর্বশেষ উপস্থাপনা এটি। এই অংশে দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতিতে তারানার সাথে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এই অংশে যতির অংশগুলো বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুতলয়ে পরিবেশন করা হয়। শিল্পী তাঁর নৃত্যকুশলতার পরিচয় এই অংশে তুলে ধরেন। এই অংশে নানা ধরনের মুদ্রা, পায়ের নৃত্য, শির, দৃষ্টি, নাস, ভ্রু এর সমন্বয়ে জটিল বিষয় গুলোকে উপস্থাপন করেন।
আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক ও আহার্য এই চার প্রকার অভিনয় ভরতনাট্যমের অন্যতম প্রধান অংশ। দুটি ধর্ম রয়েছে :লোকধর্মী ও নাট্যধর্মী। দুই প্রকার সিদ্ধি: দৈবি ও মানুষী। তিন প্রকার অঙ্গ ভেদ: করণ, অঙ্গাহার ও মুদ্রা ।
শুধু নৃত্যেই নয়, ভরতনাট্যমের জন্য অবশ্যক একজন সুকণ্ঠী শিল্পীর ভূমিকা। এটি নৃত্যের অন্যতম প্রধান অঙ্গ।
©YehaIndia
ভারতনাট্যম এর আসল উৎপত্তি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে। এর উৎসটি নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়, যা পৌরাণিক পুরোহিত ভরত দ্বারা রচিত থিয়েটারের একটি প্রাচীন গ্রন্থ। মূলত মহিলাদের জন্য এটি মন্দিরে প্রদর্শিত করা হয় এমন নৃত্য হিসেবে বিবেচিত । ভারতনাট্যম প্রায়শই হিন্দু ধর্মীয় গল্প গুলো বর্ণনাকরণ এবং ভক্তি প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এটি সর্বজনীন মঞ্চে কখনো দেখা যায়নি।
ভরতনাট্যমকে সমৃদ্ধ করার জন্য যারা অনেকেই আত্মনিবেদিত ছিলেন। তাদের মধ্যে- শ্রীকৃষ্ণ আয়ার ও শ্রীমতি রুক্সিণী দেবী আরুন্দেল-এর নাম উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ভারতে যখন নাচের বিরোধীতা চলমান তখন শ্রীকৃষ্ণ আয়ার ভরতনাট্যম নৃত্যকলার জন্য আন্দোলন শুরু । শ্রীমতি রুক্সিণী দেবীও তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতা আর বিধি নিষেধ তুচ্ছ করে নৃত্যকলাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আত্মনিয়োগ করেন। এরা চিরকালই নৃত্যের মঞ্চে অমর হয়ে থাকবেন।
ভরতনাট্যম শুধুমাত্র একটি নৃত্যধারাই নয় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় নৃত্যের পদ্ধতি । উপমহাদেশের নৃত্যকলার অন্যান্য ধারার মতো ভরতনাট্যমের মূল ভাবধারা দেবতাকেন্দ্রিক ও ধর্মীয় জ্ঞান ভিত্তিক । নৃত্যের মাধ্যমে বিষয় ভিত্তিক যেকোনো কিছুকে দর্শকের সামনে মঞ্চে সর্বাঙ্গে উপস্থাপন করায় এর তুলনা নেই। পৌরাণিক গল্প, সাহিত্য, চিত্র, সঙ্গীতের সমন্বয়ে ভরতনাট্যম পূর্ণ চেতনায় সমৃদ্ধ। নৃত্যের সমগ্র চেতনা এই একটিতেই সর্ব ভাবে বিকশিত হয়েছে, যা অন্যান্য নৃত্যে অনুপস্থিত। অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যের ধারাগুলোতে এই সম্পূর্ণতা নেই বললেই চলে। সেজন্য ভরতনাট্যম অন্যসব নৃত্যধারা অপেক্ষা প্রাণময় ও প্রগতিশীল, সর্বময়। গাম্ভীর্য, মাধুর্যের সমন্বয়ে এবং সংস্কৃতির প্রবাহমান অভিযাত্রায় নিজস্ব মৌলিকতা বজায় রেখে ভরতনাট্যম তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে।
যদিও বিভিন্ন সময়ে নৃত্যকে বিভিন্ন রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, আজকের বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ, গণ্মাধ্যম এবং নৃত্যশিল্প একই সাথে চলে। স্যাটেলাইট মিডিয়ার এই যুগে সামাজিক এবং ওয়েস্টার্ন ধাঁচের নৃত্য তৃতীয় বিশ্বের দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এত কিছুর পরেও ভরতনট্যমের মত নাচ তার স্ব-গৌরবে এখনও জ্বলছে এটাও অনেক।

This is Bengali article about Bharaat Nattyom.  
Reference: 
আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...