ব্ল্যাক ডালিয়ার করুণ পরিণতি (ভিডিও)

তারা খুঁজে পায় একটা নগ্ন নারীদেহ, শহরতলীর ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ঘাসের উপর শুয়ে আছে। শরীরটা ঠিক মাঝ বরাবর কেটে আলাদা করা।

ব্ল্যাক ডালিয়ার করুণ পরিণতি

১৯৪৭ সাল। জানুয়ারির ১৫ তারিখ সকালে লস এঞ্জেলেসে 911 এ একটা ফোন এলো। ফোন দিয়েছেন একজন মহিলা। তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা একটা মৃতদেহ রিপোর্ট করতে চান। ফোন পাওয়ার পরপরই পুলিশ যথাস্থানে চলে যায়। সেখানে পৌঁছে যে দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয় তাদের, সেই দৃশ্যে স্তম্ভিত হয়ে যেতে বাধ্য হয় সবাই। তারা খুঁজে পায় একটা নগ্ন নারীদেহ, শহরতলীর ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ঘাসের উপর শুয়ে আছে। শরীরটা ঠিক মাঝ বরাবর কেটে আলাদা করা। তার ডান স্তনও কেটে ফেলা হয়েছে,  কপালে বেশ কয়েকটা গভীর কাটা দাগ, সারা শরীর জুড়ে অসংখ্য কাটাছেঁড়া। এছাড়াও তার মুখের দুই পাশ থেকে কান পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে কাটা হয়েছিল, জোকারের হাসি যেমনটা হয় তেমন। পুলিশ গলায় দাগ দেখে নিশ্চিত হল তাকে শ্বাসরোধ করা হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে রক্তের ছিটেফোঁটাও ছিল না। অর্থ্যাৎ হত্যা করার পর তাকে এখানে এনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মেয়েটার শরীর থেকেও সব রক্ত বের করে নেওয়া হয়েছে তাই তার পুরো শরীর ছিল অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে। তখনো তার নাম- পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায় নি, তাই মিডিয়া তাকে ডাকা শুরু করল ব্ল্যাক ডালিয়া নামে। 

ভয়াবহ হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া এই হতভাগা মেয়েটির আসল নাম এলিজাবেথ শর্ট। জন্ম ১৯২৪ সালের জুলাই মাসে। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে। তার বাবা ক্লিও শর্ট এবং মা ফিবি শর্ট। ছোটবেলা সম্পর্কে খুব বেশি জানা না গেলেও একটা পর্যায়ে তার মা বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তার বাবা ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসে। এলিজাবেথ তার মায়ের সাথে ম্যাসাচুসেটসে থেকে যায়। 

ব্ল্যাক-ডালিয়ার-করুণ-পরি/
তরুণী এলিজাবেথ রূপে- গুণে অনন্যা ছিল। Image source: Inside Edition

তরুণী এলিজাবেথ রূপে- গুণে অনন্যা ছিল। চমৎকার দেহপল্লব, ঘন কালো চুল, উজ্জ্বল সবুজ চোখ আর চুলে গুঁজে রাখা ফুল- যে কারো নজর কাড়তে বাধ্য। শোনা যায়, কৈশোরে সে বেশ উচ্ছল স্বভাবের ছিল। তার কাছে মনে হত ম্যাসাচুসেটসে থাকা তার ঠিক পোষাচ্ছে না। তার আরো বড় কিছু করা উচিত, আরো ভালো কিছু করা উচিত। এই ছোট শহরটায় যেটা সম্ভব না। সেই সময় তার বাবা তাকে জানায় এলিজাবেথ চাইলে তার সাথে গিয়ে থাকতে পারে। রান্না বান্না আর ঘর পরিষ্কারের কাজ করে দিলে তাকে ভাড়াও দিতে হবে না। 

এলিজাবেথ এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। ক্লিও তাকে যাতায়াত আর আনুষাঙ্গিক খরচ বাবদ ৮০০ ডলার পাঠিয়ে দেয়। এলিজাবেথ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা ছোট শহরে তার বাবার সাথে বসবাস করা শুরু করে। তবে বেশিদিন সেখানে অবস্থান করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ রাতেই এলিজাবেথ বাড়ি ফিরত না, এছাড়াও বাবার সাথে তার যেসব কাজ করে দেওয়ার চুক্তি ছিল সেসবেও খুব একটা আগ্রহ দেখা গেল না। তাই তার বাবাই একটা পর্যায়ে তাকে বললেন তার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে। এলিজাবেথ তাই করল। নিজের যা জিনিসপত্র ছিল নিয়ে বের হয়ে গেল। কিন্তু ম্যাসাচুসেটসে ফিরে যাওয়ার মোটেও কোন ইচ্ছা ছিল না তার। তাই সে কাজের সন্ধান করতে থাকে। একসময় একটা দোকানে কাজ পেয়েও যায়। সেই দোকানে ৯ মাস কাজ করার পর সে সিদ্ধান্ত নেয় সান ডিয়াগোতে চলে যাওয়ার। 

সান ডিয়াগোতে তার ডরথি নামে অন্য এক তরুণীর সাথে পরিচয় ঘটে। তাদের মধ্যে খাতির জমে উঠতে সময় লাগে না। আলাপের এক পর্যায়ে এলিজাবেথ ডরথিকে জানায় তার এই মুহূর্তে থাকার কোন জায়গা নেই। তাই ডরথি তাকে প্রস্তাব দেয় তার সাথে এসে থাকার। তারা একসাথে থাকা শুরু করে। 

মাসখানেক ডরোথির সাথে থাকার পর এলিজাবেথ ডরথিকে জানায় সে চলে যাচ্ছে। নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে। সেদিন “রেড” নামের কেউ একজন তাকে নিতে আসবে। এলিজাবেথ ডরথিকে বিদায় জানায় এবং তাকে নিতে আসা গাড়িতে চড়ে বসে। এটাই ছিল ডরোথির সাথে এলিজাবেথের শেষ দেখা। তার কিছুদিন পরেই এলিজাবেথের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয় শহরতলীর রাস্তায়। 

এলিজাবেথের মৃতদেহ আবিষ্কারের পরে পুলিশ মোটামুটি গোলকধাঁধায় আটকে যায়। কারণ তাদের হাতে না ছিল কোন তথ্য- প্রমাণ, না ছিল কোন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল যে মহিলা সেদিন 911 এ ফোন দিয়েছিল তার সাথে যোগাযোগ করার। নতুন কোন তথ্য পাবার আশায়। সেই ভদ্রমহিলাকে খুঁজে বের করতে পুলিশের এক সপ্তাহ লেগে যায়। ভদ্রমহিলা তাদের জানান তিনি প্রতিদিনের মতই তার মেয়েকে সাথে নিয়ে সকালবেলা রাস্তায় হাঁটতে বের হয়ে জুতার দোকানে যাচ্ছিলেন। তখন তার চোখে পড়ে ঘাসের উপর শুয়ে থাকা একটা শরীর। ফ্যাকাসে শরীরটা দেখে তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন এটা হয়ত কোন ফেলে দেওয়া ম্যানিকুইন। তবুও তিনি বেশ ভয় পেয়ে যান এবং কাছেই এক বাড়িতে গিয়ে তাদের ফোন থেকে 911 এ কল করেন। তিনি এরপর আর সেখানে ফেরত যান নি কারণ তিনি চান নি তার সাথে থাকা ছোট মেয়েটা এই ধরণের কোন দৃশ্যের মুখোমুখি হোক। ভদ্রমহিলার ইন্টারভিউ শেষে পুলিশ বেশ নিরাশ হল। কারণ তদন্তে কাজে লাগতে পারে এমন কিছুই তার ইন্টারভিউয়ে ছিল না। 

তবে পুলিশ এলিজাবেথের বাবাকে খুঁজে বের করতে সমর্থ্য হল। তার কাছে যাওয়ার পর সে জানালো এলিজাবেথ চলে যাওয়ার পর তার সাথে দেখা বা কথা কোনটাই হয় নি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে পুলিশ যখন তার বাড়িতে যায় তখন তিনি মাতাল এবং বেশ রেগে ছিলেন। এলিজাবেথের মৃত্যুতে তাকে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা গেল না। নিজের মেয়ের মৃত্যুকে তিনি বেশ সহজভাবেই নিলেন, বরং পুলিশের উপর কিছুটা বিরক্ত হলেন এত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তিনি থানায় গিয়ে মেয়েকে শনাক্ত করতেও অস্বীকৃতি জানালেন।

পুলিশ হতাশ হয় এবারও। শেষমেশ তারা খবর জানায় এলিজাবেথের মা কে। তিনি খবর পাওয়া মাত্র ম্যাসাচুসেটস থেকে সান ডিয়াগো চলে আসেন। এরপর পুলিশ খুঁজে বের করে ডরোথিকে, এলিজাবেথ যার সাথে মাসখানেক অবস্থান করেছিল। ডরোথির কাছেই তারা খোঁজ পায় যে লোকটার সাথে এলিজাবেথ (ব্ল্যাক ডালিয়ার) বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তার নাম আর তার গাড়ির বিবরণ। এর চেয়ে বেশি কিছু ডরোথি জানাতে পারে নি। তাই এতটুকু নিয়েই এগুতে থাকে তারা। তারা সান ডিয়াগো এলাকার সবগুলো মোটেল তল্লাশি করতে থাকে। একটা মোটেলের অতিথির তালিকায় তারা রবার্ট নামে একটা লোককে খুঁজে পায়, যার গাড়ির বিবরণ ডরোথির দেওয়া গাড়ির বিবরণের সাথে মিলে যায়। তারা এই রবার্ট নামের লোকটার একটা ছবি খুঁজে বের করে, সেটা ডরোথিকে দেখিয়ে নিশ্চিত হয় এই সেই লোক যাকে তারা খুঁজছে। এবং তারা আবিষ্কার করে এলিজাবেথের (ব্ল্যাক ডালিয়ার) মৃত্যুর ঠিক দুই দিন পর রবার্ট নামের লোকটা হ্যারি নামের একজনের সাথে শহরের বাইরে গিয়েছে। তাই তারা টানা দুই দিন রবার্টের বাড়িতে পাহারা বসায়। এক সময় রবার্ট আর হ্যারি ফিরে আসে। রবার্টকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। 

তবে রবার্টের গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তারা কিছুই খুঁজে পায় না। রবার্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও যখন কিছু পাওয়া যায় না তখন রবার্টের পলিগ্রাফ টেস্ট করা হয়। রবার্ট সেই পলিগ্রাফ টেস্টে বেশ ভালোমতই পার হয়ে যায়, তাই পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। 

এই পর্যায়ে এসে পুলিশ আবারও দিকহারা হয়ে পড়ে আর এলিজাবেথের মামলাটাও দিন দিন ঝিমিয়ে আসে। তবে তোলপাড় চলতে থাকে মিডিয়ায়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসতে থাকে অসংখ্য চিঠি, এমন কি অনেকে এই খুনের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি পর্যন্ত দেয়। কিন্তু তাদের মধ্য থেকেও আসল খুনির সন্ধান মেলে না। এভাবে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও এলিজাবেথের খুন এখন পর্যন্ত অমিমাংসিতই রয়ে গেছে। খুনির খোঁজ মেলে নি আজও। 

 

ব্ল্যাক ডালিয়ার করুণ পরিণতি হয় এভাবে।


আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...