মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে বিজয় দিবস (পর্ব–১)

বিশ্বের বহু রাষ্ট্রেরই নিজস্ব বিজয় দিবস রয়েছে, যেদিন তারা সেই রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কোনো যুদ্ধে অর্জিত বিজয়কে জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করে।

মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে বিজয় দিবস (পর্ব–১)

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ‘বিজয় দিবস’। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশি ও ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ‘যৌথ বাহিনী’র কাছে আত্মসমর্পণ করে, এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের দিনটিকে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, এবং বাংলাদেশে এই দিনটি মহাসমারোহে উদযাপিত হয়।

অনুরূপভাবে, বিশ্বের বহু রাষ্ট্রেরই নিজস্ব বিজয় দিবস রয়েছে, যেদিন তারা সেই রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কোনো যুদ্ধে অর্জিত বিজয়কে জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করে। চলুন, মুসলিম বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র বিজয় দিবস উদযাপন করে, তাদের সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

আজারবাইজান

পশ্চিম এশিয়ার অন্তর্গত দক্ষিণ ককেশাস/ট্রান্সককেশিয়া অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র আজারবাইজান। বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিজয় দিবসের দিক থেকে আজারবাইজান স্বতন্ত্র, কারণ রাষ্ট্রটির এখন দুইটি বিজয় দিবস রয়েছে! এর মধ্যে প্রথম বিজয় দিবসটি উদযাপিত হয় ৯ মে তারিখে, এবং এটি আজারবাইজানে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী বিজয় দিবস’ হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত আজারবাইজান রুশ সাম্রাজ্য/রুশ প্রজাতন্ত্র/সোভিয়েত রাশিয়ার অংশ ছিল, এবং ১৯২২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র। সোভিয়েত রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে আজারবাইজান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯–১৯৪৫) অংশগ্রহণ করে, এবং ১৯৪৫ সালের ৯ মে মিত্রশক্তির নিকট জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়।

বিজয়-দিবস-দেশে-দেশে
২০১৯ সালে বিজয় দিবসের দিনে আজারবাইজানি রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আজারবাইজানি সৈন্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন; চিত্রসূত্র: Azerbaijan Presidency/Anadolu Agency

১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ পরিচালনার পশ্চাতে জার্মানদের অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল আজারবাইজানের বিপুল তেলভাণ্ডার দখল করা। যুদ্ধ চলাকালে আজারবাইজানের প্রায় ৬ লক্ষ ৮১ হাজার অধিবাসী সোভিয়েত সশস্ত্রবাহিনীতে যোগদান করে, এবং এদের মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ সৈনিক এই যুদ্ধে নিহত হয়। যুদ্ধ চলাকালে জার্মান বিমান হামলা, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও অন্যান্য কারণে আজারবাইজানের প্রায় ৯০,০০০ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়। তদুপরি, আজারবাইজানি গেরিলারা যুগোস্লাভিয়া ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জার্মান দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামেও অংশগ্রহণ করে। মোট ৪৩ জন জাতিগত আজারবাইজানি সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘হিরো অফ দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ লাভ করে, এবং হাজার হাজার আজারবাইজানি সৈনিক বীরত্বের জন্য অন্যান্য বিভিন্ন সোভিয়েত পদক লাভ করে। সর্বোপরি, যুদ্ধ চলাকালে আজারবাইজান সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০% সরবরাহ করে। ১৯৪৫ সালের ৯ মে জার্মানির পরিপূর্ণ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

আরও পড়ুন : মুক্তিযুদ্ধ: ১১ নং সেক্টরের গল্প

সোভিয়েত শাসনামল থেকে আজারবাইজানে ৯ মে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৯১ সালে আজারবাইজানের স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির প্যান–তুর্কি জাতীয়তাবাদী ও রুশবিরোধী রাষ্ট্রপতি আবুলফাজ এলচিবে দিবসটির উদযাপন নিষিদ্ধ করেছিলেন। এসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আজারবাইজানি সৈন্যদের নানাভাবে হেনস্থা করা হয়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এলচিবে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন, এবং আজারবাইজানের নতুন রাষ্ট্রপতি হায়দার আলিয়েভ ৯ মে তারিখকে বিজয় দিবস হিসেবে পুনঃপ্রবর্তন করেন। তখন থেকে প্রতি বছর জাঁকজমকের সঙ্গে আজারবাইজান এই বিজয় দিবসটি উদযাপন করে আসছে।

আজারবাইজানের দ্বিতীয় বিজয় দিবসটি হচ্ছে ৮ নভেম্বর। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এই নতুন বিজয় দিবসটি প্রবর্তিত হয়েছে। ২০২০ সালের এই দিনে দ্বিতীয় নাগর্নো–কারাবাখ যুদ্ধ চলাকালে আজারবাইজানি সৈন্যরা আর্মেনীয়/আর্তসাখ সৈন্যদের পরাজিত করে শুশা শহর অধিকার করে নেয়, এবং এই বিজয় উপলক্ষে আজারবাইজানি সরকার ৮ নভেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বিজয়-দিবস-দেশে-দেশে
আজারবাইজানে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি সামরিক প্যারেড; চিত্রসূত্র: Defence.az

১৯৮৮–১৯৯৪ সালের প্রথম নাগর্নো–কারাবাখ যুদ্ধের সময় আর্মেনীয় সৈন্যরা আজারবাইজানের অন্তর্গত জাতিগত আর্মেনীয়–অধ্যুষিত নাগর্নো–কারাবাখ ও নিকটবর্তী ৭টি আজারবাইজানি জেলা দখল করে নেয়, এবং অধিকৃত ভূমিতে ‘আর্তসাখ’ নামক একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিবিহীন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তুরস্কের সক্রিয় সমর্থনে আজারবাইজান আর্তসাখের ওপর আক্রমণ চালায়, এবং ৮ নভেম্বর আজারবাইজানি সৈন্যরা তীব্র যুদ্ধের পর নাগর্নো–কারাবাখের অন্তর্গত কৌশলগত ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুশা শহর দখল করে নিলে আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ১০ নভেম্বর রাশিয়ার মধ্যস্থতায় আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, এবং আজারবাইজান প্রথম যুদ্ধে হারানো ভূমির অধিকাংশ ফিরে পায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আজারবাইজানি সরকার শুশা পুনর্দখলের দিনটিকে, অর্থাৎ ৮ নভেম্বরকে, বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে আজারবাইজান দ্বিতীয় নাগর্নো–কারাবাখ যুদ্ধের সমাপ্তির দিনটিকে, অর্থাৎ ১০ নভেম্বরকে, বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ১০ নভেম্বর তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুদিবস, এবং এইদিন তুরস্কে ‘স্মৃতি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এজন্য আতাতুর্কের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র আজারবাইজান তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, এবং ৮ নভেম্বরে বিজয় দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আগামী বছর থেকে ৯ মের পাশাপাশি ৮ নভেম্বরেও আজারবাইজানে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপিত হবে।

আফগানিস্তান

মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র আফগানিস্তান। আফগানিস্তানে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল ‘মুজাহিদিন বিজয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়। আফগান গৃহযুদ্ধ চলাকালে ১৯৯২ সালের এই দিনে আফগান মুজাহিদিন আফগান কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে, এবং এজন্য এই দিনটিকে বর্তমানে আফগানিস্তানে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।

১৯৭৮ সালে আফগান কমিউনিস্টরা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির শাসনক্ষমতা দখল করে নেয়, এবং আফগানিস্তান জুড়ে ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আফগানিস্তানের রক্ষণশীল জনসাধারণ কমিউনিস্টদের সংস্কার কর্মসূচির তীব্র বিরোধী ছিল, ফলে অচিরেই আফগানিস্তান জুড়ে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহীরা ‘মুজাহিদিন’ নামে পরিচিতি অর্জন করে, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান প্রভৃতি কমিউনিজম–বিরোধী রাষ্ট্র ও চীন এদেরকে সার্বিকভাবে সহায়তা করতে আরম্ভ করে। আফগান সরকার বিদ্রোহ মোকাবেলায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়, এবং ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগান সরকারের আমন্ত্রণে তাদের মিত্ররাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটিতে সৈন্য প্রেরণ করে।

বিজয়-দিবস-দেশে-দেশে
আফগানিস্তানে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি সামরিক প্যারেড; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

কিন্তু ৯ বছরব্যাপী প্রচণ্ড যুদ্ধের পরেও সোভিয়েতরা আফগান মিলিট্যান্টদের দমন করতে ব্যর্থ হয়, এবং ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সমস্ত সোভিয়েত সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করে। এরপরও দেশটিতে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত থাকে, এবং আফগান সরকার ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী রাশিয়া আফগান সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, এবং এর ফলে আফগান কমিউনিস্ট সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল আফগান রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহ একটি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন, এবং আফগান সরকারের মধ্যে ব্যাপক অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আফগান সরকারের একদা অনুগত উজবেক জেনারেল আব্দুল রাশিদ দোস্তামের নিয়ন্ত্রণাধীন উজবেক মিলিশিয়া ‘জানবিশ–ই–মিল্লি’ কাবুল বিমানবন্দর দখল করে নেয়।

এদিকে আফগান মিলিট্যান্টদের বিভিন্ন দলের মধ্যেও কাবুল দখল নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। গুলবুদ্দিন হেকমাতিয়ারের অধীনস্থ পশতুন মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘হেজব–এ–ইসলামি গুলবুদ্দিন’ কাবুলে প্রবেশ করে, কিন্তু পরবর্তীতে আহমাদ শাহ মাসুদের অধীনস্থ তাজিক মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘জামিয়াত–এ–ইসলামি’ দোস্তামের জানবিশ–ই–মিল্লির সঙ্গে যোগ দেয়। তারা সম্মিলিতভাবে হেজব–এ–ইসলামি গুলবুদ্দিনকে পরাজিত করে এবং ২৭ এপ্রিলের মধ্যে কাবুল দখল করে নেয়। কিন্তু হেজব–এ–ইসলামি গুলবুদ্দিন ও অন্যান্য মিলিট্যান্ট গ্রুপ মাসুদ ও দোস্তামের কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, এবং তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আরম্ভ করে।

১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল সিবগাতুল্লাহ মুজাদ্দিদির নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী সরকার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। অবশ্য তাতে আফগান গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে নি। কার্যত এখন পর্যন্ত এই গৃহযুদ্ধ চলমান, কেবল যুদ্ধের রূপ পাল্টেছে মাত্র। এই দিনটিকেই বর্তমানে আফগানিস্তানে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়।

ইরাক

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তেলসমৃদ্ধ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল রাষ্ট্র ইরাক। বর্তমানে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর দেশটি বিজয় দিবস উদযাপন করে। কারণ, ২০১৭ সালের এই দিনে ইরাকি সশস্ত্রবাহিনী আন্তর্জাতিক মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট’কে (সংক্ষেপে ‘আইএস’) পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার কতিপয় মিত্ররাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে এবং ইরাকের সংখ্যালঘু সুন্নিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বাথ পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি মার্কিনপন্থী শিয়া সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু এর ফলে ইরাকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও প্রবল ধর্মীয় সংঘাত আরম্ভ হয়, এবং ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকে। মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের দুই বছরের মধ্যেই ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানত ইরাকি সুন্নিদের সমন্বয়ে গঠিত মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘আইএস’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, এবং ইরাকি সরকারি বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে ইরাকের এক বিরাট অংশ (প্রায় ৫৬,০০০ বর্গ কি.মি.) দখল করে নেয়। একইসঙ্গে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র সিরিয়াতেও আইএস হস্তক্ষেপ করে এবং সেখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়। আইএস একটি ‘বৈশ্বিক খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়, এবং বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ পরিচালনা করতে আরম্ভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে মিলিট্যান্টরা এসে আইএসে যোগদান করতে থাকে।

বিজয়-দিবস-দেশে-দেশে
ইরাকে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি সামরিক প্যারেড; চিত্রসূত্র: Kurdistan24

আইএসকে দমন করার জন্য ২০১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইরাকে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, এবং ইরান ও রাশিয়াও ইরাকি সরকারকে সামরিক সহযোগিতা প্রদান করতে শুরু করে। তাদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে ইরাকি সরকার ও ইরাকের অন্তর্গত (কিন্তু কার্যত স্বাধীন) ‘কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার’ আইএসের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে দিতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধ চলাকালে ইরাকি সরকার ও ইরাকি কুর্দিস্তানের সরকারের মধ্যেও সংঘর্ষ হয়, এবং ইরাকি সৈন্যরা তেলসমৃদ্ধ কিরকুক শহরসহ ইরাকি কুর্দিদের নিয়ন্ত্রিত ভূমির প্রায় ২০% দখল করে নেয়। অবশেষে ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর ইরাকি সৈন্যরা আইএস কর্তৃক দখলকৃত ইরাকি ভূমির সর্বশেষ অংশ পুনর্দখল করে নিতে সক্ষম হয়, এবং এর মধ্য দিয়ে ইরাকি গৃহযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।

২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর ইরাকি সরকার আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন করে, এবং তখন থেকে প্রতি বছর দিনটি ইরাকের বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য, আইএস যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, কিন্তু এখনো নির্মূল হয় নি, এবং এখন পর্যন্ত তারা ইরাকি সরকারের বিরুদ্ধে ছোটখাটো আক্রমণ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে।

কাজাখস্তান

মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত কাজাখস্তান আয়তনের দিক থেকে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রটিতে প্রতি বছর ৯ মে তারিখে বিজয় দিবস উদযাপিত হয়। কারণ, ১৯৪৫ সালের এই দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বর্তমান কাজাখস্তানের ভূমি রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৩৬ সালে কাজাখস্তান সোভিয়েত রাষ্ট্রের একটি ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চলাকালে ১৯৪১ সালে জার্মানি ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের মতো কাজাখস্তানও এই ‘দেশপ্রেমিক মহাযুদ্ধে’ (Great Patriotic War) অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ চলাকালে অক্ষবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলের এক বিরাট অংশ দখল করে নেয়, এবং দখলকৃত অঞ্চল থেকে প্রচুর সংখ্যক সোভিয়েত শরণার্থী কাজাখস্তানে আশ্রয় নেয়। এই অঞ্চল থেকে প্রচুর শিল্পকারখানাও কাজাখস্তানের ভূমিতে স্থানান্তর করা হয়, কারণ দূরবর্তী কাজাখস্তান ছিল জার্মান বিমান হামলার আওতার বাইরে। এছাড়া, যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্রোহীভাবাপন্ন কিছু জাতিকে (যেমন: ভোলগা জার্মান, ক্রিমিয়ান তাতার, চেচেন, ইঙ্গুশ ও অন্যান্য) কাজাখস্তানে নির্বাসিত করে।

বিজয়-দিবস-দেশে-দেশে
কাজাখস্তানে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি সামরিক প্যারেড; চিত্রসূত্র: Vestnik Kavkaza

সর্বোপরি, যুদ্ধের সময় কাজাখস্তানের প্রায় ১০ লক্ষ অধিবাসী সোভিয়েত সশস্ত্রবাহিনীতে যোগদান করে, এবং আরো কয়েক লক্ষ মানুষকে সোভিয়েত ‘শ্রমিক সৈন্যদলে’ (Labor Army) নিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ ১০ হাজার সৈন্য যুদ্ধে নিহত হয়। তদুপরি, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও অন্যান্য কারণে কাজাখস্তানের প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়। কাজাখস্তান থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার সৈনিক বীরত্বের জন্য বিভিন্ন সোভিয়েত পদক লাভ করে, এবং শতাধিক সৈন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক ‘হিরো অফ দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ লাভ করে।

সোভিয়েত শাসনামলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের মতো কাজাখস্তানেও ৯ মে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপিত হত। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্বাধীন কাজাখস্তানে এই প্রথা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে কাজাখস্তান জুড়ে প্রতি বছর মহাসমারোহে এই দিনটি বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে  Goggles এর বিশেষ ফিচার ভিডিও, দেখুন ইউটিউবে

Sources:

1. Assel Satubaldina. “Kazakhstan Celebrates Victory Day Without Parades.” The Astana Times, May 11, 2020. 

2. “Iraq recalls ‘victory’ over ISIS amid bloody protests.” Shafaq News, December 10, 2019. 

3. “Victory Day Celebrations in Azerbaijan.” Anadolu Agency, May 9, 2019. 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...