দেশের ইতিহাসে প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (ভিডিও)

যানজটে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত চালু হতে চলেছে দেশের ইতিহাসে প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)।

দেশের ইতিহাসে প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট

জরাজীর্ণ, বিধ্বস্ত সড়ক দিয়ে যানবাহনগুলো দু-তিন গজ যাচ্ছে তো আর দু-তিন মিনিট থামছে, আবার একটু এগুচ্ছে—এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে পাড়ি দিচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা। দূরত্ব মাত্র ২৫.৭ কিলোমিটার, অথচ বাসে যেতে সময় লেগে যায় পাঁচ ঘণ্টারও বেশি। এ যেন হেঁটে গেলেও পৌঁছে যাওয়া যাবে গাড়ির আগে। এমনি এক করুণ ও বিরক্তির চিত্র দেখতে পাওয়া যায় ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সংশ্লেষে কালোত্তীর্ণ মহিমায় আর বর্ণিল দীপ্তিতে বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের অবস্থান করা গাজীপুর জেলাটিতে।

 

গাজীপুরকে বলা হয় উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, কেননা উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যেকোনো জেলা থেকে থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করতে হলে আসতে হবে গাজীপুর। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ জেলাটি সড়কপথে পাড়ি দিতে ভোগ করতে হয় নানান দুর্ভোগ। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই পথে যাতায়াত করছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা সহ্য করে। তাইতো যানজটে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত চালু হতে চলেছে দেশের ইতিহাসে প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। নির্মাণাধীন বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

 

এই প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে, এটি প্রতি ঘন্টায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার যাত্রী বহন করতে সক্ষম হবে। ৫ ঘন্টারও বেশি সময় লেগে যাওয়া এই রাস্তাটি অতিক্রম করা যাবে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে। প্রতি ২ থেকে ৫ মিনিট অন্তর অন্তর বাস আসবে।

 

যা থাকছে প্রকল্পে:

  • প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ‌্য হবে ২০.৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড বিআরটি লেইন থাকবে। বাকি ১৬ কিলোমিটার থাকবে সমতলে।
  • নির্মিত হচ্ছে ছয়-ছয়টি ফ্লাইওভার। ৮ লেনের টঙ্গী সেতু পুনর্নির্মাণ করা হবে।
  • গাজীপুর ও বিমানবন্দর এই দুই প্রান্তে থাকবে দুটি টার্মিনাল, আর মাঝের পথে হবে ২৫টি স্টেশন।
  • ১৮ মিটার দৈর্ঘের ১০০টি আর্টিকুলেটেড বাস চলাচল করবে এ পথে। বাস ভাড়া আদায় হবে ইলেক্ট্রনিক স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ।
  • ১৪১টি সংযোগ রাস্তার উন্নয়ন করা হবে যাদের মধ্যে ৬১টি রাস্তাই গাজীপুরে অবস্থিত।
  • গাজীপুরে ৬টি মাকেট উন্নয়ন এবং রাস্তার সমগ্র দৈর্ঘ্য ধরে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাত নির্মাণ করা হবে।
  • নির্মিত হবে উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নর্দমা।

গতিপথ

বাস করিডোরটি বিমানবন্দর টার্মিনাল থেকে শুরু হয়ে ৩নং জাতীয় মহাসড়ক ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পরে জয়দেবপুর চৌরাস্তার মোড় পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে এটি পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে আরও ৪ কিলোমিটার অগ্রসর হয়ে গাজীপুরের টার্মিনালে গিয়ে শেষ হবে, যা গাজীপুর বাজারের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। সোনারগাঁও সড়ক, আশুলিয়া সড়ক ও স্টেশন রোডের চৌরাস্তাগুলো দিয়ে চলবে এবং তুরাগ নদীর উপর দিয়ে বাস করিডোরটি ভূসমতলে না গিয়ে ফ্লাইওভারে চলবে। এছাড়া বড় বড় চৌরাস্তাগুলোর উপর থাকছে আরও ৬টি উড়ালসেতু।

প্রকল্পের মেয়াদকাল ও ব্যয়

গণপরিবহণকে গতিশীল করতে গাজীপুর ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ২০.৫ কিলোমিটার বিআরটি লাইন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিলো ২০১২ সালে। । শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রথম দফায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। 

এরপর আরেক দফায় ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সর্বশেষ কোভিড-১৯-এর কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ আবারও বাড়ানো হয়েছে এবং এক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২২ সালের জুনে। অথচ এই দীর্ঘ আট বছরে দফায় দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। 

আরো পড়ুন দেশের প্রথম মেট্রোরেল : ৩ ঘন্টার পথ মাত্র ৩৫ মিনিটে! (ভিডিও)

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলেছে, ঠিকাদারদের  দুর্বল পরিচালনার ও পরিকল্পনা,  ত্রুটিযুক্ত নকশা এবং নির্দিষ্টকরণের অভাব গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পকে ধীর করে দিয়েছে।

 

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার ছাড়াও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল ফ্যাসিলিটি অর্থায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে এক হাজার ৬৫১ কোটি টাকা নেওয়া হবে এবং ৩৮৯ কোটি টাকা নেওয়া হবে দেশের  জনগণের করের টাকা থেকে।

 

প্রকল্পটি সর্বশেষ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে আমূল পরিবর্তন ঘটবে। বদলে যাবে ঢাকার যানজটযুক্ত চেহারা, পাল্টাবে গাজীপুর জেলা। সকল অনিশ্চয়তা ও কাজের ধীরতা সত্ত্বেও কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুন উদ্যমে সফল হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, যানবাহনে আসবে গতিশীলতা, জনজীবনে কমবে দুর্ভোগের ছায়া।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...