বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)

কে জানে, হয়তো একদিন বলিউড-হলিউডের সঙ্গে সমানতালে টেক্কা দেবে আমাদের চলচ্চিত্রও। আর সেজন্য, চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কিন্তু আমাদের, সাধারণ দর্শকদের ওপরও বর্তায়! বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি আমাদের আগ্রহ এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)

চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ আসলেই আমরা হলিউড, বলিউড এদের টেনে আনি। আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্র এবং বলিউডের সূচনা প্রায় সমসাময়িক সময়েই। এমনকি নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সমান তালেই ছিলো বলা যায়। এরপর কি হলো জানতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে ইতিহাসে।

যেই মানুষটির হাত ধরে আমাদের আমাদের স্বাধীন দেশটির জন্ম, সেই একই মানুষের হাতে সূচনা হয়েছে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পেরও। পঞ্চাশ দশকের শেষার্ধ। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শোষন, নির্যাতন আর নিপীড়ন এর যাঁতাকলে পিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের কোন সুযোগ নেই। কোন বাঙালির যদি চলচ্চিত্র নির্মাণের সাধ জাগে তবে নেগেটিভ নিয়ে যেতে হবে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে। আবার প্রক্রিয়াকরন শেষে আনতে গেলেও লাগবে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স। চলচ্চিত্র আর কল কারখানা সবই পশ্চিম পাকিস্তানে। কোটি টাকা ব্যয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে উঠেছে ফিল্ম ষ্টুডিও।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছিলেন সাইত্রিশ বছরের যুবক মন্ত্রী, শিল্প, বাণিজ্য শ্রম মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে। তিনি বাঙ্গালি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অভাব অনুভব করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে “The East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957” বিলটি পাশ করিয়ে নেন। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হলো আমাদের এফডিসি।

তেজগাওয়ে অবস্থিত এফডিসির সাত একরের বেশি জায়গা জুড়ে  এই প্রাঙ্গনে শুটিং এর জন্যে নয়টি ফ্লোর রয়েছে। মেকআপ রুম ১৪টি।

এফডিসির এই ৬০ বছরের বেশি সময়ে এখানে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তিন হাজারেরও বেশি। স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে এদেশে ৮টি সিনেমা মুক্তি পায়। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে পঞ্চাশ থেকে ষাটটি সিনেমা মুক্তি পায়। এর মধ্যে পূর্ণ বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা ছাড়াও বিভিন্ন চ্যানেলের প্রযোজনাতেও মুক্তি পেত বেশ কিছু চলচ্চিত্র।

একটা সময় ছিল বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই নির্মিত হত এফিডিসিতে। বছরে একশো থেকে একশো কুড়িটি ছবিও তৈরি হত এখানে। কারণ দেশীয় ঐতিহ্য সংষ্কৃতি মূল্যবোধ সংরক্ষণসহ সুস্থ বিনোদনমূলক ছবি নির্মাণে নির্মাতের সহায়তা অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে একসময় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা এফডিসি।

একসময় এরকম বহু চলচ্চিত্রের জন্ম হতো এফডিসিতে। বিভিন্ন ফ্লোরে একই সঙ্গে একাধিক সিনেমার কাজ চলতো। শুটিং এর ফাকে শিল্পীরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এফডিসির বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নির্মাতারা এফডিসি বিমুখ হতে শুরু করে। সরকার সামান্য কিছু ভর্তুকি দিচ্ছে বলে এখন অব্দি টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা একটি আধা স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা।

একসময় এরকম বহু চলচ্চিত্রের জন্ম হতো এফডিসিতে; ©Sarabangla.net

 

সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধি নিয়ে আট সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান। সংস্থার প্রধান নির্বাহী হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই কর্পোরেশনের অধীনে প্রায় ৪৫০ জন কর্মকর্তাকর্মচারী রয়েছে।

চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার আইন অনুযায়ী এর কাজগুলির মধ্যে রয়েছে:

  1. চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং স্টুডিও প্রতিষ্ঠা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করা
  2. চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্মাণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে ঋণ প্রদান করা
  3. নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন করা এবং ভাড়ার বিনিময়ে স্টুডিও ব্যবহার করার সুযোগ প্রদান করা
  4. চলচ্চিত্র শিল্প ছোট আকারের শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকারের পরিকল্পনার তৈরি এবং জমা দেয়া, যার সাথে সম্পর্কিত গবেষণা প্রকল্পগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে
  5. চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহারের জন্য সিনেফটোগ্রাফ, ফিল্ম অন্যান্য সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা
  6. প্রজেক্টর এবং আনুষঙ্গিক বস্তু ক্রয় করার জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শকদের ঋণ প্রদান করা

কর্পোরেশনের অধীনে ৯টি শুটিঙের তলা (বর্তমানে ৭টি ব্যবহৃত হয়), ১৪টি রূপ সজ্জার কক্ষ, ১২টি শুটিং ইউনিট, ৩টি সাউন্ড থিয়েটার, রঙিন সাদাকালো চলচ্চিত্রের জন্য গবেষণাগার, ১৫টি সম্পাদনা যন্ত্র, অপটিক্যাল মেশিন, চলচ্চিত্র ক্যামেরা, বিভিন্ন ধরনের আলোকবাতি, ব্যাক প্রজেকশন যন্ত্র, পুকুর, কৃত্রিম হ্রদ, বাগান ইত্যাদি রয়েছে। এছাড়া এই সংস্থাটি চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র প্রযোজনা পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করা, প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা, নতুন শিল্পীদের সন্ধান, চলচ্চিত্র নিয়ে উৎসব সেমিনারের আয়োজন, বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য চলচ্চিত্র বাছাই করা, বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করা, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটি, চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড, চলচ্চিত্র অনুদান কমিটি চলচ্চিত্র নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিতে অংশগ্রহণ করা, প্রকাশনা করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার আন্ধারমানিক আশুলিয়ার কবিরপুর এলাকায় স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিল্ম সিটি এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ কাজের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সম্প্রতি এর প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই ফিল্ম সিটি প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো চলচ্চিত্রকারদের। ১০ হাজার ৩৯৫ শতাংশ (৩১৫ বিঘা) জমির ওপর স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিল্ম সিটি।

একসময় শুটিং দেখতে এখানে প্রতিদিনই ভীড় করতো প্রচুর সংখ্যায় দর্শনার্থী; © Sunarbangla.net

 

একসময় শুটিং দেখতে এখানে প্রতিদিনই ভীড় করতো প্রচুর সংখ্যায় দর্শনার্থী। কিন্তু এখন সেরকম লোকের সংখ্যা মাত্র কয়েকজন। কারণ এখন যেহেতু আগের মতন শুটিং হয় না তাই তারকাদের দেখাও মেলে না এখানে।

চুক্তিতে এফডিসি অকৃতকার্যতার পেছনে মূলত দুটি বিষয়কে চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। প্রথমটি এফডিসি যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে পড়ার কারণে নতুন প্রযুক্তির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কাজ অব্যহত রাখা। দ্বিতীয়ত, একদিকে ভারতীয় সিনেমার বাজার আর স্যাটেলাইটের অনুষ্ঠানের প্রভাব , অন্যদিকে দর্শকদের রুচি চাহিদার পরিবর্তন ঘটেছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) যেন এক দুঃখ সাগর। সেই দুঃখের সাগরে নোনা জল বাড়ছে হু হু করে। অতীত ঐতিহ্য বিপন্ন হয়েছে বর্তমান বিলাপে। জমছে পরিকল্পনার ওপর পরিকল্পনা। হচ্ছে, হবে করে দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।

বাংলা চলচ্চিত্রের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাংলা সিনেমা ছিল আন্তর্জাতিক মানের। এরপর অন্ধকার যুগে নব্বই দশক থেকে শুরু করে কয়েকবছর আগ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে মন্দাভাব গেলেও, সম্প্রতি কয়েকবছর ধরে শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নির্মিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা, দেশে বিদেশে পাচ্ছে ব্যাপক প্রশংসা।

২০০২ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্ম ফেস্টিভাল ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভাল’ এ ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট ক্যাটাগরিতে মনোনীত ও প্রদর্শিত হয়, যা বাংলাদেশের জন্য একমাত্র অর্জন এই সিনেমাটি দিয়েই। তাছাড়াও ২০০৩ সালে ছবিটি সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পেশ করা হয়। চূড়ান্ত পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হলেও এটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ এটিই প্রথম বাংলাদেশী ছবি যা অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করা হয়। এরপর দুই বছর কোন বাংলাদেশী ছবি অস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে একটি চলচ্চিত্র অস্কারের জন্য পেশ করা হচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পেশ করা সিনেমা তিনটি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া, আবু সাইয়িদের নিরন্তর এবং গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে পেশ করা হয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ চলচিত্রটি। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত ছবির মধ্যে রয়েছে নাসিরুদ্দিন ইউসুফের গেরিলা, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর টেলিভিশন, অমিত আশরাফের উধাও এবং দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত ছবি রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজান।

২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে একটি চলচ্চিত্র অস্কারের জন্য পেশ করা হচ্ছে; ©Sunarbangla.net

 

কে জানে, হয়তো একদিন বলিউডহলিউডের সঙ্গে সমানতালে টেক্কা দেবে আমাদের চলচ্চিত্রও। আর সেজন্য, চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কিন্তু আমাদের, সাধারণ দর্শকদের ওপরও বর্তায়! বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি আমাদের আগ্রহ এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর।

হয়তো এতটাই দূর, যে তা কল্পনার সীমাকেও একদিন ছাড়িয়ে যাবে!

নিশ্চয়ই যাবে!


This article is about the Bangladesh Film Development Corporation (BFDC).

References:

1. fdc.gov.bd

2.বাংলাদেশ-চলচ্চিত্র-উন্নয়ন-কর্পোরেশন-বিএফডিসি-এবং-বঙ্গবন্ধু-শেখ-মুজিব-ফিল্ম-সিটি-ব্যবহার-প্রসঙ্গে।

3. online/national/2020/08/15/945684

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...