বহুল আলোচিত বিশ্বের কিছু রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল- ২য় খন্ড

এই বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জীবনের এই ঘটনাগুলো ব্যক্তিগত জীবন থেকে কখন ট্যাবলয়েডের ফ্রন্ট পেজ নিউজ হয়ে উঠেছে তা হয়তো তারা নিজেরাও জানেনা।

বহুল আলোচিত বিশ্বের কিছু রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল- ২য় খন্ড 

 

গত আর্টিকেলে আলোচনা করেছিলাম রাজনীতিবিদদের জীবনের কিছু আলোচিত সমালোচিত ঘটনা নিয়ে। এই বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনের এই ঘটনাগুলো ব্যক্তিগত জীবন থেকে কখন ট্যাবলয়েডের ফ্রন্ট পেজ নিউজ হয়ে উঠেছে তা হয়তো তারা নিজেরাও জানেনা। তবে তাদের জীবনের এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তাদের ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র প্রভাবিত হয়েছে৷ আজ আমরা এমনই আরও কিছু স্ক্যান্ডাল নিয়ে কথা বলবো যা আজও সবার মনে দাগ কেটে আছে। 

 

 

১: দি কিটিং ফাইভ

Image Source: azcentral

১৯৮০ এর দশকে মার্কিন ব্যাংকিং শিল্প নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার পরে সঞ্চয় ও ঋণ ব্যাংকগুলো কেবল আবাসিক আর রিয়েল এস্টেটই নয় বরং বাণিজ্যিকভাবে আমানত বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া শুরু করেছিল। অনেক সঞ্চয়ী ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ শুরু করে এবং রেগান প্রশাসনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফেডারেল হোম লোন ব্যাংক বোর্ড (এফ এইচ এল বি বি) তাদের বন্ধ করার চেষ্টা করে, যা ব্যবসায়ের সাথে সরকারী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিল।

১৯৮৯ সালে, যখন ক্যালিফোর্নিয়ার ইরভিনে লিংকন সেভিংস অ্যান্ড লোন অ্যাসোসিয়েশন ভেঙে পড়ে তখন এর চেয়ারম্যান চার্লস এইচ কেটিং জুনিয়র এফএইচএলবিবি এবং এর সাবেক প্রধান এডউইন জে গ্রেয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিলেন। গ্রে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে পাঁচজন সিনেটর তাকে লিংকন তদন্তে পিছিয়ে যেতে বলেছিলেন।

এই সিনেটররা ছিলেন – ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যালান ক্র্যানস্টন, আরিজোনার ডেনিস ডেকনসিনি, ওহাইওর জন গ্লেন, মিশিগানের ডোনাল্ড রিগেল এবং অ্যারিজোনার জন ম্যাককেইন। যখন তাদের এই কাণ্ড সবার সামনে প্রকাশ পায় যে তারা কিটিং থেকে মোট ১.৩ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিল তাদের প্রচারণা চালানোর জন্য। তদন্তে এটি প্রমানিত হয় যে পাঁচটি লেনদেনই অনুচিতভাবে করা হয়েছিল, তবে তারা সকলেই দাবি করেন এটি একটি সাধারণ প্রচারণার ফান্ডিং ছিল। 

Image Source : front page Confidential

১৯৯১ সালের আগস্টে দি সিনেট এথিকস কমিটি, ক্র্যানস্টনের জন্য সেন্সর দেওয়ার সুপারিশ করেছিল এবং অন্য চারটিকে প্রশ্নবিদ্ধ আচরণের জন্য সমালোচনা করা হয়।

ক্র্যানস্টন ইতিমধ্যে ১৯৯২ সালে পুনঃনির্বাচনের জন্য না দাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ডকনসিনি এবং রিগেল নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তাদের দ্বায়িত্ব পালন করেন তবে ১৯৯৪ সালে পুনঃনির্বাচনে অংশ নেননি। জন গ্লেন ১৯৯২ সালে পুনঃনির্বাচিত হন এবং ১৯৯৯ সালে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। জন ম্যাককেইন সিনেটে তার কাজ চালিয়ে যান এবং ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার লড়াইয়ে অংশ নেন যাতে তিনি সফল হননি।

আমাদের পরের স্ক্যান্ডালটি তাইওয়ানের তবে ঠিক আগেরটির মতই ক্ষমতা আর টাকা সংক্রান্ত। 

 

 

২: দি চেন সুই বিয়ান স্ক্যান্ডাল

Image Source : The New York Times

চেন সুই বিয়ান ছিলেন তাইওয়ানের এক রাজনীতিবিদ, যিনি তার দেশের একজন গর্ব ছিলেন। দরিদ্রতা থেকে উঠে এসে তিনি ক্ষমতায় তার জায়গা তৈরী করেন। পপুলিস্ট চেন ছিলেন একজন সংস্কারক এবং তিনি তার ডাকনাম ‘এ বিয়ান’ এর জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি তার বিরোধী দল কুওমিনতাংকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, যে দলটি ১৯৪৯ সালে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর থেকে তাইওয়ান শাসন করছিল। প্রেসিডেন্ট হিসাবে চেন চীনের সরকারের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ড থেকে স্বাধীন ঘোষণার ধারণা নিয়ে তার সামনের দিনগুলোতে কাজ করে যাচ্ছিলেন। 

Image Source : Kotte Autographs

চেন ২০০৪ সালে পুনঃনির্বাচনে জয়ী হন, তবে তার বিরুদ্ধে স্ক্যান্ডাল জন্ম হওয়া শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। একই বছর তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। এটি প্রমাণিত হয়েছিল যে তিনি সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড এবং কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের ব্যাংকগুলোতে প্রচারের তহবিলের জন্য ২১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। অভিযোগ ছিল যে চেন নিজেই তার কর্তৃত্বের অপব্যবহার করেছিলেন। তার বিরোধি দল তাকে পদ থেকে প্রত্যাহার করার জন্য একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায় তবে আইনের আওতায় তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে কোন মামলা করা যায়নি।

তার বিরুদ্ধে এই কেলেঙ্কারীটি অব্যাহত থাকে এবং ২০০৮ সালের আগস্টে চেন পদত্যাগ করেন। ছয় মাস পরে তাকে ৩.১৫ মিলিয়ন ডলার পাবলিক তহবিল আত্মসাৎ করার জন্য এবং ৯ মিলিয়ন ডলার ঘুষ নেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে একটি আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাকে এবং তার স্ত্রী দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মোট ১৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। তাদের সাজা পরে কমিয়ে ২০ বছর করা হয়। ‘এ বিয়ান’ এর প্রতিশ্রুতিশীল ক্যারিয়ারের এখানেই শেষ হয়েছিল।

যৌনহয়রানির কারনে আমাদের তালিকায় এর আগেও কিছু রাজনীতিবিদদের নাম উঠে এসেছে, আমাদের তালিকায় পরবর্তী নামটিও তেমনই। 

 

 

৩: বুঙ্গা বুঙ্গা 

(FILES) This combo image made of two file pictures shows Italian Prime Minister Silvio Berlusconi (L) at Villa Madama in Rome and Moroccan Karima El Mahroug, nicknamed Ruby the Heartstealer in a nightclub. An Italian court was expected to deliver its verdict on June 24, 2013 on whether former premier Silvio Berlusconi paid for sex with “Ruby the Heart Stealer”, an underage prostitute, and abused his official powers to favour her. AFP PHOTO / FILES/ FILIPPO MONTEFORTE/GIUSEPPE ARESU (Photo credit should read GIUSEPPE ARESU,FILIPPO MONTEFORTE/AFP/Getty Images)

ঠিক যেমন “ওয়াটারগেট” স্ক্যান্ডালের সাথে নিক্সনের নাম সারা জীবনের জন্য জড়িয়ে আছে, তেমনই “বুঙ্গা বুঙ্গার” সাথে প্রাক্তন ইতালিয়ান প্রাইম মিনিস্টার সিলভিও বার্লুসকোনির নাম জড়িয়ে আছে এবং থাকবে। 

বার্লুসকোনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন যিনি ক্রুজ শিপ লাউঞ্জের গায়ক হিসাবে তার জীবনের শুরুর দিকে সম্পদ অর্জন করেছিলেন। তার মিডিয়া সাম্রাজ্যকে একটি ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে, তিনি ১৭ বছর ধরে ইতালীর রাজনীতিতে নিজের শক্তি প্রদর্শন করে যান। প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে কর জালিয়াতি এবং ঘুষের অভিযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, বার্লুসকোনির বিরুদ্ধে একজন কুখ্যাত প্লেবয় হওয়ার অভিযোগ আসে। বলা হয় যে তিনি তার বন্ধু, এখনকার বরখাস্ত লিবিয়ান নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে “বুঙ্গা বুঙ্গার” ধারণাটি পেয়েছিলেন, যার বিরুদ্ধে যুবতি মেয়েদের নিয়ে পার্টি করার অভিযোগ ছিল। 

Mandatory Credit: Photo by Minichiello/AGF/Shutterstock (10473789a)
Silvio Berlusconi
‘Maurizio Costanzo Show’ TV show, Rome, Italy – 12 Nov 2019

বার্লুসকোনির সবচেয়ে আলোচিত স্ক্যান্ডাল ২০১১ সালে আসে যখন তার বিরুদ্ধে একটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের সাথে যৌন সম্পর্কের জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তিনি কারিমা এল মাহরোগ নামে মরক্কোর এক পলাতক কিশোরীর সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন, যিনি রুবি হার্টস্টিলার নামেও পরিচিত ছিলেন। রুবি নাইট ক্লাবের বেলিড্যান্সার হিসাবে কাজ করতেন এবং বার্লুসকোনির পার্টিতে সবসময় আমন্ত্রণ পেতেন। যদিও তিনি এবং বার্লুসকোনি উভয়ই যৌন সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। বার্লুসকোনি তার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ২০১০ সালে চুরির অভিযোগে রুবিকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন। 

যৌন অপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে তার বিচার শুরু হওয়ার আগে বার্লুসকোনিকে ইতিমধ্যে তার অফিস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি যখন বুঙ্গা বুঙ্গা উপভোগ করতে ব্যস্ত ছিলেন সেই সময় ইতালির অর্থনীতির ধুলিস্যাৎ হচ্ছিলো। ২০১১ সালের ইউরোপীয় ঋণ সঙ্কট বার্লুসকোনির চূড়ান্ত অবক্ষয় ঘটায়, যদিও তারপরেও তার যৌন অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, যার জন্য তাকে সম্ভাব্য ১৫ বছরের জেল কারাদণ্ড ভুগতে হতো।

কিছু রাজনীতিবিদের মুখোশ এতটাই সূক্ষ্মতার সাথে সাজানো থাকে যে তারা বছরের পর বছর নিজেদের ধার্মিক এবং সুচরিত্রের অধিকারী হিসেবে প্রদর্শণ করে যান। আমাদের লিস্টের সর্বশেষ রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই হয়েছে। 

 

 

৪: দি মশে কাটসভ রেপ স্ক্যান্ডাল

Image Source : The New York Times

চেন সুই বিয়ানের মতো মশে কাটসভও একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন যিনি পরিশ্রম করে তার দেশে ক্ষমতার পদে এসেছিলেন। কাটসভ ইরানের একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫১ সালে কাটসভের বয়স যখন ৫, তার পরিবার ইসরায়েলে চলে আসে। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে একটি শরণার্থী শিবিরে বাস করত।

কাটসভ যিনি ছোট থেকেই বেশ চৌকস ছিলেন তিনি ইহুদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন এবং রক্ষণশীল লিকুদ পার্টিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৮০ এবং ১৯৯০ এর দশকে মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকটি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ২০০০ সালে, ইসরায়েলি সংসদ, নেসেট তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত করেছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি দণ্ডিত অপরাধীদের কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার অনেক আবেদন নাকচ করে দিয়েছিলেন।

তাকে নিয়ে ঝামেলা মূলত ২০০৬ সাল থেকে শুরু হয় যার সুত্রপাত কাটসভ নিজেই করেন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে অভিযোগ করেন যে ১৯৯০ এর শেষদিকে তিনি পর্যটনমন্ত্রী থাকাকালীন একজন কর্মচারী তাকে ব্ল্যাকমেইল করছিলো এবং একটি তদন্তে উঠে আসে যে মহিলার অভিযোগ সত্য ছিল। কাটসভ দুবার তাকে তার সাথে যৌনমিলনে বাধ্য করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে দু’টি গণধর্ষণের অভিযোগও আনা হয়।

Image Source :spiegei

কাটসভ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অশালীন লাঞ্ছনা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে অন্য মহিলারা এগিয়ে আসেন। কাটসভ তার অপরাধ অস্বীকার করেছেন, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, “আমি মেয়েদের জড়িয়ে ধরেছি এবং চুমু দিয়েছি।” তিনি দাবি করেন যে তার বিরুদ্ধে মামলাটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ ছিল।

২০০৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি একটি প্রস্তাব রাখেন যা ছিল তাকে যাতে জেল খানায় একদিনও কাটাতে না হয়। তবে পরবর্তীতে তিনি নিজের সেই স্বীকারোক্তি বদল করেছেন এবং দোষী না হওয়ার আবেদন করেছেন। ২০১০ সালে তার বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং একটি আপিল আদালত রায় বহাল রেখেছিল। কাটসভকে সাত বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয় এবং তার দ্বারা নিপিড়নের শিকার প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ প্রদান করার নির্দেশ আসে। প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, কাটসভের সাজা প্রদানের উপলক্ষটি ছিল তার সরকারের জন্য একটি “দুঃখ ও লজ্জার দিন”।

 

 

রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে আমাদের আগের আর্টিকেলটি পড়তে ভুলবেন না। আগের আর্টিকেলের লিংকটি নিচে দেওয়া হলো। 

বিশ্বের ৫টি স্মরণীয় রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল


This is a Bengali language article on Political Scandals.
Reference : Political Scandals.

 

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...