বঙ্গবন্ধু টানেল: দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ডুবো টানেল (ভিডিও)

চট্টগ্রাম শহরকে চীনের সাংহাই সিটির আদলে "ওয়ান সিটি টু টাউনস" মডেল হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিকল্পনা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্প।

বঙ্গবন্ধু টানেল: দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ডুবো টানেল

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর নিচে নির্মিত হতে চলেছে দেশের ইতিহাসে প্রথম সুরঙ্গ পথ-বঙ্গবন্ধু টানেল। চট্টগ্রাম শহরকে চীনের সাংহাই সিটির আদলে “ওয়ান সিটি টু টাউনস” মডেল হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিকল্পনা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্প।

 

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন এ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা (সিআরবিসি)।

বঙ্গবন্ধু-টানেল
নির্মাণাধীন কর্ণফুলী টানেল; Image source: bnaglatribune

প্রথমে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার। সেতু বিভাগের মতে, কর্ণফুলী নদীর উপরে যে তিনটি সেতু চট্টগ্রাম শহরকে বিভক্ত করেছে, সেগুলো ট্র্যাফিকের বিশাল চাপের সাথে লড়াই করতে পারে না। অতিরিক্ত পলিমাটির কারণে এই নদীর উপর আরেকটি সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। সে কারণেই সেতুর বদলে বঙ্গবন্ধু টানেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

৩.৪৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু টানেলটি চট্টগ্রাম শহরকে কর্ণফুলী নদীর ওপারের সাথে সংযুক্ত করবে। সুড়ঙ্গ অঞ্চলে নদীর প্রস্থ ৭০০ মিটার এবং গভীরতা ৯-১১ মিটার। জলের নিচে ১৮ থেকে ৪৩ মিটার গভীরতায় তৈরি করা হচ্ছে টানেলটি। এই টানেলের মধ্য দিয়ে যুক্ত হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব হ্রাস হবে প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

 

এই টানেলের যানবাহনগুলো প্রতি ঘন্টা ৮০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারবে । কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনগুলো চট্টগ্রাম শহরকে এড়িয়ে সুড়ঙ্গপথ দিয়েই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচল করতে পারবে। তাহলে চট্টগ্রাম নগরীর যানজটও অনেকাংশে কমে যাবে।

 

সুড়ঙ্গ ছাড়াও নির্মিত হচ্ছে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা প্রান্তের ৪.৮ কিমি দূরে ৫৫০ মিটারের চার লেন বিশিষ্ট একটি সংযোগকারী রাস্তা। পাশাপাশি নির্মিত হতে চলেছে একটি টোল প্লাজা ও একটি সার্ভিস এরিয়াও। ধারণা করা হচ্ছে এ টানেল দিয়ে বছরে প্রায় ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারবে।

 

এই প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে ভ্রমণের সময় এবং ব্যয় হ্রাস করবে। দেশের পূর্বাঞল থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহণ সহজতর হবে। এটি চট্টগ্রাম শহর, বন্দর এবং নদীর পশ্চিম তীরে বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে একটি উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করবে। সেই সাথে বিকাশ ঘটবে কর্ণফুলীর পূর্ব তীরের পর্যটন শিল্প।

 

১৪ ই অক্টোবর ২০১৪, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বঙ্গবন্ধু টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জি টু জি পদ্ধতিতে ইপিসি কন্ট্রাক্টে টানেল নির্মাণের জন্য চাইনিজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিসিসি লিমিটেড ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মধ্যে ২০১৫ সালের ৩০ জুন বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় অনুমোদিত হয়েছিলো ৮৪৪৭ কোটি টাকা।

 

২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতা ও কাজের ধীরতায় প্রকল্পটির সময়সীমা ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেই সাথে বেড়েছে ব্যয়ও। সংশোধিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৩৭৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ২৩ লাখ এবং চীন সরকারের ঋণ ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার অর্থায়নে নির্মিত হবে বঙ্গবন্ধু টানেল। প্রকল্পের ঠিকাদার হিসাবে চায়না কমিউনিকেশন এ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) কাজ করছে।

 

সংশোধনীর পরপরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গতিশীলতা অর্জন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে বরাদ্দের ৬১% ব্যয়ে কাজ শেষ হয়েছে ৫৪.৩৬%। এটি অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে টানেলের কাজ। 

বঙ্গবন্ধু-টানেল
শুরু হয়েছে দ্বিতীয় টিউবের কাজ; Image source: dailybangladesh

৩.৩১৫ কিলোমিটার বিশিষ্ট মূল টানেলটির দুটি টিউবের একটির কাজ শেষ হয়েছে। অন্য টিউবটির কাজ গত বছরের শেষ দিকে শুরু হয়েছে।  চীনে নির্মিত ১৯,৬১৬ টি ছোট ছোট অংশ ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে টিউবগুলো। এখন পর্যন্ত চীনে ১৯,২০৬ টি বিভাগ নির্মিত হয়েছে এবং ১৫,৭৮৪ টি বিভাগ চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯,,৭৮৪ টি সেট আপ করা হয়েছে।

 

প্রকল্পের আওতায় ৩৮২ একর জমির মধ্যে ৩৬২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুতই অধিগ্রহণ করা হবে আরো ২০ একর জমি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে প্রায় ২৫০ চীনা শ্রমিক এবং ৬০০ বাংলাদেশি শ্রমিক। 

 

আরো পড়ুন : বাঘ ইকো-ট্যাক্সি : প্যানিক বাটন চাপলেই কমবে গতি (ভিডিও)

 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) অনুযায়ী, যদি বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজটি চলমান গতিতে অব্যাহত থাকে তবে আগামী বছরেই নদীর তলদেশের ৪৩ মিটার নিচে থেকে চলতে শুরু করবে যানবাহন।

বঙ্গবন্ধু-টানেল
স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেল; Image source: bangladeshpost

বঙ্গবন্ধু টানেল-এর যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিকীকরণ এবং পর্যটনসহ শিল্পের উন্নয়নের সামগ্রিক সুবিধার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ সহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি স্টেশনসহ বহুবিধ শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


This is a Bengali article about ‘Bangabandhu tunnel’.

Referrence:

Karnaphuli tunnel be operational next year

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...