ফুসফুস ভালো রাখার উপায়

চলুন জানা যাক, ফুসফুস ভালো রাখার উপায় হিসেবে কোন খাবারগুলি খাওয়া উচিত।

ফুসফুস ভালো রাখতে ঔষধ নয়, এ খাবারগুলো খান।

 ফুসফুস ভালো রাখার উপায়

আলাপন দীর্ঘায়িত করার আগে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে সম্পূর্ণ বিপরীত একটি আলাপ দিয়ে শুরু করি। মহামারীর এ সময়টায় জ্বর কিংবা কাশি সহ অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে মানুষ যতটা না ভয় পেয়েছে, তার চেয়েও বেশি আতঙ্ক জন্ম নিয়েছে ফুসফুসের ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। শুধু অকেজো বললে একটু ভুল বলা হবে কারণ অকেজো হতে হতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটাতে ফুসফুস সুস্থ রাখার জন্য জোর প্রয়াস চলছে। আর মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটিকে নিয়ে সচেতন হওয়ার সময় কিন্তু এখনও শেষ হয়ে যায়নি বরং চলমান শীতের এই সময়টাকে যেখানে কোভিড ১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউ বলা হচ্ছে সেখানে সুস্থতার ভার নিজেকেই বহন করতে হবে বইকি।
তাই সচেতনতার জের ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গটিকে ভালো রাখার প্রত্যয় নিয়েই আজকের এই লেখনী। মন দিয়ে পড়লে নিজেই নিজেকে সুস্থ রাখতে পারবেন। আর সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র যে খাবার, তা তো নতুন নয় বরং খাবার ছাড়া শরীর সুস্থ রাখার কথা চিন্তাই করা যায় না। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথেই শরীরের আর দশটা অঙ্গের মতো ফুসফুসও বাড়তে থাকে। কার্বন ডাই-অক্সাইড কে বের করে অক্সিজেন টেনে নেওয়ার সময় দূষিত পরিবেশের দূষিত বায়ু খুব সহজেই ঘায়েল করে দিচ্ছে শরীরের ভেতরে থাকা এ অঙ্গটিকে। সেই সাথে অসুখ-বিসুখ বাড়িয়ে দিয়ে কমিয়ে দিচ্ছে ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও। আর এসব কারণ বিবেচনা করেই বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন নিজের সহ সে সব খাবারগুলোর, যাদের উপর নির্ভর করে আপনার শরীরে থাকা ফুসফুসটি থাকবে সুস্থ। তাহলে চটজলদি জেনে নিন, কোন খাবারগুলো আপনার ফুসফুসকে ভালো রাখবে-

পানি: যার অপর নাম জীবন!

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় হতে পারে পানি খাওয়া ©gqindia.com
আসল আলাপে যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে ভিন্ন এক দুনিয়া ঘুরিয়ে আনতে চাই আপনাদের, চলুন-
আগেই বলে নিচ্ছি, যারা মুসলিম এ বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। মুসলিমদের একটা মাস থাকে, রমজান। যেখানে ভোর রাতে সাহরি খেয়ে সাওম শুরু করে, মাগরিবের আযানের সময়ে ইফতার করে সে সাওম শেষ করা হয়। এই সাহরি থেকে ইফতারের সময়ে সকল প্রকার পানাহার নিষিদ্ধ। সে সময়ে পানির জন্য হাহাকার লেগেছে? সারা মাস পানি নিয়ে ধানাইপানাই করলেও সাওম পালনের এ সময়টায় পানির জন্য হাপিত্যেশ হয়নি এমন কোন মুসলিম আছেন? দিনশেষে ঘরের সব পানি খেয়ে ফেলার নিয়ত করে ইফতারে বসেননি এমন মানুষও কম। পানির জন্য আকুতির বিষয়টা একটু কি ধরিয়ে দিতে পেরেছি?
ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
তপ্ত মরুভূমিতে উটের ভেতর থেকে পানি, প্রসাব খাওয়া দৃশ্য দেখে আঁৎকে উঠে একবারও কি মনে এসেছে, ‘পানি ছাড়া কতক্ষণ সম্ভব’! ©youtube.com
কিংবা যদি বেয়ার গ্রিলসের কথা বলি, মরুভূমিতে পানি না পেয়ে উটের প্রসাব কিংবা উটের শরীরে জমিয়ে রাখা পানি অথবা ক্যাকটাস কেটে তার ভেতরে থাকা তেতো রস শুষে পানি আস্বাদন করার বিষয়টা যখন Man vs Wild এ দেখিয়েছে, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা নিয়ে অনেকেই দোয়া করেছি- ‘পানিটা পাইয়ে দাও!’
এবার আলাপে আসি, ফুসফুসে থাকা রক্তের সঞ্চালন ঠিক থাকার জন্য এবং শ্লেষ্মা পাতলা রাখার জন্যই পানি পান করুন। এতে লাভ কী জানেন? শরীরে থাকা দূষিত পদার্থ ও জীবাণুগুলো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বের করে দেওয়া সহজ হয়। যে কারণে ডাক্তাররা দৈনিক ২/৩ লিটার কিংবা প্রয়োজন অনুসারে তার অধিক পানি পানের পরামর্শ দেন যেটা আপনাকে আপনার ফুসফুসের স্বাস্থ ঠিক রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে।
অনেকে পানি পান করতে চান না, শীতের এই সময়টায় তো আরও না। সেক্ষেতে পানিজাতীয় খাবারগুলো খাওয়ার পরামর্শও দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। ভুনা কিংবা মশলাদার খাবার এড়িয়ে হালকা মশলার সহজপাচ্য ও পাতলা ঝোলের তরকারি, পাতলা ডাল, শরবত, স্যালাইন, ডাবের পানি, ভাতের মাড় কিংবা জাউ খেতে পারেন।

জোর দিন ফল ও শাকসবজিতে

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় হিসেবে শাকসবজি খেতে হবে © ittefaq.com
শীতের এই সময়টা পিঠার পাশাপাশি বিখ্যাত কিন্তু টাটকা শাকসবজির জন্যও। একটা ব্যাপার খেয়াল করলেই বুঝবেন, কিছু শাকসবজি ও ফলমূল আছে, তা প্রতিবছর পাওয়া যায় না শুধু নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যায়। আবার যে সময়ে যেটা পাওয়া যায় সে সময়ে সেটা খাওয়ার কথা বেশি বলে থাকেন ডাক্তাররা। কেন? ধরুন, শীতের কথাই যদি বলি- শীতকালে ঠাণ্ডার সমস্যা বেশি হয় আর এ সময়ে কমলা বা এ জাতীয় ফল এবং শাকসবজিও বেশি পাওয়া যায়। আবার ডাক্তারেরা এ সময় টক ফল আর শাকসবজিও বেশি খেতে বলেন। ২-এ ২-এ ৪ হলো কি? রোগ যেমন আছে, রোধও আছে আর সেটা এ প্রকৃতিতেই। প্রকৃতির উপর একবার নির্ভর হয়েই দেখুন না, সুস্থ থাকার চাবিটাই পেয়ে যাবেন।

 

আরও পড়ুন : বাঁচানো যাবে না পৃথিবীর ফুসফুসকে? 

ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দারুণভাবে সাহায্য করে। আর বেদানা, আপেল, আঙুর, কমলালেবু, পেয়ারা, গাজর, বিনস, শশা, কুমড়ো জাতীয় ফল ও সবজিগুলো ফুসফুসের স্বাস্থকে ঠিক রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে কার্যকর ভাবে। বলছি না, এগুলো সবগুলোই প্রতিদিন খান। তবে সাধ্যমতো দৈনিক তালিকায় কয়েকটা উপাদান রাখা কি খুব বেশি হয়ে যাবে?

একটি তুলসী গাছের কাহিনি

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
তুলসী গাছ হতে পারে ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় ©roddure.com
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখা এ গল্পটি পড়েছেন? হিন্দুয়ানীর চিহ্ন সম্বলিত এ গাছটিকে উপড়ে ফেলার জন্য কত কিছু কিন্তু তবুও কেউ জল ঢেলে গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখছে নিয়ম করে, সর্দি-কাশিতে উপকার দেবে বলে। শেষটা আবার শুরুর মতো নিরবতায় ঢেকে গেলেও সবুজ হয়ে যাওয়া তুলসীটা আবার বর্ণহীন হয়ে গেছিলো।
মন কেঁদে ওঠা গল্পটা পড়ে চোখ ভিজে না গেলেও মনের কোথাও একটা চিনচিনে অনুভূতি তো জেগেছেই অনেকের। একটা গাছ কী করে ধর্মের শেকলে আঁটকে যায় সে হিসাব না মিললেও গাছটি যে উপকারের বিরাট ভাণ্ডার, এ কথার হিসাব কিন্তু বহু আগেই মিলেছে। কেমন সেটা?
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট  সমৃদ্ধ তুলসি পাতাগুলো ফুসফুস ভালো রাখতে দারুণ কাজ করে। এমনকি বাতাসে ভেসে থাকা দূষিত পদার্থগুলোকেও নিঃসরণ করে পাতাটি। দিনের শুরুতে তুলসী চা পান কিংবা তুলসী পাতার রসের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়া অথবা গোটা কয়েক তুলসী পাতা চিবিয়ে যদি দিন শুরু করতে পারেন তো সারাদিনের জন্য নিশ্চিত।

ব্রকলি: ফুলকপির আত্মীয় মনে করা সবজিটি

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
ব্রকলিও হতে পারে ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় ©abnews24.com
ব্রকলি বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরে বেশ জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য, দামও হাতের নাগালে। ফুলকপির কাছাকাছিই এর দাম। দেখতে ফুলকপির কার্বনকপি হলেও এর রঙ সবুজ। ছোটোবেলায় অনেকেই একে ফুলকপির লতায় পাতায় আত্মীয় ভাবতেন যেমনটা চালকুমড়ো আর লাউকে ভেবে থাকেন অনেকে।
ব্রকলিতে সালফোরাডেন ও অক্সিডেটিভ নামক উপাদানটি স্ট্রেসের ক্ষতি থেকে শরীরকে রক্ষা করে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। রোজকার খাবারে ব্রকলি রাখতে আপত্তি কি এখনও থাকবে?

সবুজ রঙের সেই চা’টি

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
সবুজ চা হতে পারে ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় ©jugantor.com
২০১৭ সালে কোরিয়াতে ১ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের নিয়ে একটা গবেষণা হয়েছিল। সেখানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল চমকপ্রদ এক তথ্যের। প্রতিদিন ২ কাপ করে ধারাবাহিকভাবে কয়েকদিন গ্রিন-টি পান করানো হয় তাদের। এরপর পরীক্ষা করে দেখা যায় অন্যান্যদের  তুলনায় ঐ ১ হাজার জনের ফুসফুসের কার্যকারিতা অনেক বেশি ভালো।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার যে গ্রিন-টি আমাদের শরীরের জন্য উপকারিই বটে, কিন্তু কতটা? এর ভেতরে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফুসফুসের প্রদাহ কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে বহুগুণে। রোজ ২ কাপ করে গ্রিন-টি কিন্তু অনায়াসেই পান করতে পারেন আপনি। তবে অনেকে এর স্বাদের জন্য পিছিয়ে যান। স্বাদে বা গন্ধে এটি তেমন একটা ফল দিতে না পারলেও আপনার শরীরের ভেতরে যে জাদুকরী কাজ করছে, এটাও কিন্তু কম নয়।

আবার আসুন ফিরে, মাছে-ভাতে বাঙালি হয়ে

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
ট্রাউট মাছ©wikioedia.com
শুরুতে গবেষণা নিয়ে কিছু বলি-
সামুদ্রিক মাছে প্রচুর ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যেটা ফুসফুসের কার্যক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। হেরিং, ম্যাকারেল ও ট্রাউটের মতো মাছগুলো সিওপিডি নামক এক রোগের চিকিৎসার জন্য সহায়ক। এছাড়াও ইউনিভার্সিটি অভ রচেস্টার স্কুল অভ মেডিসিন অ্যান্ড ডেন্টিস্ট্রির একদল গবেষক জানিয়েছেন- মাছের ভেতর প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা ফুসফুসের যেকোন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যথেষ্ট। সাধ্যমতো সপ্তাহে ২-৩ দিন কিংবা অন্তত ১ দিন মাছ খান।

ফিরে যাচ্ছি চিরচেনা আদা-রসুনের কাছে

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় হতে পারে আদা রসুন ©prothombangladesh24.com
অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ আদা ও রসুন ফুসফুসকে ভালো রাখার পাশাপাশি এর ভেতরে থাকা দূষিত পদার্থগুলোকে বের করতে দারুণ ভাবে সাহায্য করে। এছাড়াও ফুসফুসের রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে ও ক্যান্সার জাতীয় ঝুঁকি এড়াতে আদা রসুনের বিকল্প নেই। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে আদা রসুন কে আপনি অস্বীকার করতেই পারবেন না।
অনেকের রসুনের গন্ধে বমি পায় বা আদার ঝাঁঝালো স্বাদের জন্য একে খেতে অস্বস্তি বোধ করেন। উপরে দেওয়া তথ্য জানার পর এ দুটোকে নিজের থেকে আলাদা করা কি ঠিক হবে?

কাঁচা হলুদ নিয়ে এক চিমটি আলাপন

ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায়
কাঁচা হলুদ হতে পারে ফুসফুস-ভালো-রাখার-উপায় © femina.in

হাজার বছর, না! এরও বেশি বছর বললেও কম হয়ে যাবে। তারও আগে থেকে এশিয়া মহাদেশে শুধু মশলা হিসেবেই নয় বরং ঔষধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসা উপাদানটির নাম কাঁচা হলুদ। কারকিউমিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হলুদ ফুসফুসকে দূষিত পদার্থের প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রেখে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। রোজ সকালে একটু খানি কাঁচা হলুদ চিবিয়ে খেলেও উপকার পাবেন বইকি। শুধু হলুদ খেতে কেমন কেমন লাগলে মধু কিংবা দুধের সাথে মিশিয়েও খেতে পারেন। তাতেও উপকার কমবে না বরং আরও বেড়ে দ্বিগুণ হবে মধু আর দুধের কল্যাণে।


This Bangla article is about some food what keeps your lungs healthy.
Reference:
আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...