পৃথিবীতে এত পানি এল কোথা থেকে?

মেঘমুক্ত রাতের আকাশে অনেক সময় নক্ষত্রের মতো ছোট উজ্জ্বল বস্তু পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। এই বস্তুগুলোকে উল্কা বলা হয়। গ্রাম বাংলায় একে বলা হয় তারা খসা।জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দাবি, পৃথিবীতে প্রথম পানি বা জল বয়ে এনেছিল কোন উল্কা

© popular science

পৃথিবীতে এত পানি এল কোথা থেকে?

ছোট বেলায় আমরা অনেকেই পড়েছি যে পৃথিবীর তিন ভাগ হচ্ছে জল এবং এক ভাগ স্থল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো পৃথিবীতে এত পানি এলো কোথা থেকে?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দাবি, পৃথিবীতে প্রথম পানি বা জল বয়ে এনেছিল কোন উল্কা বা ‘Meteor’ ( এর অর্থাৎ কী সেটা একটু পরেই বলছি) । যদিও, এই তত্ত্বটি প্রমাণ করা বেশ কঠিন। কারণ, এর আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে পৌঁছানো উল্কাগুলিতে জলের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলেনি। তবে সাম্প্রতিক কালে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া উল্কাখণ্ডে জল প্রবাহের প্রমাণ অবাক করেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের।

 

এবার একটু জেনে নেই উল্কা মানে কী?
মেঘমুক্ত রাতের আকাশে অনেক সময় নক্ষত্রের মতো ছোট উজ্জ্বল বস্তু পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। এই বস্তুগুলোকে উল্কা বলা হয়। গ্রাম বাংলায় একে বলা হয় তারা খসা। এর থেকেও ভালো বুঝতে পারবেন হিন্দি ভাষায় এটাকে কী বলা হয় ওটা শুনলে “টুটা হুয়া তারা”, যেটা আমরা অনেকে হিন্দি সিনেমায় দেখেছি।

 

পৃথিবীতে-এত-পানি-এল-কোথা-থ

 

আগে সাধারণ মানুষ মনে করতো, আকাশের তারাই কোনো কারণে খসে পড়লে, তখন আকাশে এই ‘তারা খসা’ দেখা যায়। অনেকে ধর্মীয় বিশ্বাসে মনে করেন, ফেরেস্তারা শয়তানকে যখন চাবুক মারে, তখন এই আলো দেখা যায়। তবে ব্যাপারটি এমন নয়। বিস্তারিত বলছি-
Vikaspedia’তে বলা হয়েছে বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশে নানা ধরণের ছোটো ছোটো মহাকাশীয় বস্তু ভেসে বেড়ায়। এই বস্তুগুলো যখন কোন গ্রহ-নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে, তখন এদের আকর্ষণে বস্তুগুলো এদের দিকে চলে আসে। এই ঘটনা মহাকাশের সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমন কি চাঁদের মতো উপগ্রহেও ঘটে থাকে। পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা অধিকাংশ উল্কাপিণ্ডের উৎস ধূমকেতু। পৃথিবী তার কক্ষপথে চলার সময়, বিভিন্ন ধূমকেতু কক্ষপথের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তখন ওই সকল ধূমকেতুর ছোটো ছোটো অংশ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা এই বস্তুগুলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন বায়ুমণ্ডলের সাথে এদের সংঘর্ষে এরা উত্তপ্ত হয়ে উঠে এবং একসময় তাতে আগুন ধরে যায়। রাতের আকাশে এই জ্বলন্তু বস্তুগুলোকেই উল্কা নামে অভিহিত করা হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৬৫ কিমি থেকে ১১৫ কিমি এর মধ্যে যে সকল উল্কা জ্বলতে জ্বলতে নিচে নেমে আসে, সেই উল্কাগুলোই ভূপৃষ্ঠ থেকে দেখা যায়।

পৃথিবীতে-এত-পানি-এল-কোথা-থ
© popular science

 

বেশীরভাগ উল্কা আকাশেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে। প্রতি বছরই পৃথিবীতে উল্কাপাত হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি বছর প্রায় ১৫০০ মেট্রিক টন উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ভূপৃষ্ঠ যে সকল উল্কাপিণ্ডের অবশেষ পাওয়া যায়, তাদের বেশিরভাগের রঙ থাকে কালো। প্রচণ্ড উত্তাপে এদের বহির্ভাগ পুড়ে যাওয়ার কারণে এগুলোর রঙ কালো হয়।

আবার আসি মূল কথায় ,সম্প্রতি Phys.org-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একাংশ পৃথিবীতে প্রথম পানি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে উল্কাখণ্ড বা উল্কাবৃষ্টির ভূমিকা থাকার বেশ কিছু প্রমাণ পেয়েছেন।

সিডনির ম্যাককুয়েরি বিশ্ববিদ্যালয়ে (Macquarie University) জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাইমন টার্নার ও তাঁর সহকারী বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর জানিয়েছেন, যেটুকু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তাতে এটা প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, কোনও এক বা একাধিক উল্কাই পৃথিবীতে পানি এনেছিল। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৪৪০ কোটি বছর আগেই পৃথিবীতে পানি এনেছিল এক বা একাধিক উল্কাখণ্ড।

গ্রহের জন্মলগ্নে এটি অসম্ভব রকমের গরম ছিল। পানি ভরা উল্কাখণ্ডগুলি প্রচণ্ড উত্তপ্ত পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। এর ফলে উল্কাখণ্ডগুলির ভেতরে থাকা পানির পুরোটাই বাষ্পীভূত হয়ে গিয়ে ঘন মেঘের বিশাল স্তরের সৃষ্টি করেছিল। ওই মেঘের কারণেই পৃথিবীতে প্রবল ঝড়, বৃষ্টি হয় এবং জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এই গ্রহ।

 

এবার প্রশ্ন হলো কী ভাবে এত পানি এলো ওই উল্কাখণ্ডগুলিতে?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ওই বিশেষ ধরনের উল্কাগুলিতে মিশে থাকা খনিজ আর জৈব পদার্থ থেকেই এই পানির জন্ম হয়েছিল। এই উল্কাগুলিতে থাকা প্রচুর পানি আর জৈব যৌগগুলিতে ছিল অফুরন্ত হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ‘ডিওটেরিয়াম’, যাকে আমরা ‘ভারি জল’ বলে থাকি। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, পৃথিবীর তিন ভাগ পানিতে হাইড্রোজেন আর ডিওটেরিয়ামের অনুপাত যতটা, ওই উল্কাগুলিতেও এর অনুপাত ঠিক ততটাই!

পৃথিবীতে-এত-পানি-এল-কোথা-থ
©the week

 

বছর খানেক আগে ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৪১০ কিলোমিটার থেকে ৬৬০ কিলোমিটার নীচে একটা সুবিশাল জলাধারের হদিশ পেয়েছেন মার্কিন ভূতাত্ত্বিকরা। এই নীল গ্রহের সমস্ত সমুদ্র, মহাসমুদ্র মিলিয়ে যে পরিমাণ পানি রয়েছে, তার প্রায় তিন গুণ বেশি পরিমাণ পানি রয়েছে ভূগর্ভস্ত প্রাকৃতিক জলাধারে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, রিংউডাইট (Ringwoodite) নামের এক বিশেষ ধরনের শিলার ভাঁজে প্রচণ্ড চাপে আটকে রয়েছে ওই বিপুল পরিমাণ পানি। এই পানি অবশ্য তরল অবস্থায় নেই, বরং রয়েছে হাইড্রক্সিল আয়ন ও হাইড্রক্সাইড হিসেবে।

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক গবেষণায় ধারণা হয়েছে, বেশির ভাগ না হলেও কার্বনাসিয়াস কনড্রাইট (সিসি) – কমপক্ষে ৮টি পরিচিত শ্রেণি এবং অনেক শ্রেণিহীন উল্কাখণ্ডের সমন্বয়ে বৃহত্তর গ্রহাণুর অংশ হিসাবে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছিল।

আবার অনেকেই ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বলতে পারেন “পৃথিবীতে এত্তো পানি থাকতে প্রতিদিন সকালের গোসল করার সময় পানি চলে যায় কেন?”, বিশ্বাস করুন আমার ও একই প্রশ্ন!


This is a Bengali article on the water source of the earth. Necessary references are hyperlinked within the article.

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...