নেদারল্যান্ডস: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর খাদ্যভান্ডার

আকাশ থেকে নিচে তাকালে দেখা যাবে অসংখ্য গ্রিন হাউজ। ছোট ছোট এসব চেম্বারের তুলনায় উদ্ভিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত মানুষের আনাগোনা খুবই অল্প। মানুষের বদলে রয়েছে ড্রোন, সেন্সর এবং রোবটিক আর্মস। কথা বলছি উত্তর ইউরোপের ছোট একটি দেশ নেদারল্যান্ডসকে নিয়ে। মাত্র ৪১ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটারের এই দেশে প্রায় ১৭.৪ মিলিয়ন লোকের বাস। নিন্ম ভূমি হিসেবে পরিচিত এই দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করে ৫২১ জন। এত ঘন জনবসতি হওয়া সত্ত্বেও ২০১৯ সালে খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে নেদারল্যান্ডস। কিন্তু কিভাবে?

নেদারল্যান্ডস: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর খাদ্যভান্ডার

আকাশ থেকে নিচে তাকালে দেখা যাবে অসংখ্য গ্রিন হাউজ। ছোট ছোট এসব চেম্বারের তুলনায় উদ্ভিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োজিত মানুষের আনাগোনা খুবই অল্প। মানুষের বদলে রয়েছে ড্রোন, সেন্সর এবং রোবটিক আর্মস। কথা বলছি উত্তর ইউরোপের ছোট একটি দেশ নেদারল্যান্ডসকে নিয়ে। মাত্র ৪১ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটারের এই দেশে প্রায় ১৭.৪ মিলিয়ন লোকের বাস। নিন্ম ভূমি হিসেবে পরিচিত এই দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করে ৫২১ জন। এত ঘন জনবসতি হওয়া সত্ত্বেও ২০১৯ সালে খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে নেদারল্যান্ডস। কিন্তু কিভাবে?

নেদারল্যান্ডের তাপমাত্রা, জলবায়ু, উর্বর মাটি এবং আবহাওয়া ফসল, গবাদি পশু এবং অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের বেড়ে ওঠার জন্য খুবই অনুকূল। তবে অনেক অঞ্চলই কৃষি কাজের জন্য অনুকূল আবহাওয়া রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের কথা বলা যেতে পারে। তবুও এসব অঞ্চল খাদ্য উৎপাদন এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে কেউই নেদারল্যান্ডের ধারে কাছেও নেই।

কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডাচরা অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। সীমান্তের কাছাকাছি কোন অঞ্চলের চাষি শুধুমাত্র কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে সম্পূর্ণ বাগানের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর সব তথ্য মনিটরে দেখতে পারছেন। তাছাড়া ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে মাটিতে আর্দ্রতা,মাটির রাসায়নিক অবস্থা, উদ্ভিদের বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পৃথক পৃথক আলুর বর্তমান অবস্থাও দেখতে পাওয়া সম্ভব। “অর্ধেক সম্পদে দ্বিগুণ উৎপাদন”- ডাচদের স্বকীয় প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থেই এই শতকের শুরুতে পূর্বের তুলনায় প্রধান ফসলের উৎপাদনে শতকরা ৯০ শতাংশ পানির ব্যবহার কমিয়েছে।

নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ; image source: Wonderful Engineering

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডাচরা তাদের কৃষিখাতকে ঢেলে সাজায়। যার ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোন অঞ্চল বা ক্ষেত্রে নয়, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে সর্বত্র। স্থান সংকট সংকুলানের জন্য তারা হাতে নিয়েছে ভার্টিকাল ফার্মিং (Vertical Farming) পদ্ধতি। জাতিসংঘের তথ্য মতে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবী জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯ থেকে ১০.৫ বিলিয়নে এবং এদের মাঝে শতকরা ৮৫ শতাংশ বাস করবেন শহরে। ক্রমাগত প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, ফসলি জমির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, কীটনাশকের অপরিমিত ব্যবহারের ফলে দিন দিন মাটির উর্বরতা শক্তি কমছে। এতে স্বাভাবিকভাবে ফসল ও সবজি উৎপাদন কমছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বর্তমানের একই ভাবে চাষের জন্য পানির ব্যবহারের ফলে দেখা দিতে পারে সুপেয় এবং নিরাপদ পানির অভাব। কিন্তু এই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব ভার্টিকেল ফার্মিং প্রযুক্তির মাধ্যমে। একই স্তরে সবজী চাষের পরিবর্তে উলম্ব ভাবে অনেক স্তরে সবজী চাষের প্রক্রিয়াই হল ভার্টিকেল ফার্মিং। এতে প্রতি বর্গ মিটারে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পানির ব্যবহারের পরিমাণ ৯০% কমানোর পাশাপাশি সূর্যের আলোর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে এলইডি লাইট (LED)। সুলভ এবং শক্তির অপব্যয় কম হওয়ার কারনে হাইপ্রেসার সোডিয়াম এবং মেটাল হেলাইড সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। ভার্টিকেল ফার্মিং এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রতিটি প্রোডাকশন ইউনিট থেকে সাধারণ গ্রিন হাউজের চেয়ে ২-৩ গুন এবং সাধারণ চাষ পদ্ধতি অপেক্ষা ৩০ থেকে ৪০ গুণ ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এর অন্যতম একটি সুবিধা হল খোলা প্রান্তর ছাড়াও বহুতল ভবনের কৃত্রিম পরিবেশে সহজেই চাষ করা যায়। গবাদিপশু এবং কৃষিকাজের জন্য নেদারল্যান্ডের মূল ভূমির অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভার্টিকেল ফার্মিং; image source: Holland Hydroponics

 

ডাচরা সফলভাবে কৃষি ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহার করছে। ফল বাছাই এবং সংগ্রহ, মাংস পৃথকীকরণ, আলু প্রক্রিয়াজাত ইত্যাদি কাজ করছে রোবট। তাছাড়া মাটির গুনাগুণ,আর্দ্রতা এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে মাটির প্রভাব নির্ণয়ে ব্যবহার হচ্ছে সেন্সর। তবে এত পরিমাণ ফসলের উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সমস্যা হল মাটির পরিমাণ ও গুনাগুণ। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভ্যাগিনিগান ইউনিভার্সিটি মাটির পরিবর্তে কোকো পিট ব্যবহার করে কলা ফলানো হয়েছে। এতে করে মাটির মাধ্যমে ফাঙ্গাসের আক্রমণ রোধ করা সম্ভব হয়েছে। আলুর উৎপাদনের পরিমান যেখানে বিশ্বে একর প্রতি নয় টন, নেদারল্যান্ডে তা একর প্রতি ২০ টন! ভাবা যায়?

কৃষিক্ষেত্রে জড়িত মানব সম্পদের কৃষি কেন্দ্রিক শিক্ষা এবং গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে ডাচরা। সমগ্র বিশ্বে কৃষি শিক্ষার জন্য এক নম্বরে রয়েছে ভ্যাগিনিগান ইউনিভার্সিটি। এছাড়া হেইঞ্জ, ডানোনে সহ প্রায় ১২টি বড় খাদ্যজাত কোম্পানির আর এন্ড ডি রয়েছে নেদারল্যান্ডে। এসব কিছুই নেদারল্যান্ডে কৃষির বিস্তৃতি এবং সম্প্রসারণের অন্যতম কারন।

উন্নত এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য জীব এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। পুরো বিশ্বে শাক সবজির পাশাপাশি মাংসের চাহিদাও বাড়ছে। বিষয়টি মাথায় রেখেই ফেলে দেওয়া খাদ্য থেকেই বছরে প্রায় ৯০ হাজার টন পশু খাদ্য উৎপাদন করছে দেশটির নাইজেন (Nijsen/Granico) কোম্পানি। পাশাপাশি বিভিন্ন ডাচ কৃষি বিশেষজ্ঞ গবাদি পশুর প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য কীটপতঙ্গ বিশেষ করে ঘাস ফড়িং ব্যবহারের বিষয়ে মত দিয়েছেন।

পাশাপাশি প্রোটিনের জন্য প্রাণীর উপর চাপ কমাতে তারা উদ্ভিদ ভিত্তিক প্রোটিনের দিকে নজর দিচ্ছে। ল্যাবে তৈরি পৃথিবীর প্রথম হ্যামবার্গারের জন্মস্থান এই নেদারল্যান্ডেই। তবে যারা এরপরেও প্রাণী মাংসের ব্যাপারে আগ্রহী তাদের ব্যাপারেও গবেষণার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই ডাচরা। বিভিন্ন কোম্পানি প্রাণীর দেহ থেকে কোষ সংগ্রহ করে তার প্রতিলিপি তৈরি করে স্টেক বা মাংস তৈরি করতে  চেষ্টা করছে।

উদ্ভিদভিত্তিক বার্গার; image source: Holland Alumni

 

নেদারল্যান্ডের অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে কৃষি। বার্ষিক জিডিপির প্রায় ৮৩% আসে এই খাত থেকে। নেদারল্যান্ডের রংবেরং এর অসংখ্য ফুলের সুনাম তো সারা পৃথিবীতে ছিলই, নতুন করে যোগ হয়েছে খাদ্য-পণ্যের নাম। ডাচরা সারা পৃথিবীতে খাদ্য-পণ্য ও কৃষি পণ্য সরবরাহ করে থাকে। ভৌগলিক অবস্থানের কারনে রপ্তানির জন্য দেশটি বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।এছাড়াও অবকাঠামো এবং পণ্য পরিবহনের সুবিধার কারনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা বেশ সহজ। আমদানিকারক দেশের মাঝে সবার প্রথমে রয়েছে জার্মানী। ২০১৯ সালে দেশটি নেদারল্যান্ড থেকে প্রায় ২৩.৬ বিলিয়ন ইউরোর সমমূল্যের কৃষিজ দ্রব্য আমদানি করেছে। তালিকায় দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে বেলজিয়াম, ইউকে এবং ফ্রান্স। গেলো বছর কৃষিপণ্য ডাচ অর্থনীতিতে মোট ৯৪.৫ বিলিয়ন ইউরোর অবদান রেখেছে।

ফ্লোটিং ফার্ম; image source: Business Insider

 

ডাচদের এই অবিশ্বাস্য উন্নতি আশা দেখাচ্ছে বিশ্ববাসীকে। যখন সমগ্র বিশ্বে মানুষের আগ্রাসী মনোভাবের জন্য বিপন্ন হচ্ছে জীবজগৎ তখন প্রাচীন কৃষি পদ্ধতির সাথে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে মানুষ আশা দেখতেই-পারে। তবে এখনো অনেকটুকু পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা হতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন। কোন যুদ্ধ বিগ্রহের চেয়ে সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি পৃথিবী-বাসী হতে পারে তা হল ক্ষুধা। সুতরাং আগামী চার দশকে পৃথিবীকে গত ৮ হাজার বছরের তুলনায় অধিক খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। কৃষির উন্নয়ন ও প্রগতি এবং প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার ছাড়া এটি কোন ভাবেই সম্ভব নয়। ডাচ কোম্পানি গুলো তাদের প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং আবিষ্কার শুধুমাত্র নিজেদের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখছে না। ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা বিশ্বে। ২০২০ সালে The Umbrella Company আবুধাবিতে তাদের টমেটোর খামার তৈরি করেছে।

তবে অন্য সব কিছুর মত কৃষিক্ষেত্রে ডাচদের এই অভূতপূর্ব উন্নয়নেরও কিছু সমস্যা আছে। টেকসই এবং উন্নত একটি খাত হওয়া সত্ত্বে কৃষকদের লাভের পরিমাণ (Marginal Profit) খুব একটা বেশি নয়। যার কারনে কৃষকরা অধিক পরিমাণ উৎপাদনের দিকে মনোযোগী। স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সাথে সাথে খাদ্যের স্বাদেরও নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে। যার কারনে অনেক দেশের মানুষের কাছেই ডাচ খাদ্য সামগ্রী খেতে বিস্বাদ লাগে। ডাচ খাদ্যেপণ্যের প্রধান আমদানীকারক জার্মানীর অনেক নাগরিকের মতে ডাচ টমেটো শুধুমাত্র টেনিস খেলারই যোগ্য। কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর ফলে যেমন স্বাস্থ্যকর এবং উন্নত গুণ সম্পন্ন খাদ্যের যোগান সম্ভব হয়েছে সেই সাথে বিপাকে পড়ছেন চাষীরা। কীটের আক্রমণ রোধের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য হাতে না থাকায় আক্রান্ত শস্য ফেলে দিতে হচ্ছে পুরোটাই। যার ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা। কিন্তু তারপরেও সমীক্ষা মতে গ্রিনহাউজ কেন্দ্রিক অঞ্চলের পানি কীটনাশক দাড়া সবচেয়ে বেশি দূষিত।

খাদ্যে বিশ্বকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রক্রিয়ায় নেদারল্যান্ডের এই অগ্রযাত্রায় ডাচরা একা নয়। ৬ টি মহাদেশের ১৪০ টি দেশের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং লক্ষ একটাই-“ক্ষুধা মুক্ত পৃথিবী তৈরি”।

 

This article is about Netherlands who could feed this world and its development in agriculture sector.

1. National Geography 

2.DW media 

3.Dutch Review 

4.World Atlas 

5.The Kingdom of Netherland

6.Invest in Holland 

7.Hort Americas 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...