স্বকীয়তা হারাচ্ছে নিঝুম দ্বীপ?

বন বিভাগ বলছে, গেল এক যুগে যেখানে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক হরিণের বেড়ে ওঠার কথা এই দ্বীপে, সেখানে বর্তমানে হরিণের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও কম। তবে কি এই হরিণ বিলুপ্ত হয়ে নিজের স্বকীয়তাই হারিয়ে বসবে নিঝুম দ্বীপ?

স্বকীয়তা হারাচ্ছে নিঝুম দ্বীপ?

 

নোয়াখালীর নিঝুৃম দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে থাকা এই দ্বীপের প্রধান প্রাণী চিত্রা হরিণ। কিন্তু এই চিত্রা হরিণ সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে এই মুহূর্তে । বন বিভাগ বলছে, গেল এক যুগে যেখানে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক হরিণের বেড়ে ওঠার কথা এই দ্বীপে, সেখানে বর্তমানে হরিণের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও কম। তবে কি এই হরিণ বিলুপ্ত হয়ে নিজের স্বকীয়তাই হারিয়ে বসবে নিঝুম দ্বীপ?

 

নিঝুম দ্বীপের অরণ্যে

একদিকে মেঘনা নদী আর বাকি তিনদিক থেকে বঙ্গোপসাগর ঘিরে রেখেছে অগণিত শ্বাসমূলে ভরা কেওড়া বাগানের এক সবুজ দ্বীপকে। দিনে দুইবার এখানে জোয়ার-ভাটার দেখা মেলে। দ্বীপটির এক পাশ ঢেকে আছে সাদা বালুতে, আর অন্য পাশ সৈকতের জলরাশিতে। শীতকালে যেমন এখানে বসে হাজার পাখির মেলা, তেমনি বছরজুড়ে বন্য কুকুর আর সাপের অভয়ারণ্য এই বনের সবুজ ঘাস চিরে সারা দিন দৌড়ে বেড়ায় চিত্রা হরিণের দল। এমনই সে দ্বীপের নাম ‘ নিঝুম দ্বীপ’।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ ©মতিউর রহমান শাওন

 

নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একটি ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার হাতিয়ায় প্রায় ১৪ হাজার একরের দ্বীপটি ১৯৪০ সালের দিকে জেগে ওঠে। অবশ্য ১৯৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর দ্বীপটিতে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দ্বীপের তখনকার পরিবেশ ছিল সুনসান নিঝুম। সেই থেকে দ্বীপটির নাম হয় নিঝুম দ্বীপ।

বল্লার চর, কামলার চর, চর ওসমান ও চর মুরি নামের প্রধান চারটি দ্বীপ ও ছোট ছোট কয়েকটি চর নিয়ে এ দ্বীপ। উত্তর দক্ষিণে প্রায় নয় কিলোমিটার লম্বা আর পূর্ব পশ্চিমে প্রায় সাত কিলোমিটার চওড়া প্রায় ৯১ বর্গ কিমি. আয়তনের এ দ্বীপে ৯টি গুচ্ছ গ্রাম রয়েছে। নিঝুম দ্বীপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল মাইলের পর মাইল জুড়ে কেওড়া বন আর সেই বনের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিত্রা হরিণ। ২০০১ সালের বাংলাদেশ সরকার পুরো দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ © সুস্মিত দাস গুপ্ত

কী আছে নিঝুম দ্বীপে?

নিঝুম দ্বীপে আছে বিশাল আকারের শ্বাসমূলীয় বন। সত্তরের দশকে এখানে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু।

নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের প্রধান প্রাণী চিত্রা হরিণ। ১৯৭৮ সালে এই বনে সর্বপ্রথম সুন্দরবন থেকে চার জোড়া চিত্রা হরিণ অবমুক্ত করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাদের থেকে বংশ বিস্তার করে এ বনে হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৯৬ সালের এক জরিপ বলছে, এ দ্বীপে প্রায় ২২ হাজার হরিণ ছিল সে সময়। বছর দশেক পর হরিণ শুমারিতে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ হাজারে। পরবর্তী চার বছরে (২০১০ সাল পর্যন্ত) হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ হাজারে দাঁড়ায়। এরপর অবশ্য আর আনুষ্ঠানিক হরিণ গণনা করা হয় নি।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ ©Sadharon Gyan

 

নিঝুম দ্বীপের গহিন অরণ্যে রয়েছে প্রায় সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি, ১৬ প্রজাতির সাপ, ২১ প্রজাতির বনজসম্পদ, ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম, ৮৩ প্রজাতির গুল্ম এবং ২১ প্রজাতির অন্যান্য গাছ।

শীতে নানান রকম অতিথি পাখির দেখা পাওয়া যায় নিঝুম দ্বীপে। এই দ্বীপের অরণ্যে আরও আছে উদ্বিড়াল, মেছো বাঘ, খেকশিয়াল ইত্যাদি। দ্বীপে পাখিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— নিশি বক, কানিবক, গোবক, পানকৌড়ি, ধূসর বক, কাদাখোঁচা, বালিহাঁস, লালপা, নানান জাতের মাছরাঙ্গা ইত্যাদি। পৃথিবী বিপন্ন ইন্ডিয়ান ইস্কিমার বা দেশী গাঙচষারও দেখা মেলে এই দ্বীপে।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ ©শাকিল রেজা

অস্তিত্ব সংকটে নিঝুম দ্বীপ?

আগেই জানিয়েছিলাম, নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ ও অমূল্য সম্পদ হরিণ। তবে নানা কারণে সেখানকার হরিণ বিলীন হওয়ার পথে। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে হরিণের সংখ্যা। মূলত ২০১০ সালের পর থেকেই দিন দিন কমতে থাকে নিঝুম দ্বীপের চিত্রা হরিণ।

২০১৪ সালের এক তথ্য বলছে, সে সময় নিঝুম দ্বীপে হরিণের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। অথচ বছর চারেক আগেও আরও ১০ হাজার বেশি ছিল হরিণ।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ ©শাকিল রেজা

 

বর্তমানে নিঝুম দ্বীপে কী পরিমাণ হরিণ রয়েছে তার কোনও পরিসংখ্যান বনবিভাগের কাছে না থাকলেও এর সংখ্যা ৪-৫ হাজারের বেশি হবে না বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ১৪ হাজার একরের বেশি বনাঞ্চলের মধ্যে যেখানে ৫০০ একর বনও বিদ্যমান নেই, সেখানে হরিণ থাকবে কীভাবে। আর আগের মতো হরিণের দলবেঁধে ছুটোছুটিও দেখা যায় না। এজন্য পর্যটক যারা শুধুমাত্র চিত্রা হরিণ দেখার আশায় এই দ্বীপে যান, তারাও ফিরছেন হতাশ হয়েই।

 

কেন কমছে চিত্রা হরিণের সংখ্যা? 

বিশ্বজুড়েই জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে উপকূলীয় নদীগুলোতে লবণ পানির পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মিঠা পানির অভাবে বিপন্ন হতে চলেছে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে নিঝুম দ্বীপের চিত্রা হরিণ। শুধু যে হরিণই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এমন নয়, পাশাপাশি দ্বীপের অন্যান্য প্রাণিকুলও হুমকির মধ্যে রয়েছে।

খাদ্যসংকট, লবণাক্ত পানি প্রবেশ, ঝড় জলোচ্ছ্বাস, আবাসন সংকুচিত হওয়া, বন্য কুকুরের আক্রমণ, মিঠা পানির অভাব ও বনবিভাগের অবহেলা প্রাণীদের জন্য বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে এই দ্বীপকে। এরই মধ্যে দ্বীপের প্রায় ৪০ হাজার হরিণের মধ্যে ৩৫ হাজারই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

নিঝুম-দ্বীপ
নিঝুম দ্বীপ © নেহার সারওয়ার অয়ন

 

দ্বীপের চারদিকে বেড়িবাঁধ না থাকায় চরে অনায়াসে লবণ পানি ঢুকে পড়ছে। হরিণের জন্য পান উপযোগী মিঠাপানির পুকুর না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার করতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জোয়ারের সঙ্গে ভেসে যাওয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে দ্বীপের বনাঞ্চলে সাধারণ মানুষের আশ্রয় নেওয়া হরিণ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ বলে মত দিয়েছেন স্হানীয়রা।

সাম্প্রতিক সময়ে শিকারীদের দৌরাত্মও বিলুপ্তির সংকটে ফেলেছে এই দ্বীপের ঐতিহ্য বহন করা চিত্রা হরিণকে। নিঝুম দ্বীপের কয়েকটি চরে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দল বেঁধে হরিণের পালকে খাদ্যের অন্বেষণে বিচরণ করতে দেখা যায়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিকারিরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আবার খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে যাওয়া শত শত হরিণ ধরা পড়ছে শিকারিদের হাতে।

আরও পড়ুন: বাঁচানো যাবে না পৃথিবীর ফুসফুসকে?

খাদ্য, বাসস্হান এবং পারিপার্শ্বিক নানান কারণ হরিণ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যে হিমশিম খাচ্ছে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বন বিভাগের দেয়া তথ্যে।

বন বিভাগ সূত্রে বলা হচ্ছে, নিঝুম দ্বীপের একটি মা হরিণ বছরে দু’বার কমপক্ষে দু’টি করে মোট চারটি বাচ্চা দেয়। নিঝুম দ্বীপে এক সময় প্রায় ১৫ হাজারের মতো মা হরিণ ছিল। এই হিসাবে প্রতিবছর ৬০ হাজারের মতো বাচ্চা জন্মানোর কথা। এর এক-তৃতীয়াংশ বেঁচে থাকলেও বছরে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ২০ হাজার হরিণ।

অর্থাৎ গত ১৩ বছরে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি হরিণ হওয়ার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে হরিণের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এমন চলতে থাকলে এই দ্বীপের প্রধান এই প্রাণী বিলুপ্ত হতে সময় লাগবে না। একইসাথে নিজের স্বকীয়তাও হারিয়ে ফেলবে নিঝুম দ্বীপ।


This is a Bengali Article about Chitra deer which are almost extinct on Nijhum Island. Necessary sources are hyperlinked within the article.

Feature Image : observer bd

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...