নারী, ঘুরে দাঁড়াও, আওয়াজ তোলো (ভিডিও)

নারী দিবসের বিশেষ আয়োজন।

 

গণপরিবহণে যৌন হয়রানি

ঘটনাঃ

বাসে উঠেছি, প্রচন্ড ভীড়! ফাঁকা সীট নেই। আমার শরীর ঘেঁষে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে মধ্য বয়স্ক একটা লোক। ঢাকার লোকাল বাসে এটা কমন চিত্র। সেদিনও কমনই থাকতো যদি না শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতো! কখনো আমি এইদিনটা ভুলতে পারি না। লোকটা আমার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে, আমাকে তার আয়ত্বে নিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়। আমার কোমড়ে নানান অজুহাতে স্পর্শ করার চেষ্টা করছিল। কখনো ব্রেকডাউনে, কখনো কারো যাত্রীদের ধাক্কার অজুহাতে; সেই সাথে কানের কাছে সেক্সুয়াল শব্দ উচ্চারণ করতে দ্বিধা করেনি। ভীড়েই যেন ওই নোংরা লোকটা আমার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেছে। আমার কাছে এটা কতটুকু অস্বস্তির ছিল বলে বোঝানো হয়তো সম্ভব নয়। যারা ফেইস করেছেন তারাই বুঝবে এটার মানসিক যন্ত্রণা কতটা তীব্র, কতটা পীড়াদায়ক! এটা ঢাকা শহরের নিয়মিত চিত্র। প্রতিটি মেয়ে এর ভুক্তভোগী।  

নারী-ঘুরে-দাঁড়াও-আওয়াজ-তো
থামছেই না গণ পরিবহণে নারীদের যৌন হয়রানি; image: somoytv

প্রতিক্রিয়াঃ

আমি চুপ থাকিনি, আওয়াজ তুলেছি। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়েছি, আমি সরাসরি লোকটার কলারে ধরে কন্ডাক্টরকে বাস থামাতে বলি। আমার পাশে দাঁড়ায় বাসে থাকা আরো কয়েকজন যাত্রী। হয়তো কেউ কেউ লক্ষ্যও করছিলো নোংরা জঘন্য কাজটা। সবার সহযোগিতায় ৯৯৯ এ কল করে তৎক্ষণাৎ ওই বর্বর লোকটাকে পুলিশে দিই। সেদিন আমি চুপ থাকলে এটার মানসিক ট্রমা হয়তো সারাজীবন আমার ভোগ করতে হতো, নিজেকে ছোট মনে হতো, অপরাধী লাগতো। সেদিন আমি ভয়ে মুচড়ে গেলে এই লোকটা আরো সহস্র বোনের উপর ঝাপিয়ে পড়ত। তাই নীরবতা ভেঙে আওয়াজ তুলুন।

 

অনলাইনে যৌন হয়রানি

ঘটনাঃ

কখনো দেখা গেলো গ্যালারি থেকে নিজের সবচেয়ে পছন্দের ছবিটি ফেইসবুকে আপলোড করলাম। কিন্তু এমন কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের কমেন্ট ছুড়ে আসে যেগুলো আসলে মোকাবেলা করার মতো রুচি থাকে না। আপনি যতই শালীন হয়ে ছবি দেন না কেন তারা সেখানে ঐ যে হট হট ব্যাপারটা সেটা খুঁজবেই। কখনো উড়না নিয়ে, কখনো জামা ফিটিংস নিয়ে, কখনো বা শারীরিক গঠন নিয়ে; প্রায়ই শিকার হয়ে সাইবার বুলিংয়ের। ম্যাসেঞ্জারে অনেক আজে বাজে টেক্সট পাই৷  হঠাৎ একদিন একটা পর্ণ চ্যাট গ্রুপে আমাকে কেউ একজন অ্যাড করে দেয়। আমি ইনবক্সে এটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। নানান উত্যক্তকর ম্যাসেজ আসতে থাকে, সানি লিওন-মিয়া খলিফা বা ঐ টাইপ পর্ণ গ্রাফি দিয়ে সিগন্যাল দিচ্ছিল। যতবার লিভ নেওয়া যায় ততবার অ্যাড দেয়। শুধু আমিই এর ভুক্তভুগি না, আরও ১০০+ মেয়েকে এড করে সেই গ্রুপে। 

নারী-ঘুরে-দাঁড়াও-আওয়াজ-তো
৬০% নারী নানানভাবে অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছে; image: sarabangla

প্রতিক্রিয়াঃ

এভাবে দুদিন চলে। তারপর আমি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এবিষয়ে আইনি সাহায্য চাই। সেখানেও আমাকে শুনতে হয়েছে -“কী দরকার এসব নিয়ে কথা বলার, লীভ নিলেই পারেন। ব্লক দিয়ে দেন, অনলাইনে এসব একটু আধটু হয়ই।” 

না ব্যাপারটা একটু আধটু নয় এটা। আমি থেমে গেলে এদের নোংরা মজা নেওয়া হয়তো অন্য কোনো মেয়ের উপর হলেও চলবে। আমি সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানাই। অতঃপর সেই ছেলেগুলো আমার কাছে মাফ চায়। আর কখনো সেসব করবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়৷

 

কর্মস্থলে  নারীর যৌন হয়রানি

ঘটনাঃ

আমি জব করছি একটি কোম্পানিতে। প্রায়ই প্রজেক্টের কাজে এমপ্লয়ি আর হাইয়া লেভেলের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে হয়। আমি কাজের প্রতি খুবই ডেডিকেটেড। যার কারণে হাইয়ার লেভেলের কাজগুলো আমাকেই করতে হয়। কিন্তু যতবার আমি বসের কেবিনে যাই বা বের হই ততবার আমার দিকে কিছু খুঁচা মেরে কথা, কখনো বা একে অপরের ইশারা হজম করতে হয়। এমনকি আমার সহকর্মীদের দ্বারা আমার ফিগার নিয়ে কথাও আমার কানে এসেছে। আমি কেন শাড়ি পড়ি, আমি কেন সাজগোজ করি, আমার কেন দ্রুত প্রমোশন হচ্ছে তাদের হয় না; এমন নানান কথার তীর পুরো দিনটাই কখনো কখনো নষ্ট করে দেয়। মাঝেমধ্যে হতাশ হই- কাজের প্রতি আমার ডেডিকেশন অপরাধ নাকি মেয়ে হয়ে চাকরি করতে আসাটাই অপরাধ !

নারী-ঘুরে-দাঁড়াও-আওয়াজ-তো
কর্মস্থলেও হয়রানির শিকার নারীরা; image: universal24news

প্রতিক্রিয়াঃ

ভেবেছিলাম চাকরিটা ছেড়ে দিব। কিন্তু পরে ভাবলাম না সমস্যা তো আমার না, সমস্যা তাদের যারা বিকৃত মানসিকতা নিয়ে চাকরি করতে এসেছে। আমি হ্যারাসমেন্ট সেলে অভিযোগ দিই।  

আরো দেখুন : এক বীরাঙ্গনার গল্প

 

রাস্তাঘাটে নারীর যৌন হয়রানি

ঘটনাঃ

বাসা বের হলেই প্রতিটা মুহুর্তে আমার ভাবতে হয় আমি সেইফভাবে বাড়ি ফিরতে পারবো তো! বাসার গেইট পার হয়ে কিছুটা আগালেই ১/২টা চা-স্টলের দোকান চোখে পড়ে। এইদিকটায় যখন হেঁটে যাই চা-স্টলে বসে থাকা লোকগুলো যেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত গিলে খাবার উপক্রম হয়। এদের দিকে তাকাতে পর্যন্ত ঘেন্না লাগে। এমনকি রিকশায় উঠলেও অজানা একটা ভয় চেপে ধরে; প্রায়ই দেখা যায় তাদের কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি। এমনও হয়েছ আমি যে রিকশায় উঠি সেই রিকশাওয়ালা মামাই বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে। নিজেকে সবচেয়ে অসহায় মনে হতো রাস্তাঘাটে। খুব সকাল বেলা একদিন প্রাইভেট থেকে ফিরছি একটা নেশাখুর টাইপ লোক আমার পিছু নেয়। পিছিনে আসা এটাই প্রথমবার ছিল না। প্রতিনিয়তই এগুলো হজম করতে হত। কিন্তু সেদিন খুব নিরব ছিল রাস্তা। লোকটি আমার একদম কাছে চলে আসে। নানান মন্তব্য করতে থাকে। আমি আসে পাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই হেল্প করার মত। আমার দিশেহারা অবস্থা। 

নারী-ঘুরে-দাঁড়াও-আওয়াজ-তো
রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানি রোধে আওয়াজ তুলুন সাথেসাথে; image: ekusheytv

প্রতিক্রিয়াঃ

কী ভেবে যেন আমি যায়গায় দাঁড়িয়ে যাই। কোনো কিছু না ভেবেই আমি পিছন ফিরে একটা চড় বসিয়ে দিই, লোকটাকে ধরার চেষ্টা করি এবং জোরে চিৎকার করে কথা বলতে থাকি। আমার চিৎকার শুনে আশেপাশের বাসা থেকে লোকজন বেরিয়ে আসে। লোকটি দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যায়। এরপর আর কখনো এই লোকটি হয়রানি করার সাহস পায়নি। আমার সামনে আরো পড়েছে কিন্তু আমাকে দেখলে লুকিয়ে যায়। কখনো আবার অন্য পথে চলে যায়। আমি সেদিন দাঁড়িয়ে আওয়াজ না তুললে হইত অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত আমার যা সারাজীবন বয়ে যেতে হয়। এসবে অনেকে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং আওয়াজ তুলুন।

আরো পড়ুন : যৌনকর্মী থেকে বিশ্ব সেরা নারী

 

তুমি নারী, তুমি মা, তুমি বোন, তুমি স্ত্রী, তুমি মানুষ; তুমি সমাজের দুর্বলতা নও, তুমি সমাজের অর্ধেক শক্তি, অর্ধেক অনুপ্রেরণা। যেখানেই অন্যায়, যেখানে হয়রানি; ঘুরে দাঁড়াও তুমি, রুখে দাও, আওয়াজ তোলো


 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...