নদ ও নদীর মধ্যে পার্থক্য আসলে কী?

ব্রহ্মপুত্রের কি শাখা নেই? শীতলক্ষ্যা, যমুনা এইগুলো তাহলে কোন নদীর শাখা? শীতলক্ষ্যা, যমুনা যদি ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হয় তাহলে সংজ্ঞানুসারে ‘ব্রহ্মপুত্র’ তো নদী হবার কথা, একে আমরা নদ বলি কেন?

Image Source : bangladesh- Tumblr

নদ ও নদীর মধ্যে পার্থক্য আসলে কী?

 

 

আমাদের বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই দেখা মিলবে উল্লেখযোগ্য ও তাৎর্যপূর্ণ নদ নদীর। আমরা আমাদের দেশে অবস্থিত বিভিন্ন নদ নদীর নাম জানলেও একটি বিশেষ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ লোকেরই কোন ধারণাই নেই। আমাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আমরা কিছু কিছু নদীকে নদী ডাকি কিন্তু অন্যান্যগুলোকে নদ ডাকি কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সিংহভাগ লোক বলবেন, “নদীকে নদী ডাকা হয় কারণ এর শাখা আছে, আর নদের কোন শাখা নেই”।  

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” এর মতে বাংলাদেশে বর্তমানে নদ নদীর সংখ্যা ৪০৫ টি। তবে বিভিন্ন জায়গায় এর বিভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা রয়েছে, যেমন- বাংলাপিডিয়ার মতে ৭০০ টি, উইকিপিডিয়া বলছে ৮০০ টি, আর প্রচলিত তথ্য মতে এই সংখ্যা ২৩০ টি। যার আয়তন দাঁড়ায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার। পাউবো এর নির্ধারিত ৪০৫ টির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি,  উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি, হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রচলিত তথ্য মতে বাংলাদেশের ২৩০ টি নদ নদীর ৫৭ টি আন্তর্জাতিক যার ৫৪ টির উৎপত্তি ভারতে এবং ৩ টি মায়ানমারে। 

নদ-নদী
বাংলাদেশের নদ ও নদী। Image Source : Banglapedia

 

নদীর শাখা আছে আর নদের শাখা নেই, এই উত্তরের সাথে আমরা অল্প বিস্তর সবাই পরিচিত এবং আরও মজার ব্যাপার এই যে এই উত্তরটিকে সঠিক মনে করে আমরা দিনের পর দিন এই ধারণাটি নিয়েই বসবাস করে আসছি। আর আশেপাশের কারো কখনো এই উত্তর নিয়ে কোন মাথাব্যথাও দেখিনি৷ সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো স্বয়ং উইকিপিডিয়াও এই উত্তরটি’ই দেয়৷ উইকিপিডিয়ার মতে, “যে জলস্রোত কোনো পর্বত, হ্রদ, প্রস্রবণ ইত্যাদি জলাধার হতে উৎপন্ন ও বিভিন্ন জনপদের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্য কোন জলাশয়ে পতিত হয়, তাকে নদী বলে। যেমন: মেঘনা, যমুনা, কুশিয়ারা ইত্যাদি। যখন কোন নদী হতে কোন শাখা নদীর সৃষ্টি হয়না, তখন তাকে বলা হয় নদ। যেমনঃ কপোতাক্ষ, ব্রহ্মপুত্র, নীল নদ ইত্যাদি নদ । সুরমা, গঙ্গা, বুড়িগঙ্গা ইত্যাদি নদী।”

নদ-নদী
পদ্মা নদী। Image Source : Pinterest

 

এখন এই উত্তরের পাশাপাশি হাঁটছে কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন। যেমন- ব্রহ্মপুত্রের কি শাখা নেই? শীতলক্ষ্যা, যমুনা এইগুলো তাহলে কোন নদীর শাখা? শীতলক্ষ্যা, যমুনা যদি ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হয় তাহলে সংজ্ঞানুসারে ‘ব্রহ্মপুত্র’ তো নদী হবার কথা, একে আমরা নদ বলি কেন? এই প্রশ্নগুলো যদি আপনি কোন মুরুব্বি বা জ্ঞানী লোককেও জিজ্ঞেস করেন, তবুও আপনার তার কাছ থেকে বকা খাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু জটিল এই প্রশ্নের উত্তর মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বর্তমান অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক বিশ্বজিৎ ঘোষের কাছ থেকে। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে নদ ও নদীর নাম করণের বিষয়ে আলোচনা করেন। 

নদ-নদী
ব্রহ্মপুত্র নদী। Image Source : Dhaka Tribune

অনেক অনেক বছর ধরে চলে আসা চিরাচরিত এই অপ্রাসঙ্গিক উত্তরটির সঠিক সংজ্ঞায় তিনি বলেন- নদ ও নদীর সাথে শাখা থাকা বা না থাকার কোন সম্পর্ক নেই। এই দুয়ের মাঝে যা পার্থক্য আছে তা হল ব্যাকরণগত। উত্তরটি আরও গুছিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়- বাংলা, হিন্দি, ফারসি ইত্যাদি ভাষার ক্ষেত্রে, পুরুষবাচক শব্দ সাধারণত অ-কারান্ত এবং নারীবাচক শব্দ আ-কারান্ত বা ই/ঈ-কারান্ত হয়। যেমন: রহিম (অ-কারান্ত)-রহিমা (আ-কারান্ত, নামের শেষে আ আছে), রজক (অ-কারান্ত)-রজকী (ঈ-কারান্ত, নামের শেষে ঈ) তেমনিভাবে, ফুল-ফুলি, কুমার-কুমারী, নদ-নদী ইত্যাদি।

আরও পড়ুন : ধানক্ষেতে মাছ চাষ করে হচ্ছে বাড়তি আয়

 

তাই যে সকল ‘নদীর’ নাম পুরুষবাচক অর্থাৎ অ ও উ -কারান্ত তারা ‘নদ’ আর যে সকল ‘নদীর’ নাম নারীবাচক অর্থাৎ আ-কারান্ত বা ঈ/ই-কারান্ত তারা ‘নদী’। যেমন: কপোতাক্ষ, ব্রহ্মপুত্র, নীল, দামোদর, শংখ, আমাজন, সবই নদের নাম। অন্যদিকে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ভলগা, আত্রাই, ইছামতি, মধুমতি, ভাগিরথী সবই নদীর নাম।

 

নদ-নদী
মেঘনা নদী। Image Source : River in Bangladesh

এই কারণে ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী থাকলেও এটি নদ। আর ঠিক একই কারণে নীল ‘নদী’ নয় ‘নদ’। অনেকে আমাজন নদী বললেও উপরে উল্লিখিত কারণে তা হবে নদ। তাই এখন থেকে যে নদীর নাম অ ও উ -কারান্ত দেখবেন, নিশ্চিন্তে তাকে ‘নদ’ বলুন , আর যেখানে আ,ই ও ঈ -কারান্ত দেখবেন নিশ্চিন্তে সেগুলোকে বলুন ‘নদী’। 

 


This is a Bengali language article on Rivers of Bangladesh.

Reference taken from multiple sources including Quora, ProthomAlo and Facebook.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...