দক্ষিণ আমেরিকা: পলাতক নাৎসিদের স্বর্গ

বিশাল সংখ্যক নাৎসি সদস্য প্রতিপক্ষের আক্রমণ এবং ট্রায়ালের মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে আর্জেন্টিনায় পালায়।

দক্ষিণ আমেরিকা: পলাতক নাৎসিদের স্বর্গ

১১ মে,১৯৬০। বাস থেকে নেমে বাড়ির পথে হাটা শুরু করলেন রিকার্ডো ক্লেমেন্ট। পেশায় তিনি একজন ফোরম্যান। চাকরি করেন মার্সিডিজ বেঞ্জ অটোমেটিভ ফ্যাক্টরিতে। আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সের শহরতলীতে ছোট্ট এক বাড়িতে থাকেন ক্লেমেন্ট।বাস থেকে নামার সাথে সাথে শুরু হল ঠাণ্ডা বাতাসের দাপট। পথের পাশে এক লিমুজিনের পাশে দুজন লোক মাথা নিচু কাজ করছে। পাশ কাটিয়ে যাওয়া মাত্রই লোক দুজন হামলে পড়ে ক্লেমেন্টের উপর। টেনে হিঁচড়ে ছুড়ে মারে গাড়ির পেছনের সিটে। মাত্র কয়েক মিনিটের মাঝেই গাড়ি হাওয়া হয়ে যায় বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায়।

রিকার্ডো ক্লেমেন্টের আসল নাম এডলফ আইখম্যান।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নাৎসি কর্নেল অসংখ্য ইউরোপিয়ান ইহুদী হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী। তার দুই অপহরণকারী ইসরায়েল সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট অর্থাৎ মোসাদ।

এডলফ আইখম্যান; image source: Bavarian State Library

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইখম্যানের মত অসংখ্য নাৎসি সদস্য নুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে বাঁচতে লাতিন আমেরিকায় পালিয়ে আসে।২০১২ সালের এক তথ্য মতে, প্রায় ৯০০০ সংখ্যক নাৎসি সদস্য লাতিন আমেরিকায় পাড়ি জমায়। এর মাঝে ব্রাজিলে দেড় থেকে দুই হাজার, চিলিতে ৫০০ থেকে ১০০০ এবং আর্জেন্টিনায় প্রায় ৫০০০ নাৎসি সদস্য আত্মগোপন করেন।

আরও পড়ুন: মস্কো ইন দ্য লেভান্ট: রাশিয়া কেন সিরীয় গৃহযুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে?

বিশাল সংখ্যক নাৎসি সদস্য প্রতিপক্ষের আক্রমণ এবং ট্রায়ালের মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে আর্জেন্টিনায় পালায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন আর্জেন্টিনা অক্ষ শক্তির দেশ অর্থাৎ ইতালি,জার্মানির সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে ।এর পেছনে অবশ্য কারনও রয়েছে। প্রথমত, আর্জেন্টিনার বেশির ভাগ নাগরিক ইতালি, স্প্যানিশ এবং জার্মান বংশোদ্ভূত। তাই স্বাভাবিক ভাবে নাগরিকদের অক্ষ শক্তির দেশ গুলোর প্রতি সহমর্মিতা ছিল। দ্বিতীয়ত সেসময়কার আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরান ছিলেন নাৎসির একনিষ্ঠ সমর্থক।এছাড়াও ৩০ এর দশকে তিনি ইতালির বেনিতো মুসলিনীর সামরিক এটাশে হিসেবে দায়িত্ব-রত ছিলেন।

 হুয়ান পেরান; image source: Britannica

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হুয়ান পেরান তার কূটনীতিক এবং গোয়েন্দাদের ইউরোপ থেকে নাৎসি সদস্যদের স্পেনের পোর্ট দিয়ে বের করে লাতিন আমেরিকায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। আর্জেন্টিনায় নাৎসিদের আশ্রয় প্রদানের পেছনে আদর্শিক ভাবে সমমনা হওয়া ছাড়াও আরও কিছু কারণ ছিল।প্রচুর অর্থবিত্তশীল জার্মান বংশোদ্ভূত আর্জেন্টাইন ব্যবসায়ী পরিচিত নাৎসি অফিসারদের আর্জেন্টিনায় পালিয়ে আনার ব্যাপারে অর্থ ব্যয়ে আগ্রহী ছিলেন। এছাড়া অনেক নাৎসি অফিসাররা যুদ্ধ-চলাকালীন ইহুদী এবং সার্বিয়ানদের হত্যা করে তাদের অর্থ এবং সোনা আর্জেন্টিনায় পাচার করে দেয়। ১৯৪৩ সালে যুদ্ধের ফলাফল আঁচ করতে পেরে অনেকে দামী পেইন্টিং,সোনা,অর্থ এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকায় পাচার করে । এদিক থেকে হুয়ান পেরান সরকার আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়।

বিশ্বে আধিপত্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে  স্নায়ু যুদ্ধ  শুরু হয়।এক্ষেত্রে উভয়ই দেশই নাৎসি বিজ্ঞানীদের নিজেদের কাজে লাগায়।উদাহরণ হিসেবে “অপারেশন পেপার ক্লিপ” এর কথা বলা যেতে পারে যেখানে ইউ এস  সরকার যত বেশি সম্ভব নাৎসি গবেষকদের কাজে লাগাতে চেয়েছে।  আর্থিক দিক ছাড়াও হুয়ান পেরান পালিয়ে আসা এসব  কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সামরিক ভাবে লাভবান হওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন।

১৯৪৫ সাল নাগাদ পুরো বিশ্ব এই ব্যাপারে মোটামুটি সন্দিহান হয়ে গিয়েছিল যে ১৯৪৮ সালের মাঝেই দুই নতুন সুপার পাওয়ার প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউ এস এ এর মাঝে আরেকটি বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হতে পারে। অতি অল্প সময়ের মাঝে দুইটি বিশ্বযুদ্ধের চাপে সকলেই ছিল ক্লান্ত। ইউ এস এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যতীত অন্য যেকোনো দেশের বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশ গুলোর ন্যুনতম সমর্থন ঘুরিয়ে দিতে পারে যুদ্ধের গতি। এ বিষয় মাথায় রেখেই আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় শক্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতেই হুয়ান পেরান সামরিক ক্ষেত্রে নাৎসিদের কাজে লাগাতে চান।

অন্যদিকে যুদ্ধের পর অনেক নাৎসি অফিসারকে ব্রিটেন এবং আমেরিকা কমিউনিস্ট প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিতে পছন্দ করে নি। যার কারনে নাৎসিদের “র‍্যাট লাইন” দিয়ে আর্জেন্টিনা বা দক্ষিণ আমেরিকা পালানোর পথটি দেখেও উপেক্ষা করে যায়। যুদ্ধ অপরাধী নাৎসিদের নিরাপদে ইউরোপ থেকে বের করে আনার জন্য এসব র‍্যাট লাইন ব্যবহার করা হয়।অনেক ক্ষেত্রে রেড ক্রসের পাসপোর্ট ব্যবহার করে তারা আটলান্টিক পাড়ি দেয়।

১৯৪৬ সালে হুয়ান সরকার কার্ডিনাল এন্টোনিও ক্যাগানিও কে ফ্রান্সে পাঠায়। তার মাধ্যমে সরকার খবর পাঠায় যেসব নাৎসি অফিসাররা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এবং খুব শীঘ্রই যারা বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে,তাদের আর্জেন্টিনা সরকার নিজেদের দেশে আশ্রয় দিতে আগ্রহী। সেই বছরেরই বসন্তে প্রচুর পরিমাণ নাৎসি আর্জেন্টাইন টুরিস্ট ভিসা নিয়ে ইউরোপ ছাড়ে।

যদিও বেশির ভাগ নাৎসিরা আত্মগোপনে ছিল তবুও আর্জেন্টিনা বা লাতিন আমেরিকায় নাৎসিদের পরিণতি খুব একটা সুখকর হয় নি। ১৯৫৫ সালের হুয়ান পেরান সরকারের পতনের পর অবস্থার পরিবর্তন  হতে থাকে। বেশির ভাগ পরিচিত নাৎসি বিভিন্ন সিক্রেট সার্ভিস অপহরণ কিংবা গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য ইউরোপ এবং ইসরায়েল পাঠায়। এর মাঝে মোসাদ ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। ১৯৬০ সালে তারা ইহুদী গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি  করতে এডলফ আইখম্যানকে ইসরায়েলে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়।

 

“লিয়নের কসাই ” হিসেবে পরিচিত ক্লাউস বারবেই ছিল আইখম্যানের মতই একজন নাৎসি অফিসার।  বারবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লিয়নে ইহুদী গণহত্যা এবং ফরাসী বিপ্লবীদের হত্যার জন্য ছিল বিখ্যাত। যুদ্ধ পরবর্তী  সময়ে বলিভিয়ার মার্ক্স বাদীদের দমনের লক্ষে ইউ এস বারবেইকে বলিভিয়ায় অপহরণ করে নেয় যেখানে রাজনৈতিক  প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের ব্যাপারে সামরিক সরকারকে সহায়তা করে। তবে ১৯৮৩ সালে সালে তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি  করা হয়। বিচারে দোষী প্রমাণিত  হওয়ায় যাবজ্জীবন  কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়।

 

১৯৯০ সাল নাগাদ আর্জেন্টিনায় বসবাসকারী  নাৎসি যুদ্ধাপরাধীরা সেই দেশবাসীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।এদের মাঝে ডিনকো সাকিচ, এরিখ প্রিবিক এদের গ্রেপ্তার করে ক্রোয়েশিয়া এবং ইতালিতে পাঠানো হয় যেখানে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

তবে এ কথাও সত্য যে অনেক নাৎসি যুদ্ধপরাধী যারা দক্ষিণ আমেরিকায় পালিয়ে গিয়েছিল তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যায় নি। বিশেষ করে এস এস রাউফ, এডুয়ার্ড রখম্যান,গুস্তাভ ভার্নার এদের নাম উল্লেখযোগ্য। রাউফ মোবাইল গ্যাস চেম্বারের মাধ্যমে প্রায় ১ লক্ষ লোককে হত্যা করে। রাউফ ১৯৮৪ সালে চিলিতে মারা যায়।প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে গুস্তাভ ভার্নারকে ব্রাজিল সরকার জার্মানির হাতে হস্তান্তরিত  করতে অপরাগতা প্রকাশ করে।

তবে দক্ষিণ আমেরিকায় পালানো এস এস অফিসারদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিলও “এঞ্জেল অব ডেথ ” নামে খ্যাত  ড. জোসেফ ম্যাংগেলে।চিকিৎসা ক্ষেত্রে আবিষ্কারের লক্ষে ইহুদী বন্দিদের শরীরে পেট্রোল থেকে ক্লোরোফর্ম সব কিছুই প্রবেশ করানো হয়। এবং স্বয়ং ম্যাংগেলে এই কাজের নির্দেশ দেয় ।পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ব্রাজিলে হৃদরোগে মারা যায় ম্যাংগেলে।

 ড. জোসেফ ম্যাংগেলে; image source: BBC;

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণ আমেরিকায় পলাতক এস এস অফিসারদের প্রভাব পড়েছে দেশ গুলোর রাজনৈতিক,সামাজিক এবং অপরাধ ক্ষেত্রে। প্রাক্তন নাৎসি সৈনিক স্যাফার চিলিতে ১৯৬১ সালে “ডিগনিডাড কলোনি”গঠন করেন। ১৩৭ বর্গ কিলোমিটার বিশিষ্ট এই কলোনিতে প্রায় ৩০০ নাৎসি এবং চিলির নাগরিক বসবাস করতো যাদের বিরুদ্ধে  শিশু নির্যাতন এবং বল পূর্বক পরিবার থেকে শিশু বিচ্ছিন্নকরণর মত মারাত্মক অপরাধের অভিযোগ ওঠে। এরই ফল স্বরূপ ২০০৫ সালে স্যাফারকে আর্জেন্টিনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়াও পরবর্তী সময়ে কয়েকজন প্রাক্তন নাৎসি অফিসার ব্যবসায়ী ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন। দক্ষিণ আমেরিকার প্রচুর বিত্ত-শীল পরিবার নাৎসিদের প্রতি ছিল সহানুভূতিশীল। 

ডিগনিডাড কলোনি; image source: BBC

তীব্র জাতিভেদ প্রথা, অত্যাচার এবং হত্যা- এসবই ছিল নাৎসিদের পরিচয় বাহক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তির কাছে পরাজয়ের পরেও যুদ্ধপরাধী অনেক নাৎসিদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয় নি। এর দায় সমান ভাবে নিজেদের স্বার্থের জন্য পলাতক এবং অপহৃত নাৎসি অফিসারদের কাজে লাগানো দেশগুলোর উপর সমানভাবে বর্তায়।

 This article is about the Nazis in Latin America after the Second World War.

1.      History 

2.      Thought Co.

3.      History Extra

4.      Britannica

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...