খুনে পরিচারিকা : এক রহস্য (ভিডিও)

স্বভাবে চুপচাপ এবং বিচ্ছিন্ন হলেও ভালো পরিচারিকা বলতে যা বোঝায় ক্রিস্টিন এবং লিয়া পাপিন নামের দুই বোন ছিল ঠিক তাই।

খুনে পরিচারিকা : এক রহস্য  (ভিডিও) 

 

স্বভাবে চুপচাপ এবং বিচ্ছিন্ন হলেও ভালো পরিচারিকা বলতে যা বোঝায় ক্রিস্টিন এবং লিয়া পাপিন নামের দুই বোন ছিল ঠিক তাই। দুজনই বেশ শান্ত শিষ্ট, কাজে কর্মে পারদর্শী, নির্ভেজাল। প্রতি রবিবার চার্চে যাওয়া ছাড়া অবসর সময়ে বাইরে আর কোথাও যেত না তারা, ঘটত না প্রেমিকদের আনাগোনাও। কিন্তু তারা কেন খুনে পরিচারিকা হয়ে উঠলো?

 

মালিক মশিউর লান্সেলিন এবং তার পরিবার বেশ পছন্দ করতেন তাদের। ভালো খাবার আর থাকার পরিবেশ আর বাড়তি আদর- সমাদরে দিনকাল ভালোই কেটে যাচ্ছিল। বাড়ির মালকিনকে তারা ডাকত মা বলে। ভদ্রমহিলা এমনিতে তাদের খুব পছন্দ করলেও স্বভাবে বেশ রগচটা ছিলেন। যখন তখন রেগেমেগে গায়ে হাত তোলার বাতিক ছিল তার। 

 

এমনই একদিন ঘর ঝাঁট দেওয়ার সময় মাদাম লান্সেলিন লিয়ার কান চেপে ধরে তাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন এবং ঝাঁট দেওয়ার সময় চোখ এড়িয়ে যাওয়া এক টুকরো কাগজ তুলতে নির্দেশ দেন। সন্ধ্যার সময় দুই বোন যখন কাজ শেষ করে নিজেদের ঘরে ফিরে যায় তখন লিয়া কেবল তার বোনকে বলে, মাদাম যদি এর পর আর কোনদিন এই ধরণের আচরণ করে তখন সে তার পাল্টা জবাব দেবে। 

 

১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ। মাদাম ল্যান্সেলিন তার মেয়েকে সাথে নিয়ে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। বাড়ির কর্তা তখন প্রতিদিনের মতই কাজের প্রয়োজনে বাইরে ছিলেন। লিয়া একটা ত্রুটিযুক্ত আয়রন বাড়ির ইলেক্ট্রিক লাইনের সাথে যুক্ত করায় সেদিনের ইলেক্ট্রিসিটি পাওয়ার বেশ কমে গিয়েছিল। তাই গোটা বাড়ি অন্ধকার হয়ে ছিল। সন্ধ্যার দিকে মাদাম আর তার মেয়ে বাড়ি ফিরে এলে বিদ্যুতের এই অবস্থা দেখে বেশ রেগে যান। উত্তপ্ত পরিস্থিতির এক পর্যায়ে ক্রিস্টিন একটা দস্তার জগ দিয়ে মালকিনের মাথায় আঘাত করে বসে। মাদাম ল্যান্সেলিনের মেয়ে মা কে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, এইদিকে লিয়াও এগিয়ে যায় বোনকে সহায়তা করতে।

খুনে-পরিচারিকা
খুনে পরিচারিকা

 

ক্রিস্টিন এক পর্যায়ে লিয়াকে নির্দেশ দেয় মহিলার মাথাটাকে মাটির সাথে আঘাত করতে আর তার চোখ উপড়ে নিতে। লিয়া সেটাই করে। একই পরিণতির শিকার হতে হয় তার মেয়েকেও। দুইজন যখন অসহায় এবং হতবুদ্ধি হয়ে মাটিতে পড়ে ছিল দুই বোন তাদের কাজ শেষ করার জন্য কয়েকটা অস্ত্র খুঁজে আনে। দুইজন মিলে একটা হাতুড়ি এবং ছুরি দিয়ে অসংখ্যবার তাদের নির্দয়ভাবে আঘাত এবং হত্যা করে। তবে কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় নি তারা। বরং দুটো মৃতদেহকে রান্না করার উপযুক্ত করে তৈরী করে তারা। ক্রিস্টিনের ভালো রাঁধুনি হিসেবে বেশ সুনাম ছিল। খরগোশের মাংস রান্নার প্রক্রিয়া তাদের উপর প্রয়োগ করে সে। 

 

নিজেদের কাজে বেশ সন্তুষ্ট হওয়ার পর দুই বোন মিলে নিজেদের শরীরে লেগে থাকা রক্ত যত্ন করে পরিষ্কার করে। তারপর নির্বিকারভাবে নিজেদের কক্ষে চলে যায়। 

 

ক্রিস্টিন এবং লিয়া পাপিনের জন্ম ফ্রান্সে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ক্রিস্টিনের জন্ম ১৯০৫ এবং লিয়ার ১৯১১ সালে। তাদের ছোটবেলা কেটেছিল একটা অসুস্থ পরিবেশে। বাবা গুস্তাভ ছিল মদ্যপ এবং অত্যাচারী, মা ক্লেমেন্সের নৈতিকতার ভিত্তি খুব একটা শক্ত পোক্ত ছিল না, না ছিল মা হবার যোগ্যতা। নিজের সন্তানদের সবসময় বোঝা মনে করত সে। ক্রিস্টিনের জন্মের পরপরই তাকে পালক হিসেবে দিয়ে দেওয়া হয় তার এক ফুপুর কাছে, আর লিয়ার জন্মের কিছুদিন পরেই তাদের প্রথম মেয়ে এমিলির যখন মাত্র ১০ বছর বয়স তখন তার নিজের বাবা তাকে ধর্ষন করে। ক্লেমেন্স যখন স্বামীর এই অপকর্মের কথা জানতে পারে তখন তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু পুরো ঘটনার জন্য সে দায়ী করে তার মেয়েকে। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল তার মেয়েই তার স্বামীকে প্ররোচিত করেছে। তাই তাকে সে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য একটা মঠে পাঠিয়ে দেয়। তার কিছুদিন পরেই সেই মঠে পাঠানো হয় ক্রিস্টিনকেও। আর লিয়াকে পাঠানো হয় তাদের আরেক বৃদ্ধ আত্মীয়ের কাছে। 

 

মঠে থাকার সময় এমিলি আর ক্রিস্টিনের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। দুই বোন সময় পেলেই একসাথে বসে থাকত, গল্পগুজব করত। বাড়ির অসুস্থ পরিবেশ থেকে বের হওয়ায় তারা দুইজন ক্রমেই নিজেদের বুদ্ধিমত্তা আর দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকে। নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পরে এমিলি সন্ন্যাসী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে। ক্রিস্টিন নিজের বোনকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করত। তাই সেও স্বপ্ন দেখতে থাকে বোনের মতন সন্ন্যাসী হওয়ার। কিন্তু এই পরিকল্পনায় বাদ সাধে তার মা। কারণ তার পরিকল্পনা ছিল মেয়েরা কাজ করার মতন বয়সে পৌঁছলেই তাদের কোন একটা কাজে ঢুকিয়ে দেবে। ক্রিস্টিনকে সেই মঠ থেকে নিয়ে আসা হয়। তার রান্নার হাত বেশ ভালো ছিল। তাই রাঁধুনি হিসেবে কাজ পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না তাদের। কাজ করতে করতে রান্নাবান্নার পাশাপাশি ঘরের অন্যান্য কাজেও সে বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠে। ফলে গৃহকর্মী হিসেবে বেশ সুনাম কুড়ায় সে। ( খুনে পরিচারিকা )  কিন্তু তার উপার্জনের পুরোটাই নিয়ে যেত তার মা। তবুও মেয়ের উপার্জনে খুব একটা খুশি হতে পারছিল না সে। তাই একের পর এক কাজের জায়গা পরিবর্তন করতে থাকে। এদিকে সেই আত্মীয় মারা যাওয়ায় লিয়াকেও সে কাজ খুঁজতে বাধ্য করে। এই দুই বোন কখনো খুব বেশি কাছাকাছি আসার সুযোগ না পেলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্টতা গড়ে উঠতে সময় লাগে না। কাজের ফাঁকে যখনই সময় পেত তারা পরষ্পরের সাথে দেখা সাক্ষাত করত, ঘুরে বেড়াতো, গল্পগুজব করত। 

খুনে পরিচারিকা
খুনে পরিচারিকা

 

বেশ কয়েক জায়গায় কাজ করার পর ক্রিস্টিন অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী মশিউর ল্যান্সেলিনের বাড়িতে কাজ পায়। মালিককে বলে কয়ে ছোটবোন লিয়ার জন্যও একই বাড়িতে কাজের ব্যবস্থা করে সে। তারা খুব একটা বাড়ির বাইরে যেত না। কেবল রবিবারের চার্চ আর একজন ভাগ্য গণনাকারীর কাছে যাওয়া হত তাদের। সেই গণক তাদের বলেছিল পূর্ব জন্মে নাকি তারা স্বামী স্ত্রী ছিল। এই দুই কঠোর পরিশ্রমী এবং অনুগত গৃহকর্মী পেয়ে ল্যান্সেলিন পরিবার বেশ খুশিই ছিল। তাদের মন জয় করে নিতে সময় লাগে না দুই বোনের। যদিও চুপচাপ, বিচ্ছিন্ন এবং অমিশুক প্রকৃতির হওয়ায় তাদের বাইরের মানুষজন খুব বেশি পছন্দ করত না, অনেকের কাছে তাদের অনেক দূর্নামও শুনেছিলেন ল্যান্সেলিনরা, কিন্তু সেসবে খুব বেশি কান দেন নি তারা। 

 

মশিউর ল্যান্সেলিন বাড়ি ফিরে দেখতে পেলেন পুরো বাড়ি অন্ধকার, আর বেশ ভালোমতন তালাবদ্ধ করা। সেদিন সন্ধ্যায় স্ত্রীকে নিয়ে একটা দাওয়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। তিনি ভাবলেন স্ত্রী বুঝি তার আগেই চলে গিয়েছে সেখানে। তাই তিনি আর বাড়ির ভেতর না ঢুকে চলে যান। কিন্তু দাওয়াতে গিয়ে যখন দেখলেন স্ত্রী সেখানে নেই তিনি সাথে করে আরেকজনকে নিয়ে ফিরে এলেন। পুরো বাড়ি অন্ধকার, কেবল গৃহকর্মীদের ঘরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সতর্ক হয়ে তারা খবর দিয়ে একজন সৈন্যকে নিয়ে আসেন, সে বাড়ির পেছনের বাগানের দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করতে সমর্থ্য হয়। অফিসার যখন নিজের সাথে থাকা টর্চ দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তার চোখে পড়ে একটা চোক্ষুগোলক, তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে বাকি দুইজনকে নির্দেশ দেয় যেখানে আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকার। তারপর সে নিজেই দোতলায় যায়।

 

খুনে-পরিচারিকা
খুনে পরিচারিকা

 

 

দোতলায় গিয়ে তাকে মুখোমুখি হতে হয় এক ভয়াবহ দৃশ্যের। মেঝেতে যে দুই নারী শুয়ে আছেন তাদের চেহারা বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। দেখে চেনার কোন উপায় নেই। চোখ উপড়ে পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। তিনি ভাবলেন বাড়িতে হয়ত আগমন ঘটেছিল কোন গুপ্ত ঘাতকের। পরিচারিকাদেরও হয়ত একই দূর্ভাগ্যের শিকার হতে হয়েছে। তাই তিনি ছুটে যান তিন তলায়, যেই ঘরে তারা থাকে সেই ঘরে। তিনি দেখলেন ঘরটা ভেতর থেকে আটকানো। ভেসে আসছে ফিসফিসে কথার আওয়াজ। অনেক্ষণ কড়া নাড়ার পরও যখন কেউ দরজা খুলল না তখন তিনি তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেন। 

 

আরো পড়ুন : আসলেই কি ভ্যাম্পায়ার খুন করেছিল লিলি লিন্ডস্ট্রোমকে?

 

ঘরের এক কোণায় বিছানায় পরষ্পরকে শক্ত করে জাপটে ধরে ভয়ে কাঁপছিল দুই জন। তাদের পাশেই একটা টেবিলে রাখা ছিল রক্ত আর মগজে মাখামাখি চাকু এবং হাতুড়িগুলো। দুই বোন তখনই খুনের দায় স্বীকার করল। কিন্তু তারা দাবী করল তারা নিজেদের বাঁচাতে কাজটা করেছে। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল এই দুই বোন সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিখ্যাত মানুষ পর্যন্ত সবার ব্যাপক সমবেদনাও পেল। সবার ধারণা ছিল তারা কেবলই শ্রেণী বৈষম্যের শিকার। 

 

দুই বোনই নিজের ঘাড়ে সমস্ত দোষ নিয়ে অপরজনকে নির্দোষ দাবী করতে লাগল। তবে আদালতে তাদের আইনজীবী দাবী করল তারা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। আদালতে উঠে আসল তাদের অসুস্থ ছেলেবেলার কথা, উঠে আসল এক নিকটাত্মীয়ের মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনজন চিকিৎসক তাদের এবং তাদের খুনের ধরণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন তারা মোটেও মানসিক ভারসাম্যহীন নয়। বরং পুরো কাজটা তারা করেছে খুব ঠান্ডা মাথায়, হিসেব নিকেশ করে। খুনের পরে গোটা বাড়ি পরিষ্কার করেছে, পরিচ্ছন্ন করেছে নিজেদেরও। 

 

রায়ে বিচারকরা লিয়ার প্রতি সহানুভূতি দেখালো। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল লিয়া পুরোপুরি তার বড় বোন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাজটা করেছে। তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হল। তবে ক্রিস্টিনের প্রতি কোন সমবেদনা দেখানো হল না। তাকে শিরশ্চেদ করে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ প্রদান করা হল। 

 

১৯৩৪ সালের জানুয়ারির ২২ তারিখ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আলবার্ট লেবরুন ক্রিস্টিনের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ বাতিল করেন এবং তার বদলে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। সে তার বোন লিয়ার সাথে থাকতে চেয়ে আবেদন করে, কিন্তু তার সেই আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে সে খাওয়া দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেয়, তার শরীর ভেঙে পড়ে এবং মাত্র ৩২ বছর বয়সেই সে মৃত্যুবরণ করে। 

 

লিয়ার কারাবাস শেষে সে তার মায়ের কাছে ফিরে যায় এবং নিজের নাম পরিচয় বদল করে কর্মজীবন শুরু করে। তার পরবর্তী জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে বাকি জীবন সে খুব আটপৌরে এবং স্বাভাবিকভাবেই পার করে দেয়।


 Sources: ইউটিউব 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...