জেমস বালজার হত্যা : খুনী যখন নিজেই শিশু! 

জেমস বালজারের মৃতদেহ আবিষ্কার করে হতবিহ্বল এবং দিশেহারা হয়ে পড়ে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। কারণ তারা যে খুনিদের খোঁজ করছে তারা মোটেও কোন মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নয়, নিতান্তই শিশু।

জেমস বালজার হত্যা : খুনী যখন নিজেই শিশু! 

 

দুই বছর বয়সী জেমস বালজারকে অপহরণের পর পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারপর তার মৃত্যুকে দূর্ঘটনা হিসেবে দেখাতে মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছে রেল লাইনের উপর। মার্কিন যুক্তরাজ্যের পুলিশ স্বপ্নেও ভাবে নি যে নৃশংস খুনী দের তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের দুইজনের বয়সই মাত্র দশ বছর। ঘটনাটা ঘটেছিল যুক্তরাজ্যের লিভারপুলে। খুনী শিশু দের গল্প জানা যাক চলুন। 

 

১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। সেদিন ছিল শুক্রবার। জেনিস তার দুই বছর বয়সী ছেলে জেমস কে নিয়ে কাছেই একটা শপিং সেন্টারে যান কিছু কেনাকাটা করতে। সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ছোট জেমস অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। দুপুরে সাড়ে তিনটার দিকে তারা একটা কসাইয়ের দোকানে যায়। সেখানে দাম পরিশোধ করতে গিয়ে মাত্র কয়েকটা মুহূর্তের জন্য জেমসের হাত ছেড়ে দেয় তার মা। কে জানত এই কয়েক মুহূর্তের অসাবধানতার ভার তাকে বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন? 

 

দোকানদারকে টাকা দেওয়ার পর জেনিস লক্ষ্য করে আশে পাশে কোথাও জেমস নেই। পুরো দোকান তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়। মার্কেটের মাইকে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু জেমসের কোন পাত্তাই পাওয়া যায় না। শেষমেশ তল্লাশিতে নামে পুলিশও। মার্কেটের সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায় জেমস দুইজন কিশোর বয়সী ছেলের সাথে বের হয়ে যাচ্ছে। এটা দেখে পুলিশ যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবে, অল্পবয়সী ছেলেপিলে। হয়ত মজার ছলে নিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর ফিরিয়ে দেবে। কোন দুর্ধর্ষ অপহরণকারী কিংবা শিশুকামীর পাল্লায় পড়ে নি ভেবে সবাই একটু খুশিই হয়। 

 

টানা দুইদিন তল্লাশি চালিয়েও শিশু জেমসের কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। এদিকে জেমস বালজারের নিখোঁজের খবরে তোলপাড় হয়ে যায় দেশের সব সংবাদ মাধ্যমে। দুইদিন পরে কয়েকটা ছেলে রেললাইনে খেলার সময় খুঁজে পায় মৃতদেহ। আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, উপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ায় ছোট্ট শরীরটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। তবে ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় জেমসের মৃত্যু ট্রেনে কাটা পড়ে নয়, বরং ঘটনাস্থলে পাওয়া ইট এবং লোহার দন্ড দিয়ে মাথায় একাধিক আঘাতের ফলেই মৃত্যু ঘটেছে তার। 

 

জেমস বালজারের মৃতদেহ আবিষ্কার করে হতবিহ্বল এবং দিশেহারা হয়ে পড়ে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। কারণ তারা যে খুনী দের খোঁজ করছে তারা মোটেও কোন মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নয়, নিতান্তই শিশু। 

 

সিসি টিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ ধারণা করেছিল খুনিদের বয়স ১২ এর মতন হবে। তাই যখন তারা দশ বছর বয়স্ক রবার্ট থম্পসন এবং জন ভেনেবলসের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ পায় তখন তারা বিষয়টাকে খুব একটা আমলে নেয় নি। এক পরিচিত মহিলা পুলিশকে জানায় জেমসের অপহরণ এবং নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন রবার্ট আর জন স্কুলে অনুপস্থিত ছিল। তদন্তের খাতিরেই পুলিশকে তাদের বাড়িতে যেতে হয়। উদ্দেশ্য বাচ্চা দুটোকে হালকা প্রশ্ন করে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু পুলিশ তাদের এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই ভয়ে চুপসে যায় দুজন। আতংকে চিৎকার করতে থাকে। সন্দেহ ঘনীভূত হওয়ায় তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়। 

 

জন ভেনেবলসের জন্ম আগস্টের ১৩ তারিখ, ১৯৮৩ সাল। তিন ভাই বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। তার বাকি দুই ভাইবোনই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ছিল। তারা নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। একটা পর্যায়ে তার বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তার সন্তানদের নিয়ে তার নিজের মায়ের বাড়িতে চলে আসে। সে সময় তার মা বেশ অসুস্থ ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দুই সন্তান সহ মোট তিন সন্তান এবং মায়ের দেখাশোনা করতে করতে ক্লান্ত এবং বিদ্ধস্ত সুজান ভেনেবলস একসময় মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন।

 

প্রায়ই বাচ্চাদের একা বাড়িতে রেখে বাইরে চলে যেতেন তিনি। পুরো বিষয়টার প্রভাব পড়ে জনের উপর। বাড়িতে এবং স্কুলে প্রায়ই হুটহাট ক্ষেপে দেখা যেত তাকে। মাঝেমধ্যে বই খাতা ছুঁড়ে ফেলত, শিক্ষকদের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করত, একবার তাকে অন্য একজন ছাত্রকে রুলার দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করতেও দেখা গিয়েছিল। তাছাড়া তার অন্য ভাইবোনরা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হওয়ায় তাদের সবসময় একটু বাড়তি সময় আর মনোযোগ দিতে হত। ফলে জন অনুভব করত তাকে তার মা অবহেলা করছে। তার ভাইবোনরা বিশেষ স্কুলে পড়তে গেলেও সে পড়ছিল সাধারণ প্রাইমারি স্কুলে, যেখানে তাকে বেশ বুলিইং এর শিকার হতে হয়। তাই সে প্রায়ই তার ভাই বোনদের আচরণ অনুকরণ করার চেষ্টা করা হত যেন তাকেও বিশেষ স্কুলে ভর্তি করানো হয়। তবে এতকিছুর পরেও জন যেন একটু উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছিল সবসময়। তার মা তাকে সেই স্কুল বদলে অন্য স্কুলে ভর্তি করান। যেখানে তার ভবিষ্যত বন্ধু রবার্ট থম্পসন পড়ত।

 

রবার্ট থম্পসনের জন্ম জনের ঠিক দশদিন পরেই। আগস্টের ২৩, ১৯৮৩। একটা অসম্ভব রকমের বিশৃঙ্খল এবং প্রায় অকেজো হয়ে যাওয়া পরিবারে। সাত সন্তানের মধ্যে সে ছিল পঞ্চম। তার বাবা ছিল একজন মদ্যপ যে প্রায়ই মদ্যপানের পর তার মা কে বাচ্চাদের সামনেই অমানুষিক মারধোর করত। স্বামীর দূর্ব্যবহারের প্রতিশোধ সে নিত বাচ্চাদের উপর। তাদের হাতের কাছে যা পেত সেটা দিয়েই পেটানোর অভ্যাস ছিল তার। তার বাবা একসময় একটা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং পরিবারকে ফেলে চলে যায়। আর সে চলে যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই একটা অগ্নিকান্ডে তাদের পুরো বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পুরো ঘটনায় তাদের মা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

 

সেটায় বিফল হয়ে সেও মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং দিন দিন বাচ্চাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ফলে বাচ্চাগুলো পুরোপুরি অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে। সবগুলো বাচ্চাই দিনদিন সমস্যাযুক্ত হয়ে বড় হতে থাকে। পুলিশও তাদের বেশ ভালো ভাবে চিনত। তাদের মধ্যে একজন হয়ে উঠে অগ্নিসংযোগকারী, দুইজন চোর, একজন বদনাম কুড়ায় ছোট বাচ্চাদের যৌন নির্যাতন করে যার মধ্যে তার নিজের ভাইও ছিল। সব মিলিয়ে একটা ভয়ংকর পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকে রবার্ট। 

খুনী-শিশু
খুনী শিশু

 

জন রবার্টের স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগে না খুব বেশি। দুইজনই বয়সে ক্লাসের সবার চেয়ে বড়, দুইজনের মা ই মদ্যপ এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, দুইজনই ভাঙা পরিবার থেকে এসেছে এবং কারোই বাবা উপস্থিত ছিলেন না। তাই তারা খুব দ্রুতই একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। প্রায়ই দুইজনকে একসাথে স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতে থাকে।  

 

গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে দুই থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে দুইজনই পুরো ঘটনা অস্বীকার করে। দীর্ঘ ইন্টারভিউ শেষে রবার্ট প্রথম জেমস বালজারের অপহরণ এবং হত্যার সময় উপস্থিত থাকার কথা শিকার করে। জনকে যখন রবার্টের স্বীকারোক্তির কথা জানানো হয় তখন জনও তার উপস্থিতির কথা শিকার করে। কিন্তু তার স্বীকারোক্তির সময় পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করে। তাদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায় জেমস কে হত্যা করার একাধিক চেষ্টা চালায় তারা। বিফল হয়ে রাগে এবং ক্রোধে তাকে অমানুষিকভাবে পেটায়। পেটানোর এক পর্যায়ে জেমস মারা যায়। তখন তার মৃত্যুকে দূর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে রেললাইনের উপর ফেলে রাখা হয়। 

 

জন এবং রবার্টকে নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে যায় আইন প্রয়োগকারী বাহিনী। তাদের হেফাজতে থাকা অন্যদের তুলনায় নিতান্তই শিশু এই দুইজন। এত ছোট কেউ কখনো তাদের হেফাজতে আসে নি। অথচ তাদের বিরূদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। টানা তিনদিন ধরে মোট বিশটা ইন্টারভিউ নিতে হয় তাদের। ইন্টারভিউয়ের সময় উপস্থিত থাকে তাদের পরিবার এবং আইনজীবী। দুইজনকেই খুব ধীরে সুস্থে যত্ন সহকারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়, কিছুক্ষণ পরপর কান্নায় ভেঙে পড়ছে একেকজন, তাদের সামলে উঠার সময় দিতে হচ্ছে, আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে হচ্ছে, ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন বারবার করতে হচ্ছে, যেন ধৈর্যের মহা পরীক্ষা দিতে হচ্ছে সবাইকে। বিপাকে পরে যায় কোর্টও।

ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী ১৩ বছরের নিচে কোন শিশুকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা যায় না। কারণ ধরে নেওয়া হয় এই বয়সের শিশুরা তাদের অপরাধের ধরণ এবং মাত্রা সম্পর্কে বোঝার ক্ষমতা রাখে না। তাই সব সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে জন ভেনেবলস এবং রবার্ট থম্পসনকে জেমস বালজার হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আট বছর সংশোধনাগারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সাথে তাদের নাম এবং পরিচয় সবার সামনে প্রকাশ করা হয়।

খুনী-শিশু
খুনী শিশু

 

আদালত একই সাথে নির্দেশ দেয় এর পরে এই দুইজনের কোন ধরণের কোন তথ্য কোথাও প্রকাশ করা যাবে না। আট বছর পর তাদের নতুন নাম এবং নতুন পরিচয় দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। তাই জন এবং রবার্টকে কোথায় রাখা হয়েছে, তাদের সংশোধনাগারে তাদের জীবন কেমন ছিল এবং এখন তারা কোথায় আছে সে সম্পর্কিত কোন তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না। এমনকি তাদের তথ্য প্রকাশ করার জন্য তিনজন ব্যক্তিকে কারাভোগও করতে হয়।

 

আরো পড়ুন : ময়না তদন্ত কী ও কেন? যা শোনা যায় তা কী গুজব না সত্যি?

 

কিন্তু আদালতের এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় সাধারণ জনগণ। সমগ্র দেশ যেন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এত ভয়াবহ এবং নির্মম হত্যাকান্ডের জন্য আট বছরের সংশোধনাগারে থাকার সাজা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না তারা। এছাড়াও জানা যায় ছাড়া পাওয়ার পরে জন ভেনেবলসকে আরো দুইবার আটক করা হয়। দুইবারই শিশু পর্নোগ্রাফি ডাউনলোড এবং সংরক্ষণ করার জন্য। তবে রবার্ট থম্পসনের পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায় না। জন ভেনেবলসের পুনরায় মামলার আসামী হওয়ায় বিচার এবং সংশোধন প্রক্রিয়ায়ও সন্দেহ জানায় যুক্তরাজ্যবাসী। তাদের অভিযোগ, কোনরকম সাজা ছাড়াই পার পেয়ে যাওয়া এই দুইজন ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ অপরাধী। তাদের এই অভিযোগ কতখানি সত্য, তা বলে দেবে সময়ই! 


This is a Bengali Article on mysterious incident about James Buldger Murder. 

Sources: BBC

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...