ক্যাথরিন নাইট- নিজের স্বামীকে রান্না করেছিল যে

জন চিলিংওর্থ আর ক্যাথরিন নাইটের সম্পর্ক তিন বছরের। এই তিন বছরে একটা পুত্রসন্তানেরও জন্ম দেয় তারা। তবে বেশিরভাগ সময়ই ক্যাথরিন নাইট পার করেছে অন্য পুরুষের সাথে। সম্পর্কের শুরুটা ভালোই ছিল তাদের জন্য। একসাথে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে যেত, বন্ধুদের সাথে স্থানীয় পানশালায় বসে আড্ডা দিত।

ক্যাথরিন নাইট- নিজের স্বামীকে রান্না করেছিল যে

 

জন প্রাইস নামের ভদ্রলোক সবসময় সময়মত কাজের জায়গায় উপস্থিত থাকে। কাজে ফাঁকি দেওয়ার অভ্যেস তার একদমই নেই। তাই ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন যখন সে কাজে এলো না তখন তার সহকর্মীরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। সারাদিনেও তার কোন খোঁজ না পেয়ে পুলিশে খবর দিল তারা। 

 

পুলিশ তার বাড়িতে গেল। অনেক্ষণ দরজায় কড়া নাড়ার পরও কোন সাড়াশব্দ পেল না তারা। এদিকে জনের ট্রাকটা বাইরেই পার্ক করা ছিল। তাই তারা বুঝতে পারল জন বাড়িতেই আছে। বাড়ির ভেতর থেকে কারো সাড়া না পেয়ে দরজার নিচের মেইল স্লট দিয়ে ভেতরে উঁকি মারার চেষ্টা করল তারা। কিন্তু দরজার সামনে একটা পর্দা ঝুলছিল। তাই কিছুই দেখতে পেল না। অনেক্ষণ পরেও যখন কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না তখন পুলিশ বাড়ির ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল।

ক্যাথরিন-নাইট
ক্যাথরিন নাইট

 

দরজাটা খোলাই ছিল। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করতেই তাদের পথরোধ করল দরজায় ঝুলতা থাকা পর্দাটা। অফিসার তার হাত দিয়ে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেন। তাতে সমর্থ্য হলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন তার হাতের বাহু পর্যন্ত মাখামাখি হয়ে গেছে রক্তে। আরেকটু ভালো করে তাকাতেই তিনি দেখলেন যেটাকে পর্দা ভেবেছিলেন সেটা মোটেও পর্দা নয়, মানুষে চামড়া।

পুরো ঘরে রক্তের বন্যা বইছে। মাটিতে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ। কেবল শরীরটা। চামড়া ছাড়ানো, পিঠের মাংসপেশি কেটে নেওয়া হয়েছে। মাথাটা আশেপাশে কোথাও নেই। অফিসাররা হেঁটে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। সেখানে তারা দেখলেন বেশ পরিপাটি করে রাতের খাবার প্রস্তুত করা হয়েছে। বেশ কয়েকটা প্লেটে সুন্দর করে খাবার সাজানো। দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন অতিথি আসবে তাই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চুলার উপরে একটা বড় পাতিলে স্টু হিসেবে রান্না করা হচ্ছে আস্ত মাথা। উপর তলায় পৌঁছে তারা খুজে পেলেন বাড়ির একমাত্র জীবিত মানুষটিকে। একজন মহিলা। যে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। অফিসাররা তাকে অনেক্ষণ ডেকে তোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সফল হলেন না। তারপর একটা এম্বুলেন্স ডেকে তাকে এম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হল। 

 

জন চিলিংওর্থ আর ক্যাথরিন নাইটের সম্পর্ক তিন বছরের। এই তিন বছরে একটা পুত্রসন্তানেরও জন্ম দেয় তারা। তবে বেশিরভাগ সময়ই ক্যাথরিন নাইট পার করেছে অন্য পুরুষের সাথে। সম্পর্কের শুরুটা ভালোই ছিল তাদের জন্য। একসাথে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে যেত, বন্ধুদের সাথে স্থানীয় পানশালায় বসে আড্ডা দিত। জনের দুইজন ছেলে মেয়ে জনের সাথে বসবাস করত যারা বয়সে অতটাও ছোট ছিল না। তবে বাবার সম্পর্ক নিয়ে তাদের কোন সমস্যা ছিল না। ক্যাথরিনকে সাদরেই গ্রহণ করেছিল তারা। জন কাজ করত খনি শ্রমিক হিসেবে। আয় রোজগার মন্দ ছিল না।

কিন্তু ক্যাথরিন জনকে বিয়ে করার কথা বললে জন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। এই প্রত্যাখ্যান মোটেও ভালোভাবে নেয় না ক্যাথরিন। তাদের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ক্যাথরিন জনকে প্রতিনিয়ত মৌখিক নির্যাতন করতে থাকে। এর সাথে যোগ হয় শারীরিক নির্যাতনও।

ক্যাথরিন-নাইট
ক্যাথরিন নাইট

 

রেগে গেলে ক্যাথরিন প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠত। একবার জন তার অফিস থেকে একটা ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এলে ক্যাথরিন সেটা ভিডিও করে এবং জনের বসকে পাঠিয়ে দেয়। অফিস সম্পদকে নিজের মালিকানায় রাখার অপরাধে জনকে চাকুরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। পুরো কাজটাই সে করে কারণ সে জনের উপর কোন একটা কারণে রেগে ছিল। এই ঘটনায় জন ক্যাথরিনের উপর খুব বিরক্ত হয় এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তিন মাস তারা পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তিনমাস পর ক্যাথরিন আবার জনের জীবনে জায়গা করে নেয়। 

 

ক্যাথরিন জনকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে তাকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু জন কিছুতেই বিয়েতে রাজি হয় না। তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি আর মারামারি লেগেই থাকে। ক্যাথরিন সময়ে সময়ে বেশ হিংস্র হয়ে উঠত। জন তার বন্ধুবান্ধব আর সহকর্মীদের জানিয়ে রেখেছিল যে যদি কখনো নিখোঁজ হয়ে যায় তাহলে যেন তারা পুলিশে খবর দেয়। কারণ ক্যাথরিন যে কোনদিন তাকে হত্যা করবে। তার সেই সন্দেহই একদিন সত্যি প্রমাণিত হল। জনকে ঘুমের মধ্যেই অসংখ্যবার ছুরিকাঘাত করে ক্যাথরিন। আঘাত থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় নিজেকে বাঁচানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল সে। পালিয়ে দরজা পর্যন্ত চলেও গিয়েছিল। সেখান থেকে টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে আসা হয়।

হত্যা করার পর তার শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। মাথা কেটে সেটাকে স্টু বানানো হয়, পিঠের মাংসপেশি কেটে রান্না করা হয়। তারপর প্লেটে সুন্দর করে সাজানো হয়। অতিথিদের নেমপ্লেটে নাম লিখে রাখা হয় জনের ছেলে মেয়েদের। উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে তাদের বাবার মাংস খাওয়ানো। এরপর তাদেরও হত্যা করা। পুরোটাই কেবল তাকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতিশোধ হিসেবে। 

 

ক্যাথরিন নাইট বসবাস করত অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে। কাজ করত একটা কসাইখানায়। এটা তাদের পারিবারিক পেশা। তার ছোটবেলা থেকে পরিবারের সবাইকে এই কাজ করতে দেখেই বড় হয়েছে সে। তবে এটা কেবল তার পেশাই ছিল না। বরং এটা ছিল তার নেশা। পশুদের হত্যা করা, তাদের শরীর থেকে রক্ত বের হতে দেখা, তাদের মরে যেতে দেখা খোরাক যোগাতো তার মনের। সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা যায় সে তার কাজে অসাধারণ ছিল। চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটাকাটি, হাড় থেকে মজ্জা আলাদা করা, সবগুলো কাজ সে করত নিপূণ হাতে।

কে ভেবেছিল এই বিদ্যাই একদিন সে প্রয়োগ করবে মানুষের উপর? 

ক্যাথরিন-নাইট
জন চিলিংওর্থ

 

ক্যাথরিন বড় হয়েছে একটা প্রচণ্ড অস্বাভাবিক এবং হিংস্র পারিবারিক পরিবেশে। শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতন যে পরিবারের নিত্যদিনের ঘটনা। তাই সুস্থ এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক কিভাবে রক্ষা করতে হয় সেটা সে কখনোই শিখে নি। যতগুলো সম্পর্কে জড়িয়েছে তার সবগুলোতেই সে আচরণ করছে প্রচন্ড রক্ষণশীল, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং আগ্রাসী ভঙ্গীতে। তাই তার হাতে তার প্রেমিকের খুন হওয়াতে খুব বেশি অবাক হয় নি কেউই। সবাই যেন আগে থেকেই জানত এমন কিছু একটা হবে।

 

গ্রেফতারের পর ক্যাথরিন দাবী করে তার গত ছয়দিনের কোন স্মৃতিই নেই। সে কী করেছে সে জানে না। কোর্টেও নিজেকে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ করার অসংখ্য চেষ্টা চালায় সে। বিচার চলাকালীন সময়ে বেশ অস্বাভাবিক আচরণ করে সে। কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হন ক্যাথরিন নাইট মোটেও কোন মানসিক ভারসাম্যহীন পাগল নয়। বরং সে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি। যে তার প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়েছে খুব হিসেব করে।

 

আরো পড়ুন : হানিমুনে মৃত্যু- দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত খুন? (ভিডিও)

 

নারীদের সাইকোপ্যাথ হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। কিন্তু ক্যাথরিন নাইট ছিল একজন আপাদমস্তক সাইকোপ্যাথ। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম নারী হিসেবে তাকে কোনরকম জামিনের সম্ভাবনা ছাড়া আমরণ কারাদন্ড ভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়।


Sources: Murder

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...