কোহকাফ নগরীতে সত্যিই কি জ্বীন আছে? (ভিডিও)

আলিফ লায়লা'য় সবসময় শুধু সবুজ রঙের জ্বিন বা দৈত্য আর সাদা ফ্রক পরা কোহকাফ নগরীর পরী দেখাত। মনে পড়েছে? এমন করেই কোহকাফ সম্পর্কে ছোট বেলায় প্রায় সকলেই কম বেশি শুনে থাকবেন।

কোহকাফ নগরী তে সত্যিই কি জ্বীন আছে?  

 

কোহকাফ। নাম শুনেছেন? শুনেন নি? ছোটবেলায় টিভি সিরিয়াল ‘আলিফ লায়লা’ দেখেছেন তো না? আলিফ লায়লা’য় সবসময় শুধু সবুজ রঙের জ্বিন বা দৈত্য আর সাদা ফ্রক পরা কোহকাফ নগরী র পরী দেখাত। মনে পড়েছে? এমন করেই কোহকাফ সম্পর্কে ছোট বেলায় প্রায় সকলেই কম বেশি শুনে থাকবেন।  

 

একটি গল্প বেশ প্রচলিত কোহকাফ ঘিরে। কোনো এক দেশে এক বাদশাহর মেয়ে ছিল। মেয়েটি রাজপ্রাসাদের ছাদে ঘুরাঘুরি করছিলো। কথিত আছে, তখন এক জ্বীন এসে মেয়েটিকে অপহরণ করে কোহকাফে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। 

 

বাদশাহ এই ঘটনা জানার পর বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি কিছু তরুণ শাহজাদাকে তার মেয়েকে উদ্ধারের জন্য পাঠালেন। এও ঘোষণা করে দিলেন, যে শাহজাদা তার মেয়েকে উদ্ধার করে আনতে পারবে, তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দেয়া হবে। 

কোহকাফ
কোহকাফ

 

এই শাহজাদাদের মধ্যে নেক এবং সৎ মনের এক শাহজাদা ছিল। পথিমধ্যে তার সাথে এক বুজুর্গের দেখা হয়। বুজুর্গ ব্যক্তিটি শাহজাদার গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে একটি আংটি উপহার দেন। বলে দেন, এই আংটির মাধ্যমে শাহজাদা খুব দ্রুত কোহকাফে পৌঁছাতে পারবে। শাহজাদা কোহকাফে গিয়ে জ্বীনদের সাথে লড়াই করে খুব সহজেই বাদশাহর মেয়েকে উদ্ধার করে প্রাসাদে ফিরিয়ে আনে। বাদাশাহের দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী মেয়েটির সাথে সেই শাহজাদার বিয়ে সম্পন্ন হয়। 

 

কোহকাফ ঘিরে এমন অসংখ্য কাহিনী পৃথিবীতে প্রচলিত রয়েছে।  

 

কিন্তু কোহকাফ আসলে কোথায়? কোহকাফ অনেকের কাছে ‘কাফকাজ’ নামে পরিচিত, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ককেশাস মাউন্টেন। 

 

ককেশাস বা কোহকাফ যা-ই বলা হোক না কেন, এটি একটি পর্বতমালা। কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের অন্তরবর্তী স্থানে অবস্থিত ককেশাস পর্বত, তার আশ-পাশের এলাকা জুড়েই ককেশাস অঞ্চল বিস্তৃত। এই ভূমিখন্ড ইউরেশিয়াকে সংযুক্ত করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে। তুরস্কের বিশাল এলাকা, দক্ষিণ ককেশিয়ার স্বতন্ত্র প্রজাতন্ত্র সমূহ, যেমন- আর্মেনিয়া, আজেরবাইজান ও জর্জিয়া এবং রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত উত্তর ককেশীয় অঞ্চল নিয়েই গঠিত সুবিশাল ককেশাস অঞ্চল।

 

 রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত উত্তর ককেশাস গঠিত হ​য়েছে কালমিকিয়া, আদিজীয়া, কারাচাই-চেরকেসিয়া, উত্তর ওসেটিয়া-আলানিয়া, চেচনিয়াসহ বেশকিছু এলাকা নিয়ে। 

 

ককেশাস সম্পর্কে কেউ আর কিছু জানুক বা না জানুক, অন্তত এই অঞ্চলকে ঘিরে মানবজাতির উত্থান ও মানব-সভ্যতার আবির্ভাব ও বিস্তারকের কেন্দ্র করে যে সকল পৌরাণিক কাহিনীর সৃষ্টি সেই সম্পর্কে সকলেই কিছু না কিছু জেনে থাকতে পারেন। 

 

ইউরোপের সর্বোচ্চ শিখর এলব্রুস পাহাড় এই পর্বতমালাতেই অবস্থিত। ককেশাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল মাউন্ট এলবুর্জ, উচ্চতায় এটি প্রায় ৫ হাজার ৬৪২ মিটার। এই পর্বতমালা রাশিয়া, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান জুড়ে অবস্থান করছে। 

 

এই ককেশাস পর্বতমালার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে নানান ধরণের পৌরাণিক কাহিনী সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলোর ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে। 

 

রাশিয়ার মধ্যে অবস্হিত ককেশাস পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম ডার্গাভস। মধ্যযুগীয় অঞ্চল ডার্গাভসকে ‘মৃত শহর’ বলা হয়।

 

মূলত এটি একটি মধ্যযুগীয় পাহাড়ি গোরস্থান।সে সময় ওসেটিয়ায় আদিবাসীরা বসবাস করত। তাদের পরিবারের সদস্যদের সমাধির কথা চিন্তা করে এসব সমাধিগৃহ তৈরি করা হতো। 

 

অনেক কাল্পনিক এবং পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে গ্রামটিকে নিয়ে। দেখতে গ্রামের মতো মনে হলেও এলাকাটিতে গেলে যে কারো গা হিম হয়ে যাবে। নির্জন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ছিটানো মৃত মানুষের খুলি আর হাড়গোর দেখলে ভয়ে জড়সড় না হয়ে উপায় নেই।

 

এই লেখাটি ভিডিও আকারে দেখতে পারেন ফেসবুকের এই লিন্কে

 

 ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, গোরস্থানটি ১৬ শতকের।সমাধির ভিতরের মৃতদেহকে নৌকার মতো কাঠের কাঠামো দিয়ে সমাহিত করা হতো। প্রায় সব সমাধিতেই এমন নৌকার টুকরা পাওয়া যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গোটা ওসেটিয়ার ককেশাস পর্বত ও তার আশপাশে কোনো নদী নেই। তাহলে এসব নৌকার টুকরোর উৎস কী? 

 

ধারণা করা হয়, সম্ভবত গ্রামবাসীরা নৌকাসহ মৃতদেহকে সমাহিত করত। কারণ, তাদের ধারণা ছিল পরপারে নৌকাটি তরী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। তারা এও বিশ্বাস করত যে, বিদেহী আত্মার স্বর্গ লাভে নদী পার হতে হয়। অনেকটা ‘প্রাচীন মিসর’ এবং ‘মেসোপটেমিয়ার পরকাল’ গল্পের মতো।

 

আরেকটি মজার বিষয় হলো, প্রতিটি সমাধির সামনে কূপ ও কিছু কয়েন পাওয়া যায়। প্রিয়জন মারা গেলে কয়েনগুলো কূপে ফেলা হতো। যদি কয়েনটি পাথরে পড়ে শব্দ করত, মৃতদেহের আত্মা স্বর্গে পৌঁছে গেছে বলে মনে করা হতো। অতীতে গোরস্থানটিকে মানুষ অনেক ভয় পেত। এখানে জীবিত আসতে চাইত না। অতীতের মতো এখনো ডার্গাভসে কোনো মানুষের বিচরণ নেই।

 

ভারত এবং পাকিস্তানি বুজুর্গদের মতামতের উপর ভিত্তি করে শত শত বছর ধরে কোহকাফ ঘিরে এমন নানান গল্প – উপকথা প্রচলিত রয়েছে যার ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ থেকে গেছে আজও। বলা হয়ে থাকে, এই অঞ্চলটি জ্বিন ও পরীদের রাজ্য। 

 

বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে,

পৃথিবী যে কয়েকটি স্তম্ভের ওপর ভর করে আছে, এর একটি হল ককেশাস-এর পর্বতমালা! কিন্তু এইসব বিদঘুটে বিশ্বাস ছাড়াও ককেশাসকে ঘিরে বহু দুঃখ-দূর্দশা, বঞ্চনা-নির্বাসনের অনেক কাহিনীও প্রচলিত আছে। 

 

বলা হয়ে থাকে, এই ককেশাস এলাকায় জন্তু-জানোয়ারের মতই শিকার করা হত ক্রীতদাসদের, যাদের পরে পাচার করা হত মধ্য-প্রাচ্যে। 

 

এতসব গল্প আর কাল্পনিক বিশ্বাস ছাপিয়ে প্রতি বছর লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয় ককেশাস পর্বতমালা। অপূর্ব সুন্দর এই পর্বতরাশি যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।  

 

ককেশাস পর্বতমালায় গ্লেসিয়ারে বরফ যখন গলে তখন সেটা দেখার মতো এক দৃশ্য হয়। গ্লেসিয়ারের পথ গুলো বেশ দুর্গম হওয়ায় পর্যটকদের কেউই আজ পর্যন্ত পুরোপুরি গ্লেসিয়ারের সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারে নি। 

গল্প, উপকথা আর সৌন্দর্যের মায়াবী রূপ নিয়ে ককেশাস পর্বতমালা আজও এক রহস্যের নাম। 

 

এই লেখাটি ভিডিও আকারে দেখতে পারেন ফেসবুকের এই লিন্কে


Source : Kohkaf 

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...