করোনাকালের এক জোড়া অনু্গল্প

করোনা ভাইরাসের দিনগুলোয় করোনা নিয়েই দু'টো অণুগল্প বলা যাক আজ। 

করোনাকালের এক জোড়া অনু্গল্প

 

করোনা ভাইরাসের দিনগুলোয় করোনা নিয়েই দু’টো অণুগল্প বলা যাক আজ।

মুখ ও মুখোশের সন্ধি

কাপড় রাখার ওয়ারড্রোবে পাশাপাশি পড়েছিল দুটো মাস্ক-একটা এন-৯৫, আরেকটা প্রিন্ট করা ডিজাইনের। এন-৯৫ মাস্কটা একদম খোলাই হয় নি,চকচকে নতুন প্যাকেটে পোরা। প্রিন্ট ডিজাইনের মাস্কটা ব্যবহৃত,কুকড়ে-মুকড়ে আছে।

 

নিরবতা ভাঙলো প্রিন্ট ডিজাইনের মাস্ক ।

‘কেমন আছেন, এন-৯৫ ভাই?’

 

একটু বিরক্ত  হয়ে বলল এন-৯৫, ‘কেমন আছি দেখতেই তো পাচ্ছো! একেবারে প্যাকেট করে রেখে দিয়েছে। কী জন্য কিনেছে আমাকে। বুঝতে পারছি না। এর চেয়ে তো দোকানেই ভালো ছিলাম। মানুষজনের সাথে দেখা হতো। সবাই একটু নেড়েচেড়ে দেখত।’

 

 

সম্মতি জানাল প্রিন্ট ডিজাইন, ‘ঠিক বলেছেন ভাই! তবে বিশ্রামেই তো আছেন,ফ্রেশ আছেন। আমার অবস্থা দেখেন। প্রতিদিন আমাকে মুখে লাগিয়ে বাড়ির ম্যাডাম বাইরে যায়। তারপর খুলে মুখের লিপস্টিক,লালা সব শুদ্ধ কুচকে এভাবেই রেখে দেয় । এতো ঘেন্না লাগে আমার।’

 

 

সশব্দে হেসে ওঠে এন-৯৫, ‘আরে সুন্দরী ম্যাডামের মুখের, ঠোটের স্পর্শ পেয়েছ,এতেই খুশি থাকো না! মানুষের সাথে থাকতে থাকতে তো দেখি তোমার মানুষের মতোই অভ্যাস হয়ে গেছে! তুষ্ট থাকতে পারো না। খালি নেগেটিভ জিনিসগুলো চোখে পড়ে।’

 

 

এন-৯৫ এর কথা শুনে একটু খুশি হয়ে ওঠে প্রিন্ট ডিজাইন মাস্ক, ‘তা অবশ্য ভালো বলেছেন। এভাবে তো ভেবে দেখি নি। কিন্তু সাধে কি আর অসন্তুষ্ট হই? ঐদিন ম্যাডামের কলেজ পড়ুয়া ছেলে কী করল জানেন?

 

 

‘কী করলো?’ কৌতুহলী হয়ে ওঠে এন-৯৫।

 

 

‘বাবার সাথে কোথায় জানি যাবে সে। তাড়াতাড়ি করে নিজের মাস্ক না খুঁজে পেয়ে আমাকেই নিয়ে গেল।আমাকে মুখে দেওয়া মাত্রই ভকভক করে সিগারেটের গন্ধ আসলো। চিন্তা করেন কতটুকু ছেলে! মাত্র কলেজে উঠেছে! এই করোনার মধ্যে আবার সিগারেটও খাচ্ছে। তার উপর নিজের মাস্ক বাদ দিয়ে মা’র মাস্ক পড়বে কেন? এত রাগ লাগছিল ।মনে হচ্ছিল তার মা’কে বলে দেই।’

 

 

কথা শুনে একটু সিরিয়াস হয়ে গেল এন-৯৫, ‘বলিস কি! এই অবস্থা! তবু একটু এপ্রিশিয়েট কর। ছেলেটা অন্তত মাস্ক পরে তো বের হচ্ছে।নিজেরটা না পেলেও খুঁজে খুঁজে মা’রটা তো বের করেছে।’ 

 

আরো পড়ুন : মুক্তিযুদ্ধ: বিজয়ের যে গল্পটা বাংলাদেশের

 

একটু ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটল প্রিন্ট ডিজাইনের মাস্কের হঠাৎ, “এপ্রিশিয়েট না ছাই করব! সে বাইরে গিয়ে কী করল জানেন? পুরোটা সময় আমাকে টেনে থুতনির নিচে নামিয়ে রাখল। ভকভক করে সিগারেট খেল, বন্ধুদের সাথে গল্প করল রাস্তার দোকানের সামনে। অবশ্য তাকে আর কি দোষ দেব? আশেপাশের অনেককেই দেখলাম মাস্ক ছাড়া ঘুরছে ! কারোর মাস্ক থুতনির নিচে অথবা এক কানে ঝুলছে!’

অনু্গল্প
অনু্গল্প ©Pinterest

 

এন-৯৫ এবার চমকে উঠল, ‘সর্বনাশ !তুই তো আমাকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিলি। আমি তো এখনো বাইরে বেরই হইনি! আমার কী হবে? ঠিক বলেছিস রে। এর থেকে এভাবে ওয়ারড্রোবে পড়ে থাকাই ভালো।বের হতে চাই না আর । শীতকালটা এভাবেই আরামে শুয়ে কাটাতে চাই।’

 

 

হঠাৎ ওয়ারড্রোবের এর কাছে পায়ের শব্দ শোনা গেল।এন-৯৫ এবং প্রিন্ট ডিজাইন মাস্ক দুজনেই সচেতন হয়ে উঠলো। বাসার ম্যাডাম এসে ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। ড্রয়ারের ভেতরে মাস্ক দুটির গায়ে, চোখে টিউব লাইটের আলো লাগল। ম্যাডাম প্রথমে প্রিন্ট ডিজাইনের মাস্কটা একটু নেড়েচেড়ে দেখলেন। নোংরা হয়েছে দেখে সোজা বাথরুমের ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর চকচকে নতুন প্যাকেটটা থেকে এন-৯৫ মাস্কটা বের করে মুখে পরলেন। এর কিছুক্ষণ পর বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলেন।

 

 

চা ও চাকরি

সময়টা সকাল এগারোটার আশেপাশে হবে।অফিসের নিচের চায়ের টঙ দোকানে বসে খুব আরামসে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে শাহেদ আলী। চুমুকের সময় একবার চোখ বন্ধ করছে,আবার খুলছে। পাঁচ বছর ধরে এই অফিসে কাজ করছে শাহেদ আলী। কতশত চায়ের কাপ অফিসের কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে পৌঁছে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কখনই এমন আরাম করে বসে চায়ে চুমুক দেওয়ার সুযোগ হয়নি নিজের,অন্যের হাতের চা খাবার তো প্রশ্নই ওঠে না।

 

 

আজ থেকে শাহেদ আলীর চা খাওয়ার সময় সুযোগের আর অভাব হবে না। সকালে অফিসে গিয়ে জানতে পেরেছে তার চাকরিটা আর নেই। করোনার কারণে অফিসে কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। তার মতো আরও তিন- চারজন অফিস সহকারীর চাকরি গেছে। সাথে অনেক উচ্চ পদস্থ  কর্মকর্তাদের চাকরি যাবার কথাও শুনেছে সে।এ ব্যাপারে বেশ ক’দিন ধরে কানাঘুষা শুনলেও পাত্তা দেয় নি।

 

করোনা আর কি! একটা রোগই তো। কত রকম রোগশোক পৃথিবীতে আসে,চলে যায়।তবে আজ যেন শাহেদ আলীর মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। বজ্রপাতে অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে অফিসে বসে ছিল। তারপর আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা চায়ের দোকানে এসে বসল। চা অর্ডার দিয়ে একের পর এক কাপ শেষ করে চলেছে সে। এই নিয়ে তিন কাপ হলো!

 

 

‘এখানে বসতে পারি?’ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে মুখ তুলে তাকাল শাহেদ আলী।

 

‘আরে স্যার! আপনি এখানে? বসেন বসেন।’ অফিসের কামরুজ্জামান স্যারকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শাহেদ আলী।

 

 

কামরুজ্জামান তাদের হেড একাউন্ট্যান্ট। বহুদিন ধরে তাদের অফিসে চাকরি করছেন তিনি। বিশ্বস্ত ও চৌকস অফিসার তবে মেজাজ একটু চড়া। দিনে পাঁচ-সাত কাপ চা খান। অফিসে চা খাওয়ার ব্যাপারে যে লোকটি শাহেদ আলীকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত রাখত তিনি এই কামরুজ্জামান স্যার।

 

আর চা দিতে দেরি হলে তো তার মেজাজ চড়ে যেত, “শাহেদ আলী! চা দিতে দেরি করো কেন? হিসাব নিকাশের কাজ করি, মাথা ঠান্ডা রেখে করতে হয়। ফ্রেশ থাকতে হয়। কতবার বলেছি!’

 

 

কিন্তু কামরুজ্জামান স্যার এখানে কেন? তার তো এখন অফিসে থাকার কথা। তাছাড়া গত পাঁচ বছরে কখনও কামরুজ্জামানকে চায়ের দোকানে এসে চা কিংবা সিগারেট খেতে দেখেনি শাহেদ আলী।

অনু্গল্প
অনু্গল্প ©Getty Images

 

শাহেদ আলীকে আরও অবাক করে দিয়ে কামরুজ্জামান এক কাপ দুধ চায়ের অর্ডার করলেন।এবার আর চুপ থাকতে না পেরে বলে উঠল শাহেদ আলী, ‘স্যার আজকে মনে হয় আপনাকে চা দেওয়ার কেউ ছিল না।হিসাব-নিকাশে খুব সমস্যা হয়ে গেছে,  তাই না?’

 

খুব অন্যমনস্ক হয়ে আস্তে আস্তে মাথা তুললেন কামরুজ্জামান, ‘জীবনের হিসাব-নিকাশে সমস্যা সব সময়ই থাকে। বুঝলে শাহেদ আলী? সেটা নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না কিন্তু আজকে অফিসের হিসাবটাও ঠিক বুঝলাম না।’

 

 

চমকে উঠল শাহেদ আলী।তবে কি কামরুজ্জামান স্যারের চাকরিও….

 

 

কামরুজ্জামান স্যারকে আনমনে বিড়বিড় করে বলতে শুনলো সে, ‘তুমি কি আজ বিকাল পর্যন্ত আমার সাথে থাকতে পারবে,শাহেদ? সারাদিন চা খাওয়াব তোমাকে ।পাঁচটায় অফিস ছুটির পর বাসায় যাব।তোমার কি অন্য কোনও কাজ আছে? থাকলে সরাসরি বলতে পারো। সংকোচ করো না…. 

 

সমাপ্ত


This two fictional short stories are about Corona Virus.

Feature Image: The New York Times

আরো দেখুন:

কী ঘটেছিল ব্ল্যাক ডালিয়ার ভাগ্যে? 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...