ওয়াটস ফ্যামিলি হত্যাকান্ড:  পরকিয়াই কারণ? (ভিডিও) 

বাইরে থেকে দেখে ওয়াটস পরিবারকে বেশ পরিপাটি এবং নিখুঁত পরিবার বলেই মনে হত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ক্রিস ওয়াটসে দেখা যায় সে একজন দায়িত্ববান স্বামী।

ওয়াটস ফ্যামিলি হত্যাকান্ড:  পরকিয়াই কারণ? (ভিডিও) 

 

বাইরে থেকে দেখে ওয়াটস ফ্যামিলি কে বেশ পরিপাটি এবং নিখুঁত পরিবার বলেই মনে হত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ক্রিস ওয়াটসে দেখা যায় সে একজন দায়িত্ববান স্বামী, স্নেহময় বাবা। চার বছর বয়সী বেলা এবং তিন বছর বয়সী সিলেস্ট, দুই কন্যা সন্তানের জনক সে। স্ত্রী শ্যানন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সরব ছিল সবসময়। জীবনের প্রতিটা ছোট বড় মুহূর্তের ঘটনা ফেসবুক লাইভে নিয়মিত প্রচার করত সে। ওয়াটস ফ্যামিলি কে দেখে মনে হত তারা বুঝি একটা নির্ঝঞ্ঝাট সুখী জীবন পার করছে। ক্রিস একটা তেল কোম্পানির ফিল্ড- কোঅর্ডিনেটর। আর শ্যানন কাজ করত একটা মাল্টি লেভেল কোম্পানির মার্কেটিংয়ে। 

 

ক্রিস আর শ্যাননের পরিচয় ঘটে ফেসবুকে। শ্যাননের পূর্বের স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটেছে খুব বেশিদিন হয় নি। এরইমধ্যে ক্রিসের সাথে তার পরিচয়। সেই পরিচয় সম্পর্ক পেরিয়ে বিয়ে অবধি পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগে নি। ২০১২ সালে বিয়ে করে তারা। নিজেদের যত ভালোবাসাবাসির গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত জানান দিতো তারা। বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত মহলে সদা হাসিখুশি, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং যত্নশীল শ্যাননকে সবাই বেশ পছন্দ করত। ক্রিসও নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসত, কন্যাদের অসম্ভব আদর- স্নেহ করত, অন্তত বাইরে থেকে দেখে তাই মনে হত।

 

২০১৮ সাল। তারা জানতে পারে পরিবারে নতুন সদস্যের আগমন ঘটছে শিঘ্রই। দুই কন্যার পর এবার পুত্রসন্তান। গোটা পরিবারেই বইছিল আনন্দের হাওয়া। এরইমধ্যে ১৫ সপ্তাহের গর্ভবতী শ্যানন অফিসের একটা কাজে আরিজোনায় যায়, সাথে ছিল তার ঘনিষ্ট বান্ধবী এবং সহকর্মী নিকোল এটকিন্সন। ক্রিস কলোরাডোতে তাদের বাড়িতে দুই মেয়ের সাথে অবস্থান করছিল। 

 

আগস্টের ১৮ তারিখ। ট্রিপ শেষ করে ফিরতে তাদের অনেক দেরি হয়ে যায়। রাত দুইটার দিকে নিকোল শ্যাননকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যায়। পরদিন সকালে দেখা করার কথা বলে তারা পরষ্পর পরষ্পরকে বিদায় জানায়। 

 

কিন্তু সকাল থেকে শ্যারনের যেন কোন পাত্তাই নেই। প্রতিদিন সকালে তাদের মধ্যে কথা হলেও সেইদিন নিকোলের অসংখ্য টেক্সট ম্যাসেজ আর ফোন কল- কোনটারই কোন উত্তর না পেয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে নিকোল। তাই সে তাকে খুঁজতে তার বাড়িতে যায়। সামনের দরজার সিকিউরিটি কোড জানা থাকলেও সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ দরজা টা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। নিকোল ক্রিসকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে শ্যানন কোথায়। ক্রিস তাকে জানায় শ্যানন বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছে। কিন্তু নিকোলের তার কথা বিশ্বাস হয় না। কারণ শ্যাননের গাড়ি তখনো গ্যারেজে রাখা ছিল। গাড়ির ভেতরে বাচ্চাদের সিটও রাখা ছিল। 

 

নিকোল এবার বেশ চিন্তিত হয়ে পুলিশে খবর দেয়। নিকোল যখন পুলিশের জন্য অপেক্ষা করছিল তখন ক্রিস শ্যাননের আরেক বন্ধুকে ফোন দিয়ে তাদের বাড়িতে যেতে বলে। তাকে যখন জানানো হয় পুলিশে খবর দেওয়ার কথা তখন ক্রিস তাদের মানা করে পুলিশকে জানাতে। কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। ক্রিসও অফিস থেকে বাড়ি চলে আসে। তারপর তারা গ্যারেজের পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। অফিসার পুরো বাড়ি তল্লাশী করে। বাড়িতে জীবিত প্রাণী বলতে ছিল কেবল তাদের পোষা কুকুরটা। ক্রিস পুলিশকে জানায় সে তার স্ত্রী কে শেষ দেখেছে সকাল বেলা। যখন সে কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। পুরো বাড়িটা বেশ সাজানো গোছানো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ে না। কেবল শ্যাননের ওয়ালেট, বিয়ের আংটি এবং মোবাইল ফোন ছাড়া। নিকোল জানায় শ্যাননের জন্য এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। সে তার মোবাইল ফোন ছাড়া কোথাও যায় না। বাড়ির বিছানাগুলোও কেমন অগোছালো, বড় বেডরুমটার বিছানায় কোন চাদর ছিল না, একটা চাদর পাওয়া যায় ময়লা ফেলার বিনে, যেটা সেই বিছানার চেয়ে আকৃতিতে ছোট। ছোট মেয়ে সিলেস্ট, যাকে ডাকা হত সিসি বলে, সে কিছু ঔষধ খেতো। যে ঔষধগুলো সবসময় তার সাথে থাকত। সেগুলোও ঘরেই আছে। কেবল মানুষগুলো নিখোঁজ। 

 

ওয়াটসের প্রতিবেশি তাদের সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার জন্য পুলিশকে আমন্ত্রণ জানায়। ফুটেজে দেখা যায় রাতে ক্রিস গ্যারেজের ভেতর তার ট্রাক নিয়ে প্রবেশ করে। ৫০ মিনিট পর সে সেই ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে যায়। পুলিশ ক্রিসকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে। আপাতদৃষ্টিতে নিজের পরিবারকে ফিরে পেতে উদ্বিগ্ন ক্রিস মিডিয়ার কাছে সাহায্যের আরজি জানায়। সেই ইন্টারভিউয়ে ক্রিস জানায় শ্যানন নিখোঁজ হওয়ার আগে তাদের মধ্যে বেশ উত্তপ্ত কিছু বাক্য বিনিময় হয়েছিল। 

ওয়াটস-ফ্যামিলি
ওয়াটস ফ্যামিলি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুখি এই দম্পতি বাস্তবে কিন্তু অতটাও সুখি ছিল না। নিখোঁজ হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে থেকেই শ্যানন ঘর ভাঙ্গা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বন্ধুদের পাঠানো টেক্সট ম্যাসেজে যে জানায় ক্রিস তাকে বলেছে গর্ভের সন্তানকে নিয়ে সে অনেক ভীত। সে আর কোন সন্তান চায় না। ক্রিস যেন হটাৎই বদলে গেছে। তাকে শ্যানন আর চিনতেই পারছে না ইদানিং। শ্যাননের সন্দেহ ছিল ক্রিস অন্য কোন সম্পর্কে জড়িয়েছে। তার এই সন্দেহের পেছনের কারণ তাদের যৌথ ব্যাংক একাউন্ট থেকে একটা বেশ বড়সড় বিলের স্টেটমেন্ট, যে বিল পরিশোধ করা হয়েছে একটা স্পোর্টস বারে খাবারের পেছনে। শ্যাননের সন্দেহই সত্যি প্রমাণিত হয়। নিকোল কিসিঞ্জার নামের এক সহকর্মীর সাথে ক্রিসের তখন প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। ক্রিস নিকোলকে বলেছিল সে তার পরিবার থেকে আলাদা থাকে, এবং তার বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে। নিকোলের সাথে যত ছবি সব তার ফোনের একটা গোপন ফোল্ডারে রাখা ছিল। কিন্তু নিকোল জানতে পারল ক্রিসের স্ত্রী নিখোঁজ। কেবল নিখোঁজই নয়, ১৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। এদিকে ক্রিস আর নিকোলের সম্পর্ক চলছে জুন থেকে, অথচ নিকোল জানায় তার স্ত্রী- সন্তান সম্পর্কে সে কিছুই জানত না। 

ওয়াটস-ফ্যামিলি
ওয়াটস ফ্যামিলি

 

শ্যাননের বাবা- মা তাদের নিখোঁজ কন্যা এবং নাতনিদের নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা বিশ্বাস করত তাদের জামাতা ক্রিসের এর পেছনে নিশ্চিত কোন হাত রয়েছে। এফবিআই ক্রিসকে জানায় সে সন্দেহভাজন হিসেবে তাদের তালিকায় আছে। এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ক্রিস যে জবানবন্দি দিচ্ছিল সেগুলো সবগুলোই মিথ্যা মনে হচ্ছিল তাদের। তাই তারা ক্রিসকে পলিগ্রাফ টেস্টে অংশ নিতে বলে। ক্রিসও রাজি হয়ে যায়।

 

তবে পলিগ্রাফ টেস্ট পার করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় সে। তার মিথ্যাচার এবার দিনের আলোর মতন স্পষ্ট হয়ে যায়। পুলিশ তাকে উপদেশ দেয় সত্যি কথা বলতে। কিন্তু ধরা পরে যাওয়ার পরও সবকিছু অস্বীকার করে যায় সে। বারবার মিথ্যে বলতে থাকে। এদিকে তদন্তকারীরা ক্রিসের ট্রাকের জিপিএস ট্র্যাকার থেকে ক্রিসের সে রাতের গন্তব্য খুঁজে বের করে। যেখানে পৌঁছায় সেখানে ক্রিস সে সময় কাজ করত। তারা পুরো এলাকা ড্রোন দিয়ে তল্লাশী চালায়। সেখানে তারা একটা বেডশিট খুঁজে পায় যে বেডশিটটার আকৃতি মিলে যায় ক্রিসের বাড়ির ময়লা ফেলার বিনে খুঁজে পাওয়া বেডশিটটার সাথে। এদিকে তারা বারবার ক্রিসের কাছে শ্যানন আর বাচ্চাদের খোঁজ জানতে চাইলেও ক্রিস বারবার নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করতে থাকে। তবে এই পর্যায়ে এসে সে তার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কথা শিকার করে। 

 

 আরো পড়ুন : জো বাইডেন আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন কেন?

 

টানা ছয় ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ চলার পর ক্রিস তার স্ত্রীকে হত্যা করার দায় শিকার করে। এবং সে দাবী করে তার স্ত্রী তার দুই মেয়েকে গলা চেপে হত্যা করার পর রাগের মাথায় সে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। এবং তাদের সবার মৃতদেহ সেই জায়গাটায় রেখে এসেছে। ক্রিস আরো জানায় সে তার দুই মেয়েকে তেলের ট্যাঙ্কের ভেতর ফেলে দিয়েছে এবং স্ত্রীকে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে। তাদের শরীর উদ্ধার করার পর ময়নাতদন্তে জানা যায় দুই বাচ্চারই মৃত্যু হয়েছে কিছু একটা দিয়ে শ্বাসরোধ করে, আর শ্যারনের মৃত্যু হয়েছে গলায় আঘাত করে শ্বাসরোধ করে। ক্রিসের কথা আবারো মিথ্যে প্রমাণিত হয়। পুলিশ তিনজনের খুনের পেছনেই ক্রিসের একক দায়বদ্ধতার প্রমাণ পায়। পরবর্তীতে দেওয়া একটি সাক্ষাতকারে সে তিনটি খুনের দায়ই স্বীকার করে এবং কিভাবে সে তার দুই কন্যা এবং স্ত্রীকে হত্যা করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়। সে জানায় সে প্রথমেই তার স্ত্রীকে হত্যা করে, হত্যা করার সময় তার মেয়েরা ঘরে চলে আসে, তারা তাকে জিজ্ঞেস করে “তুমি মা কে কি করছ?” কিন্তু সে উত্তরে কিছু বলে না। মৃত স্ত্রী এবং মেয়েদের নিয়ে সে বের হয়ে যায়। 

 

স্ত্রীকে পুঁতে ফেলার পর সে একে একে দুই মেয়েকেও হত্যা করে এবং তাদের তেলের ট্যাঙ্কের ভেতর ভরে ফেলে। সিসি তেমন প্রতিরোধ না করলেও বেলা বাবার সাথে বেশ একদফা ধস্তাধস্তি চালায়। ফলে যখন তার মৃতদেহ উদ্ধার হয় তখন তার শরীরে পাওয়া যায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। তবে বাবার সাথে শক্তিতে পেরে উঠে না সে। তাই শেষমেশ হার মেনে নেয়। 

 

ক্রিস ওয়াটসকে আদালত কোন ধরণের জামিনের সম্ভাবনা ছাড়া যাবতজীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। জীবনের বাকি সময়টা জেলেই কাটাতে হবে। প্রচন্ড আত্মপ্রেমী এবং স্বার্থপর লোকটার এতে কোন বোধদয় হবে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়ই। 

 


 Sources : Chris Watts 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...