উহুদ যুদ্ধ ও মুসলিম উম্মাহ’র শিক্ষা

 

 

হিজরি তৃতীয় বর্ষ;  প্রচণ্ড হিংস্র, প্রতিশোধপরায়ণ,  পরশ্রীকাতর এবং যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সশস্ত্র সৈন্যসমেত কুরাইশ বাহিনী এগিয়ে চলেছে মক্কার দিকে। সাথে ৫০০০ উঠ, ৭০০ বর্মধারী সৈন্য ও ২০০ অশ্বারোহী, যেন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী, আরো হিংস্র এবং সংঘবদ্ধ। উহুদ যুদ্ধ; এবার কুরাইশরা আরো রোমাঞ্চিত।

 

কারণ সঙ্গে নেওয়া হয়েছে নারীদের। তাদের কাজ ছিল গানে গানে যোদ্ধাদের মনোবল চাঙা রাখা। চলছে যুদ্ধযাত্রার শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। শেষবারের মতো কুরাইশ বাহিনীতে বক্তৃতা দিচ্ছে সেনাপতি আবু সুফিয়ান। লক্ষ্য- যেভাবেই হোক রাসূলে কারীম (সঃ)-কে হত্যা করে মসুলমানদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। 

উহুদ-যুদ্ধ
উহুদ যুদ্ধের প্রান্তর; Image source: ekusheytv

 

উহুদ যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় সামরিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য যতটা না পরাজয়ের গ্লানির, ঠিক ততটাই নাটকীয়ভাবে শিক্ষনীয়। যুদ্ধের  প্রথমদিকে জয়ের পথে থেকেও শেষার্ধে এসে মহানবী সাঃ এর নির্দেশ ভঙ্গ করে দায়িত্বে অবহেলার যে পরিচয় দিয়েছিল মুসলিম বাহিনী, সেই অবহেলার মাশুল দিতে হয়েছিল উহুদের যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে। 

 

উহুদের যুদ্ধ মহানবী (সাঃ) এর মদিনায় হিজরতের তিন বছর পরে এবং বদরের যুদ্ধের এক বছর পরে সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে যায় বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় ও অপমানজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। এতে মক্কার কুরাইশ নেতারা ক্ষুব্ধ হন; তারা অপমানিত ও বিচলিত হয়েছিল যে তাদের বিশাল সৈন্যবাহিনী রাসুলে করিম(সাঃ) এর নেতৃত্বাধীন ছোট্ট মুসলিম  সৈন্যবাহিনীর কাছে কিভাবে হেরে যায়!

 

চিরশত্রু মুহাম্মদের এমন প্রতিপত্তি কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না মক্কাবাসীর। বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মক্কার কুরাইশদের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের সূচনা করা হয়েছিল। যুদ্ধযাত্রার খবর পাওয়ার পর মুসলিমরাও তৈরী হয় এবং উহুদ পর্বত সংলগ্ন প্রান্তরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

 

আরও পড়ুন বদর যুদ্ধ: মহানবী (সাঃ)-এর জীবনের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ (ভিডিও)

 

২১ মার্চ ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ। প্রস্তুত যুদ্ধের ময়দান। উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ৩০০০ হাজার সৈন্য, ৭০০ বর্ম ও ২০০ অশ্বারোহীসমেত প্রস্তুত কুরাইশ বাহিনী। এদিকে এ সংবাদ পেয়ে বদরের যুদ্ধের তুলনায় আরো দক্ষ ও অভিজ্ঞ ১০০০ সৈন্য, ১০০ জন বর্মধারী এবং ৫০ জন অশ্বারোহী নিয়ে মুহাম্মাদ (স) উহুদ অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা করেন।

তাঁরা শাওত নামক স্থানে পৌঁছানোর পর যুদ্ধে অস্বীকৃতি জানান আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তিনি তাঁর ৩০০ অনুসারী নিয়ে দলত্যাগ করেন। তখন বাকি ৭০০ সৈনিক নিয়ে মুসলিমরা উহুদের দিকে যাত্রা করেন। 

উহুদ-যুদ্ধ
মানচিত্রে উহুদ যুদ্ধ; Image source: wikipedia

 

উহুদের যাত্রাপথে যেন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে না হয় তাই মুসলিম বাহিনী ভিন্ন পথ অবলম্বন করে এবং পথপ্রদর্শক ছিলেন আবু খাইসামা। এ সময় প্রতিপক্ষকে পশ্চিমে ছেড়ে দিয়ে বনি হারিসা গোত্রের শস্যখেতের মধ্য দিয়ে ভিন্ন একটি পথ অবলম্বন করে উহুদের দিকে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে। যুদ্ধের প্রথা অনুযায়ী মল্লযুদ্ধে কুরাইশ বীর তালহা এবং মুসলিম বীরকেশরী হযরত হামযা অবতীর্ণ হন। 

মল্লযুদ্ধের শুরুতে অমুসলিম বাহিনীর পতাকাধারী তালহা ইবনে আবি তালহা এগিয়ে এলে প্রতি আক্রমণে তালহা নিহত হন। এরপর শুরু হয় সাধারণ যুদ্ধ। আবু সুফিয়ানের অশ্বারোহী বাহিনী বেশ কয়েকবার গিরিপথে প্রবেশের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে রণ ভঙ্গ করে পালাতে শুরু করে।

এদিকে উহুদ প্রান্তরে জাবালে রুমা পাহাড়ে রাসূলে করীম (সাঃ) ৫০ জন তিরন্দাজ সাহাবিকে নিযুক্ত করেন। তাঁদেরকে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, “আমাদের জয় পরাজয় যা-ই হোক, তোমরা এখানেই থাকবে।”

 

শুরু থেকেই মুসলিমদের কাছে মক্কার কুরাইশরা কোণঠাসা হওয়ার ধারাবাহিকতায় কুরাইশরা দিগ্বিদিক পালাতে শুরু করে। নিজেদের বিজয় হয়েছে ভেবে যুদ্ধাস্ত্র ও শত্রুশিবির লুন্ঠন করতে থাকে প্রধান সেনাদল। তীরন্দাজ বাহিনী জাবালে রুমা পাহাড় থেকে প্রধান সেনাদলের এমন কাজ দেখে নবীজীর নির্দেশ বেমালুম ভুলে যায় এবং মাল সংগ্রহে অংশ নেন।  কিন্তু নবীজির নির্দেশ উপেক্ষা করার মাশুল দিতে হলো চড়া মূল্যে।

উহুদ-যুদ্ধ
যেখানে ঘটেছিল উহুদ যুদ্ধ; Image source: itibritta.com

 

যখন তীরন্দাজরা মাল সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন, অরক্ষিত হয়ে পড়ে মুসলিম বাহিনী৷ এই সুযোগ শতভাগ কাজে লাগালেন কুরাইশদের অশ্বারোহী সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ৷ দুর্ধর্ষ এ নেতা পেছন দিক হতে মুসলিম শিবিরে অতর্কিত আক্রমন করে মুহূর্তেই যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর শত চেষ্টা করেও খালিদকে প্রতিরোধ করতে পারেনি। অবশেষে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে। ছত্রভঙ্গ মুসলিমদের উপর তখন পালিয়ে যাওয়া কুরাইশরা আবার নতুন করে আক্রমন শুরু করে দেয়। দিশেহারা বাহিনীকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন মুহাম্মাদ (স)। কিন্তু   দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন সেটি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে।

বর্বর কুরাইশ যোদ্ধারা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ওপর সর্বাত্মক আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নবীজীর প্রাণসংকটে দেখে সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের জীবন বাজি রেখে, নিজেদের বুককে ঢাল বানিয়ে নবীজিকে রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকলেন। ইবনে কামিয়া নবীজিকে তরবারি দ্বারা কঠিন আঘাত করলে নবীজির শিরস্ত্রাণ বিদীর্ণ হয়ে দুটি লৌহ কড়া তাঁর কপালে বিঁধে গেল, নবীজি অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন।

এরই মধ্যে অমুসলিমদের আক্রমণে হজরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) শহিদ হন। হজরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর দেহ অবয়ব নবীজির সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল বিধায় গুজব রটে যে, হযরত মুহাম্মদ (স) যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এতে মুসলিম বাহিনী হতাশ হয়ে যায় এবং কুরাইশ বাহিনী অতি আনন্দে চূড়ান্ত জয় পরাজয় নিশ্চিত না করেই উহুদ যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নির্দেশ অমান্য করায় নিশ্চিত জয়ী হওয়া যুদ্ধে মুসলিমরা হেরে যায়; শহিদ হন ৭০ জন সাহাবী। কিন্তু জয় পরাজয়ের সরাসরি  হিসেবে কোন পক্ষকেই জয়ী না ধরলেও সেনা সদস্য নিহতের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে মুসলমানদের পরাজিত হিসেবে দেখানো হয়৷ কারণ কুরাইশদের ২৩ জন নিহত হওয়ার বিপরীতে মুসলিম বাহিনীর ৭০ জন সাহাবী শহিদ হন। এ যুদ্ধে কুরাইশরা চরম পৈশাচিকতার পরিচয় দেয়। নিহত মুসলিমদের নাক ও কান ছিড়ে যুদ্ধকে বীভৎস রূপ দেয়।

 

উহুদ যুদ্ধ-এ মুসলিম বাহিনীর জন্য বড় শিক্ষা হচ্ছে রাসূল (সাঃ) এর কথা অমান্য করা, মতভেদ করা এবং ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরিণতি উপলব্ধি করতে পারা।আল্লাহ তা’আলা সুরা আল-ইমরানের ১২১ নম্বর আয়াত থেকে ১৬০ নম্বর আয়াতের মধ্যে এটি বর্ণনা করেছেন। যাতে তারা ভবিষ্যতে সতর্ক হয়ে যায় এবং যেসব বিষয় তাদের পরাজয়ের কারণ হতে পারে, তা থেকে বিরত থাকে।

সবসময় তাদেরকে বিজয় দান করলে সত্যিকার মুমিন ও অন্যদের মাঝে পার্থক্য করা সম্ভব হবেনা। আর সবসময় পরাজিত করলে নাবী-রসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য সফল হবেনা।


This is a Bengali article about ‘battle of Uhud’.

Feature image: pinterest

Referrence:

ওহুদের যুদ্ধের শিক্ষা

The Battle of Uhud

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...