উল্কাপাত : মহাবিশ্বের নিয়মিত এক মহাজাগতিক ঘটনা

উল্কাপাত হলাে নিয়মিত মহাজাগতিক ঘটনা, যা পরিষ্কার রাতের আকাশে হঠাৎ হঠাৎ দেখা মেলে। তবে এই আলােকিত বস্তুপিণ্ডগুলাে যখন কোনাে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীতে সংখ্যায় অনেক দেখতে পাওয়া যায়, তখন তা উল্কাবৃষ্টি হিসেবে পরিচিত।

উল্কাপাত : মহাবিশ্বের নিয়মিত এক মহাজাগতিক ঘটনা

 

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। রাশিয়ার মস্কো থেকে ১৫০০ কিলােমিটার পূর্বে চেলিয়াবিনস্ক শহরের বাসিন্দা পথচারীদের হঠাৎ করেই আকাশে ভিন্ন এক দৃশ্য চোখে পড়ে। দিনদুপুরে এক অদ্ভুতুড়ে অগ্নিপিণ্ড আকাশের বুক চিরে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছে। রাস্তায় অনেক গাড়িরই ড্যাশবাের্ডে চালু থাকা ভিডিও ক্যামেরায় ধরা পরে এই মহাজাগতিক ঘটনা। এটি ছিল একটি জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে চেলিয়াবিনস্ক শহরের এক স্বল্প জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আকাশ থেকে এই জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড পতনের ঘটনা ঘটে।

 

মেঘমুক্ত রাতের আকাশে অনেক সময় খালি চোখে দেখতে পাওয়া নক্ষত্রের মতাে ছােট ছােট উজ্জ্বল বস্তু পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। এই মহাজাগতিক বস্তুগুলােকে উল্কা বলা হয়। উল্কা হলাে ধূমকেতু বা গ্রহাণুর অংশবিশেষ। ধূমকেতু বা গ্রহাণু থেকে ছিটকে এরা ধেয়ে আসে পৃথিবীর দিকে। এগুলাে পাথর বা ধাতু দিয়ে তৈরি মহাজাগতিক বস্তু, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে বায়ুর সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। গ্রামবাংলায় এই ঘটনাকে এখনােতারা খসে পড়াবলে অনেকে মনে করেন।

উল্কাপাত হলাে নিয়মিত মহাজাগতিক ঘটনা, যা পরিষ্কার রাতের আকাশে হঠাৎ হঠাৎ দেখা মেলে। তবে এই আলােকিত বস্তুপিণ্ডগুলাে যখন কোনাে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীতে সংখ্যায় অনেক দেখতে পাওয়া যায়, তখন তা উল্কাবৃষ্টি হিসেবে পরিচিত। এগুলাে বেশির ভাগেরই আকার খুব ছােট, তাই বায়ুমণ্ডলেই জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু কখনাে কখনাে বড় আকৃতির উল্কাও চলে আসে। তখন এরা সম্পূর্ণরূপে পুড়ে না গিয়ে ভূপৃষ্ঠে এসে আঘাত করে। এদেরই নাম হলাে উল্কাপিণ্ড।

উল্কাপাত
উল্কাপাত ©Pixabay

 

বেশির ভাগ উল্কার উৎপত্তি ধূমকেতু বা গ্রহাণুর অংশবিশেষ থেকে। আর বাকিদের উৎপত্তি মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ থেকে। পৃথিবী তার মহাজাগতিক পথপরিক্রমায় ধূমকেতুর কক্ষপথে প্রবেশ করল মাঝেমধ্যে। তখন ধুমকেতুর অংশবিশেষ পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানে ছুটে আসে। উল্কাপিণ্ড গ্রহাণুর তুলনায় আকারে অনেক ছােট। ধূলিকণা থেকে কয়েক মিটার দৈর্ঘ্যের হয় একেকটা উল্কাপিণ্ড।

 

সৌরজগতের মঙ্গল বৃহস্পতি গ্রহের মাঝখানে একটা বেষ্টনী আছে। এখানেই অবস্থান করে বেশির ভাগ গ্রহাণু এগুলাে হলাে ৪৬০ কোটি বছর আগে সৌরজগতের প্রাথমিক গঠনের পরে পাথরের অবশিষ্টাংশ। গ্রহাণুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে উল্কা হিসেবে আমাদের চোখে ধরা দেয়। যেসব উল্কা শুক্র গ্রহের চেয়েও উজ্জ্বল (উজ্জ্বলতা বা তার বেশি), তাদেরফায়ারবলবলা হয়। রাতের আকাশে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ফায়ারবলের দেখা মেলে।

 

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪৮. টন (৪৪,০০০ কেজি) উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। অধিকাংশ উল্কাই সিলিকন অক্সিজেনের খনিজ সিলিকেট এবং লােহা নিকেলের মতাে ভারী ধাতু দিয়ে তৈরি। ধাতব উল্কাগুলাে আকারে বড় ভারী। পাথুরে উল্কাগুলাে তুলনামূলক হালকা ভঙ্গুর।

উল্কাপাত
উল্কাপাত © Pixabay

 

উল্কাবৃষ্টি

উল্কাপাতের ঘটনা যেকোনাে সময়ই হতে পারে। তবে কিছু উল্কাপাতের সুনির্দিষ্ট সময় আছে। এগুলাের প্রতিবছর পুনরাবৃত্তি ঘটে। সময় আকাশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে কাছাকাছি সময়ে অনেক উল্কাপাত দেখা যায়। জন্য এগুলােকে উল্কাবৃষ্টি বলে। এই উল্কাবৃষ্টি যে নক্ষত্রমণ্ডল বরাবর হয়, তার নামানুসারেই নামকরণ করা হয়। উত্তর গােলার্ধে অবস্থানরত পর্যবেক্ষকেরা দক্ষিণ গােলার্ধের তুলনায় ভালােভাবে উল্কা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কারণ, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ উল্কাবৃষ্টি নিরক্ষীয় অঞ্চলের অনেক ওপরে হয়।

উত্তর গােলার্ধ থেকে এই উল্কাবৃষ্টি আকাশের মাঝখান থেকে দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, যা দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থানরত পর্যবেক্ষকের কাছে খুব সামান্যই দৃশ্যমান হয়।

নিচে কয়েকটি নিয়মিত উল্লেখযােগ্য উল্কাবৃষ্টির বর্ণনা দেওয়া হলাে।

 

কোয়াডানটিডস

ডিসেম্বর ২৮ থেকে জানুয়ারি ১২ পর্যন্ত এই উল্কাপাত সক্রিয় থাকে। তবে জানুয়ারি মাসের তারিখে সর্বোচ্চ উল্কাপাত হয়। এর অবস্থান বুটিস নক্ষত্রমণ্ডলে (আগে কোয়াড্রানস মুরালিস নক্ষত্রমণ্ডলে এটি তালিকাভুও ছিল, কিন্তু আধুনিক তারাচিত্র সংস্করণের পর এই নক্ষত্রমণ্ডলী বাদ দেওয়া হয়েছে)। প্রতি ঘণ্টায় ৪০ টির বেশি বড় এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যায়। এই উল্কাপিণ্ডগুলো সেকেন্ডে ৪১ কিলােমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এর উৎপত্তি ২০০৩ ইএইচ১ নামের গ্রহাণু (কোন কোন বিজ্ঞানী গ্রহাণু মনে করেন) থেকে।

কোয়াডানটিডস ©Time And Date

লাইরিডস

এপ্রিল মাসের ১৬ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে এই উল্কাপাত সক্রিয় থাকে, তবে ২১২২ তারিখে সর্বোচ্চ উল্কাপাত ঘটে থাকে। এর অবস্থান লাইরা বা বীণা নক্ষত্রমণ্ডলে। প্রতি সেকেন্ডে উল্কার গতিবেগ থাকে ৪৯ কিলােমিটার। পরিষ্কার আকাশে প্রতি ঘন্টায় গড়ে ২০টি উল্কা দেখতে পাওয়া যায়। লাইরিডস উদ্ধার উৎস সি/১৮৬১ জি১ থ্যাচার নামের ধূমকেতু। উত্তর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র অভিজিৎ এই নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। এই নক্ষত্র এখন থেকে প্রায় ১২ হাজার বছর পরে ধ্রুবতারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

উল্কাপাত
লাইরিডস © Time And Date

ইটা অ্যাকুয়ারিডস

প্রতিবছর মে মাসের শুরুতে দেখা মেলে ইটা অ্যাকুয়ারিডস উল্কাপাতের। এই উল্কাপাত তার গতিবেগের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রতি সেকেন্ডে এদের গতিবেগ থাকে প্রায় ৬৬ কিলােমিটার। প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০টির মতাে উল্কার দেখা মিলতে পারে। অ্যাকুয়ারিডস বা কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে এটি দৃশ্যমান এবং এর উৎস ১পি/হ্যালির ধূমকেতু।

উল্কাপাত
ইটা অ্যাকুয়ারিডস © Time And Date

ডেলটা অ্যাকুয়ারিডস

ডেলটা অ্যাকুয়ারিডস মধ্য জুলাই থেকে আগস্টের প্রায় শেষ পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। তবে ২৯৩০ জুলাই সর্বোচ্চ উল্কা দেখতে পাওয়া যায়। আকাশে চাঁদ থাকলে এই অনুজ্জ্বল উল্কাপাত খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু অমাবস্যার আকাশে এর দেখা মিলবে সহজেই। গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ২০টির মতাে উল্কার দেখা মিলতে পারে। অ্যাকুয়ারিডস বা কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে এর অবস্থান এবং ধূমকেতু ৯৬পি ম্যালকহােজকে এই উল্কার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে মনে করা হয়। উল্কাপিণ্ডগুলাের বেগ প্রতি সেকেন্ডে ৪১ কিলােমিটার।

 

জেমিনিডস

জেমিনি বা মিথুন নক্ষত্রমণ্ডলের জেমিনিডস উল্কাবৃষ্টির দেখা মেলে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে। এর উৎপত্তি ৩২০০ ফ্যাথন নামের গ্রহাণু (কোনাে কোনাে বিজ্ঞানী ধূমকেতু মনে করেন) থেকে। ডিসেম্বরের ১৩১৪ তারিখে সর্বোচ্চ উল্কাপাতের হার থাকে ঘণ্টায় প্রায় ১০০১২০টি। জেমিনিড উল্কা বড় এবং অনেক উজ্জ্বল হয়।

উল্কাপাত
জেমিনিডস © Time And Date

আরসিডস

বছরের শেষ উল্কাপাত আরসিডসের দেখা পাওয়া যায় ডিসেম্বরের শেষার্ধে অর্থাৎ ১৭ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে। সর্বোচ্চ উল্কাপাত ঘটে ২২২৩ ডিসেম্বর। ঘণ্টায় মাত্র ১০টি উল্কা দেখা গেলেও এরা আকারে বড় হওয়ায় ফায়ারবলের মতাে মনে হয়। লঘু সপ্তর্ষি নক্ষত্রমণ্ডলে এটি দেখতে পাওয়া যায়। ৮পি/টাটল নামের ধূমকেতু আর্সিডস উল্কাপাতের উৎস। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এর গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ৩৩ কিলােমিটার।

উল্কাপাত
আরসিডস © Time And Date

মহাকাশে উল্কার হামলা

মহাকাশে ইতস্তত ছুটে বেড়ানাে উল্কাদের পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা উপগ্রহগুলােকে আঘাত করার আশঙ্কা থাকে। ১৯৩৩ সালে ইউরােপীয় কৃত্রিম উপগ্রহ অলিম্পাস পারসেইড উল্কাবৃষ্টির সংঘর্ষে পড়ে এবং এটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল।

 

আরো পড়ুন : প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল মহাবিশ্ব- আদৌ কি সম্ভব? (ভিডিও)

 

১৯৬৭ সালে মেরিনার মহাকাশযানটি মঙ্গল গ্রহে যাত্রার সময় একটি উল্কাপ্রবাহের মুখােমুখি হয়েছিল। উল্কার আঘাতে মেরিনারের তাপ নিরােধকব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও মিশনটি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়।


 This Bengali article is about Meteor Shower.

তথ্যসুত্রঃ

Meteor Shower

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...